খুলনা অফিস
প্রকাশ : ২৫ নভেম্বর ২০২৪ ০৯:০০ এএম
প্রতীকী ছবি
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের খবর উদযাপনে গত ৫ আগস্ট জাতীয় পতাকা টাঙাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পর্শে মারা যান কলেজছাত্র রকিবুল হাসান রকি। এর সাড়ে তিন মাস পর ২১ নভেম্বর রকিকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার অভিযোগ এনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ১৪ সাংবাদিকসহ ৩১৫ জনের নামে মামলার আবেদন করা হয়। অজ্ঞাত হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়েছে আরও ১২০০-১৫০০ জনকে। মামলায় বাদী হিসেবে রকির বাবা রফিকুল ইসলাম গাজীর নাম থাকলেও তিনি বলছেন, এ বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। সম্প্রতি ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক পরিচয়ে দুই তরুণ সরকারি সহায়তা পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে রকির মৃত্যুসনদ ও এনআইডির কপি নেন। এরপর তিনি এ মামলার কথা জানতে পারেন।
জুলাই-আগস্টের ছাত্র আন্দোলনে জড়িত ছিলেন খুলনার বিএল কলেজের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র রকি। জুলাইয়ে কলেজ বন্ধ হয়ে গেলে তিনি খুলনা নগরী থেকে ৮৫ কিমি দূরের পাইকগাছায় চাঁদখালী গ্রামের বাড়িতে ফিরে যান। সেখানেও আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। ৫ আগস্ট বিকালে শেখ হাসিনার দেশ ছাড়ার খবরে আনন্দ উদযাপন করতে বাঁশের লাঠিতে জাতীয় পতাকা ওড়াতে যান রকি। এ সময় লাঠিতে বিদ্যুৎস্পর্শে তিনি মারা যান।
মামলায় নাম থাকা ১৪ সাংবাদিক হলেনÑ খুলনা প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি ও আওয়ামী লীগ নেতা এসএম নজরুল ইসলাম, খুলনা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি ও পেশাজীবী সাংবাদিক সুরক্ষা মঞ্চ খুলনার আহ্বায়ক এসএম হাবিব, খুলনা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি মুন্সি মাহবুব আলম সোহাগ ও আনোয়ারুল ইসলাম কাজল, সাবেক সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম ও আসাদুজ্জামান খান রিয়াজ, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের যুগ্ম মহাসচিব হেদায়েত হোসেন মোল্লা ও নির্বাহী সদস্য কৌশিক দে বাপী, খুলনা টিভি রিপোর্টার্স ইউনিটির সাবেক সভাপতি সুনীল দাস, রকিব উদ্দীন পান্নু ও মল্লিক সুধাংশু, খুলনা টিভি ক্যামেরা জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক নেয়ামুল হোসেন কচি, স্বাধীনতা সাংবাদিক ফোরাম খুলনার সভাপতি মকবুল হোসেন মিণ্টু, খুলনা ফটো জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জাহিদুল ইসলাম।
এ ছাড়া খুলনা নগরীতে অবস্থিত খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক, খুলনা মহানগর ও জেলা আওয়ামী লীগ নেতা, খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) কাউন্সিলর ও আইনজীবীদের অভিযুক্ত করা হয়েছে। আন্দোলন চলাকালে ছাত্রদের পক্ষে ছিলেন এমন কয়েকজনের নাম রয়েছে অভিযুক্তের তালিকায়।
গত শনিবার চাঁদখালীতে রকির গ্রামের বাড়ি গিয়ে তার বাবা রফিকুল ইসলামকে পাওয়া যায়নি। তার মোবাইল ফোনও বন্ধ পাওয়া যায়। তবে গতকাল রফিকুলের চাচাতো ভাই এসএ মুকুলসহ গ্রামের কয়েকজন ব্যক্তি সাংবাদিকদের জানান, তারা রফিকুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি জানিয়েছেন, রকির মৃত্যুর ঘটনায় ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা অভিযোগ ও আসামিদের বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। রফিকুল তাদের জানিয়েছেন, ১৭ নভেম্বর দুটি ছেলে তার বাড়িতে যায়। তারা নিজেদের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক পরিচয় দিয়ে সরকারি সাহায্য পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে রকির মৃত্যু সনদ, জাতীয় পরিচয়পত্রসহ যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করে নিয়ে যায়। পরে গত শুক্রবার লোকমুখে মামলার বিষয়টি জানতে পারেন তিনি। শনিবার অনেকেই রফিকুলের বাড়িতে যান এবং অভিযোগের বিষয়ে জানতে চান। এ কারণে বাধ্য হয়ে মোবাইল ফোন বন্ধ করে আত্মগোপনে চলে যান তিনি।
গ্রামবাসীরা জানায়, রফিকুল ইসলাম একটি চোখে দেখেন না। চা বিক্রি করে সংসার চালান তিনি। এক ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে রকি বড়। রকি বিএল কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানে চতুর্থ বর্ষের ছাত্র ছিল। খুলনায় থাকতেই আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। পরে কলেজ বন্ধ এবং কারফিউ জারি হলে গ্রামে ফিরে এসে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। আন্দোলন সফলের পর বিদ্যুৎস্পর্শে তার করুণ মৃত্যুতে সবাই শোকাহত। তার মৃত্যুকে ঘিরে এভাবে মিথ্যা অভিযোগ দেওয়ার বিষয়টি মানতে পারছেন না গ্রামের কেউ। রকি বিদ্যুৎস্পর্শে মারা গেছেন বলে ৯নং চাঁদখালি ইউনিয়ন পরিষদের প্রত্যয়নপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। পাইকগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মৃত্যুর প্রমাণপত্র এবং সরকারি মৃত্যু নিবন্ধনেও তার মৃত্যু বৈদ্যুতিক শর্টে হয়েছে বলে উল্লেখ রয়েছে।
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, অভিযুক্তরা গুলি, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট করে রকিবুল হাসানকে মারার পরিকল্পনা এবং হত্যার সঙ্গে যুক্ত। আসামিরা তাকে পরিকল্পিতভাবে বিদ্যুৎস্পর্শে হত্যা করার মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করেছেন। ১৫০০ জনকে অভিযুক্ত করা হলেও সাক্ষী দুই নারীসহ মাত্র ৫ জন।
রফিকুলের প্রতিবেশী ও চাচাতো ভাই এসএ মুকুল মামলার অভিযোগের বিষয়ে বিস্ময় প্রকাশ করে ফেসবুকে লেখেন, শহীদ রকিবুল ইসলাম রকি গত ৫ আগস্ট স্বৈরাচারের পতনের খবর পেয়ে পাইকগাছা চাঁদখালী বাজারে পতাকা উত্তোলনের সময় বিদ্যুতস্পর্শে স্পটেই মারা যায়। ছেলেটির বাবার এক চোখ অন্ধ, খুবই গরিব অসহায়। কে বা কারা তার বাবার নাম ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে আবেদন করেছে অনেক মানুষের নামে। বিষয়টি নিয়ে এলাকায় এক ধরনের ধূম্রজাল তৈরি হয়েছে।
মামলার আবেদনের বিষয়টি প্রথম সাংবাদিকদের জানান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সহ-সমন্বয়ক ও খুলনার বিএল কলেজের শিক্ষার্থী সাজিদুল হাসান বাপ্পী। রকির বাবার কাছে যাওয়া ওই দুই তরুণের ছবি দেখিয়ে পরিচয় জানতে চাইলে বাপ্পী জানান, আন্দোলনে এরাও ছিলেন। কিন্তু বিস্তারিত পরিচয় এবং মামলার আবেদন বা আসামিদের নাম কীভাবে এসেছে তা তিনি জানেন না।
পাইকগাছা উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক মোল্লা ইউনুস আলী সাংবাদিকদের বলেন, আন্দোলনের পুরোটা সময় রকি সামনের সারিতে ছিলেন। শেখ হাসিনা পালিয়ে গেছেন শুনে আমরা মিছিল নিয়ে বিএনপি অফিসের সামনে চলে আসি। এ সময় জাতীয় পতাকা টানাতে গিয়ে রকি বিদ্যুৎস্পর্শে মারা যান। খুঁটিতে পরিকল্পিতভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়েছিল বলে মনে হয়নি। তবে রকিকে শহীদের মর্যাদা দিতে আমরা বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি।