নিহত তিন শিক্ষার্থীর দাফন সম্পন্ন
প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২৪ নভেম্বর ২০২৪ ২০:১৮ পিএম
পিকনিক বাস বিদ্যুতায়িত হয়ে গাজীপুরে ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির (আইইউটি) তিন শিক্ষার্থীর মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা মেনে নিতে পারছে না শোকাহত পরিবারগুলো। প্রতিষ্ঠানটির মেকানিক্যাল অ্যান্ড প্রডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন সবাই। আর কয়দিন পরই তারা প্রবেশ করতেন কর্মজীবনে। অপেক্ষা করছিল সুন্দর ভবিষ্যৎ, তাদের নিয়ে পরিবারের আশাও ছিল অনেক। এমন মৃত্যুর জন্য কার কাছে বিচার চাইবে পরিবারগুলো। কান্না ছাড়া মনের অভিব্যক্তি প্রকাশের ভাষা যারা হারিয়ে ফেলেছে।
গত শনিবার গাজীপুরের শ্রীপুরের দুর্ঘটনায় নিহত তিন শিক্ষার্থীর দাফন সম্পন্ন হয়েছে। সাদা কাপড়ে মোড়ানো কফিনবন্দি লাশগুলো পরিবারের কাছে পৌঁছলে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া। নিহত তিন শিক্ষার্থী হলেনÑ ফেনীর মাস্টারপাড়া এলাকার মোতাহার হোসেনের ছেলে মীর মোজাম্মেল (২৩), রাজশাহীর পবা উপজেলার মুরারীপুর গ্রামের জাহাঙ্গীর আলমের ছেলে জোবায়ের আলম সাকিব (২২) এবং রংপুর সদরের ইমতিয়াজুর রহমানের ছেলে মুবতাসিম রহমান মাহিন(২২)।
ফেনীতে দাদা-দাদির কবরের পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন নাঈম
পিকনিকের বাসে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে নিহত মেধাবী শিক্ষার্থী মোজাম্মেল হোসেন নাঈমের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। গতকাল রবিবার সকালে ফেনী শহরতলির ফতেহপুর কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে জানাজা শেষে দাদা-দাদির কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হন নাঈম। জানা যায় আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ছাড়াও স্থানীয়রা অংশ নেন জানাজায়।
সরেজমিন দেখা যায়, জানাজার পর বাবা মোতাহার হোসেন প্রিয় সন্তানের লাশের খাটিয়া বহন করছেন। ফেনীর ফাজিলপুর সাউথইস্ট ডিগ্রি কলেজের হিসাববিজ্ঞানের অধ্যাপক তিনি।
নাঈমের বাবা বলেন, আমার ছেলে অত্যন্ত নম্র-ভদ্র, বিনয়ী ও মেধাবী ছিল। দেশবাসীর কাছে ছেলের জন্য দোয়া চাই। আল্লাহ যেন আমার ছেলেকে শহিদী মর্যাদা দান করেন। আমরা যেন এ শোক কাটিয়ে উঠতে পারি, সেজন্য সবার দোয়া চাই।
গত শনিবার ভোরে নাঈমের লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে। এ সময় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। তাকে এক নজর দেখতে বাড়িতে ভিড় জমায় আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী ও সহপাঠীরা। তার মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে আসে গ্রামজুড়ে।
নাঈমের সহপাঠী আব্দুল্লাহ বলেন, আমাদের বন্ধুদের মধ্যে নাঈম ব্যতিক্রম ছিল। সে সহজে সবার সঙ্গে মিশতে পারত। বাবা-মায়ের স্বপ্ন ছিল ছেলে দেশসেরা প্রকৌশলী হবে। সেই স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে গেল। এ ঘটনায় জড়িতদের তদন্তের মাধ্যমে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাই।
নাঈমের চাচা মোফাচ্ছের হোসেন মামুন বলেন, পরিবারে দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে নাঈম দ্বিতীয়। তার বড় ভাই শারীরিকভাবে কিছুটা অসুস্থ। নাঈম খুবই নম্র-ভদ্র ও মেধাবী ছিল। ২০১৯ সালে ফেনী সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন।
সাকিবের মৃত্যুতে বাকরুদ্ধ পরিবার
পিকনিক বাসে বিদ্যুতায়িত হয়ে মৃত্যুতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের গাফিলতি দেখছেন নিহত জোবায়ের আলম সাকিবের স্বজনরা। গ্রামের রাস্তায় কেন উঁচু দ্বিতল বাস নেওয়া হয়েছিল, সে প্রশ্ন তুলে তারা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের গাফিলতির কারণেই এ দুর্ঘটনা। যারা এই গাফিলতি করেছেন তাদের শাস্তি হতে হবে। গতকাল রবিবার সকালে সাকিবের জানাজার আগে এমনটাই দাবি করেন তার আত্মীয়রা।
তবে সাকিবের বোন নাইমাতুল জান্নাত শিফা গণমাধ্যমের সামনে কোনো কথা বলতে রাজি হননি। গতকাল সকালে রাজশাহীর রাজপাড়া ডিঙ্গাবো এলাকায় সাকিবের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় উঠোনভর্তি মানুষ। স্থানীয় নারীরা সাকিবের মা ও বোনকে ঘিরে কান্না করছে। এ সময় সাংবাদিকদের উপস্থিতি দেখে শিফা এগিয়ে এসে সবাইকে চলে যেতে বলেন।
সাকিবের বাবা জাহাঙ্গীর আলম, অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা। মা ফজলেতুন্নেসা সেফা জেলার মুরারিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। এই দম্পতির দুই সন্তানের মধ্যে ছোট ছিলেন সাকিব। বড় মেয়ে শিফা বেসরকারি মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ফাইনাল দিয়েছেন। মেধাবী সাকিব রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল থেকে এসএসসি এবং রাজশাহী সরকারি সিটি কলেজ থেকে এইচএসসি উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। দুই পরীক্ষাতেই সব বিষয়ে জিপিএ-৫ পেয়ে সাকিব আইইউটিতে ভর্তি হয়েছিলেন।
সাকিবের বন্ধু সোহেল পারভেজ বলেন, ছোটবেলা থেকেই সাকিব ধীর-স্থির। তার নামে এলাকায় কারও কোনো অভিযোগ নেই। এমন দুর্ঘটনায় সাকিবের বন্ধুমহল থেকে শুরু করে গ্রামবাসীর মাঝে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাকিবের একজন নিকটাত্মীয় জানান, সাকিবের লাশ যাতে ময়নাতদন্ত করতে না হয়, সে কারণে পরিবারের তরফ থেকে কোনোরকম অভিযোগ বা মামলা করা হচ্ছে না। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের উদাসীনতায় তারা চরম মর্মাহত।
রবিবার সকাল ১০টায় তার সাকিবের জানাজায় অংশ নেন তার সহপাঠী, বন্ধু, স্বজনসহ গ্রামের সহস্রাধিক মানুষ। জানাজায় অংশগ্রহণকারীরা জানান, পিকনিক গিয়ে এভাবে মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এ ঘটনায় যার যার অবহেলা ও গাফিলতি আছে, তা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তারা। এর আগে শনিবার রাতে সাকিবের মরদেহবাহী গাড়ি রাজশাহীতে পৌঁছে।
বড় ছেলেকে হারিয়ে কান্না থামছে না মাহিনের বাবা-মায়ের
গাজীপুরে পিকনিকের বাসে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির নিহত শিক্ষার্থী রংপুরের মুবতাসিম রহমান মাহিনের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। গতকাল রবিবার বাদ জোহর করিমিয়া নূরুল উলুম মাদ্রাসা মাঠে জানাজার অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় মাহিনের স্বজন, স্কুল-কলেজের বন্ধুসহ স্থানীয়রা অংশ নেয়। এরপর মুন্সিপাড়া কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। এর আগে শনিবার রাত দেড়টার দিকে গাজীপুর থেকে অ্যাম্বুলেন্স করে মাহিনের মরদেহ নগরীর জুম্মাপাড়ার বাসায় আনা হয়। তার মরদেহ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন পরিবারের সদস্য, আত্মীয়-স্বজন ও এলাকাবাসী। পরিবারের বড় ছেলেকে হারিয়ে কান্না থামছে না মাহিনের বাবা-মায়ের। এ সময় বিদ্যুৎ বিভাগ ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের গাফিলতির কারণে অকালে তিন তরুণ প্রাণ ঝরেছে বলে অভিযোগ করেন মাহিনের স্বজনরা।
মাহিনের চাচা হাসান রহমান বলেন, পরিবারের একটা দামি জীবন চলে গেছে। ছেলেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠালাম লেখাপড়া করতে, সে ফিরল লাশ হয়ে। বিদ্যুৎ বিভাগ ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের গাফিলতির কারণে অকালে আমাদের সন্তান দুনিয়া থেকে চলে গেল। দায়ীদের বিচার দাবি করছি।
মাহিনের চাচাতো ভাই ইমতিয়াজ রহমান বলেন, মাহিন ভাই ভালো মানুষ ছিলেন। তিনি সবার প্রিয় এবং কারও সাথে কখনও দুর্ব্যবহার করেননি। আমার ভাইয়ের মতো এমন মৃত্যু যেন কারও না হয়।
রংপুর নগরীর জুম্মাপাড়ার বাসিন্দা শাহীন ইমতিয়াজুর রহমানের ছেলে মুবতাসিম মাহিন। দুই ভাইয়ের মধ্যে মাহিম বড় ছিলেন।
[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট জেলার প্রতিবেদকগণ]