চরফ্যাশন (ভোলা) প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৪ নভেম্বর ২০২৪ ২১:১২ পিএম
আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০২৪ ২১:২৩ পিএম
ভোলার চরফ্যাশনে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় ১৫ টাকা কেজি দরে চাল বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। উপজেলার পৌরসভাসহ ২২ ইউনিয়নের নিয়োগপ্রাপ্ত ৫০ ডিলার বিভিন্ন অনিয়ম করছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৫০ জন ডিলারের আওতায় ২৪ হাজার ৩৮৮ জন সুবিধাভোগী কার্ডধারী রয়েছে। ডিলাররা নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ৩০ কেজির স্থলে ২৫/২৬ কেজি চাল ও ৪৫০ টাকার পরিবর্তে সাড়ে ৫০০ টাকা আদায় করেছেন বলে অভিযোগ। এ ছাড়াও অনেক ডিলার সুবিধাভোগীদের কার্ড ও টাকা জমা নিয়ে চাল না দিয়ে খালি হাতে ফিরিয়ে দিয়েছেন।
খাদ্য অফিস সূত্রে জানা যায়, সুবিধাভোগী কার্ডধারীর জন্য সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে ১৫৯৪ দশমিক ৯২ টন চালের বরাদ্দ দেওয়া হয়। ডিলারদের কাছ থেকে চালান জমা নিয়ে ইতঃপূর্বে দুই কিস্তি ও চলতি মাসে চাল ছাড় দেওয়া হয়েছে। উপজেলা ইউনিয়নের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির নিয়োগপ্রাপ্ত ডিলাররা সুবিধাভোগীদের মধ্যে চাল বিতরণ শুরু করেছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢালচর ও এওয়াজপুর, জিন্নাগড়, চর মনিকা ইউনিয়নের একাধিক ইউপি সদস্য জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর চর ফ্যাশন উপজেলার পৌরসভাসহ ২২ ইউনিয়নের নতুন ৫০ জন ডিলার নিয়োগ দিয়ে চাল বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয়। অসহায় পরিবারের জন্য সরকার খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় ৪৫০ টাকায় ৩০ কেজি চাল পাওয়ার কথা থাকলেও ডিলারদের কারসাজিতে সঠিকভাবে চাল পাচ্ছে না তারা। ৪৫০ টাকায় ৩০ কেজি চাল দেওয়ার কথা থাকলেও ২৫ থেকে ২৬ কেজি চাল বিতরণ করছেন। প্রত্যেক ইউনিয়নের ডিলার চাল ওজনে কম দেওয়ার পাশাপাশি অতিরিক্ত টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। প্রতিবাদ করলে চাল ছাড়াই বাড়ি ফিরতে হয় সুবিধাভোগীদের। ডিলারদের অনিয়মের কারণে সরকারি সুবিধা বঞ্চিত হচ্ছে অসহায় পরিবারগুলো।
জিন্নাগড় ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সুবিধাভোগী মো. সিদ্দিক ও আলমগীর জানান, তাদের নামে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ১৫ টাকা কেজি দরের চালের কার্ড থাকলেও চাল বিতরণের দিন ওই ইউনিয়নের ডিলার মো. সুমন মাস্টার রোলে তাদের টিপসই রেখে চাল না দিয়ে কার্ড ফিরিয়ে দেন। এ ছাড়াও সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে দুই কিস্তিতে ৬০ কেজি চাল পাওয়ার কথা থাকলেও অনেক সুবিধাভোগী বাস্তবে পেয়েছেন ২৬ কেজি চাল।
কুকরি-মুকরি ইউনিয়নের সুবিধাভোগী মো. গিয়াস উদ্দিন জানান, তিনি তার প্রাপ্ত কার্ডের চাল আনতে গেলে তার কার্ড রেখে বিদায় করে দেন ইউসুব মাস্টার। তিনি চাল না পেয়ে খালি হাতে বাড়ি ফিরেছেন।
চর মনিকা ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের জেলে মো. জাহাঙ্গীর জানান, ওই ইউনিয়নের চাল বিতরণের সময় ডিলার মনির হোসেন তার কাছ থেকে কার্ড জমা নিয়ে ১ হাজার টাকা আদায় করেন। কার্ডসহ অতিরিক্ত টাকা নিয়েও চাল দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ তার।
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে উপজেলার একাধিক ডিলার জানান, ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও সম্পাদকের নির্দেশনায় তাদের চাল বিতরণ করতে হয়। তাই সুবিধাভোগীদের মধ্যে চাল বিতরণে বিঘ্ন হয়। সুবিধাভোগীদের চালের একটা অংশ বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে বিতরণ করতে বাধ্য করেন নেতারা। এসব নিয়ে মহাসংকট পোহাতে হচ্ছে তাদের।
চর কুকরি মুকরি ইনিয়নের ডিলার মো. ইউসুব আলী জানান, বিএনপি নেতাদের চাপে তিনি সঠিকভাবে চাল বিতরণ করতে পারেননি। তবে কিছু কার্ডধারীকে এক বস্তা করে বিতরণ শুরু করলেও স্থানীয়দের চাপে পরে তিনি দুই কিস্তির চাল দুই বস্তায় ৬০ কেজি বিতরণ করেছেন। চর মনিকা ইউনিয়নের ডিলার মো. মনির হোসেন জানান, সঠিকভাবেই চাল বিতরণ করেছেন।তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সঠিক নয়।
খোদেজাবাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও চর মনিকা ইউনিয়নের চাল বিতরণ তদারকি কর্মকর্তা মো. ছালাউদ্দিন জানান, প্রথম সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে ডিলার দুই কিস্তির চাল দুই বস্তার পরিবর্তে এক বস্তা করে বিতরণ শুরু করলে বাধার মুখে তা পারেননি। পরে সুবিধাভোগীদের দুই কিস্তির চাল দুই বস্তাই বিতরণ করেছেন।
চর কুকরি মুকরি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সামসুল হক মাতাব্বর জানান, তিনি উপস্থিত থেকে চাল বিতরণ করেছেন। তবে কিছু বিএনপির কর্মী এসে চাল চেয়েছে। কিন্তু তাদেরকে দেওয়া হয়নি। নিজেদের গা বাঁচাতে ডিলাররা অনেক বিষয়ই তাদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে থাকেন। তবে কিছু সুবিধাভোগীর কার্ড থাকলেও তালিকায় তাদের নাম ছিল না। তাই তারা চাল পাননিÑ এটা সত্য।
উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা আবুবকর সিদ্দিক জানান, বিষয়টি খতিয়ে খুব দ্রুত এসব ডিলারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাসনা শারমিন মিথি জানান, সুবিধাভোগীদের অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়গুলো খতিয়ে দেখে ডিলারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।