সুজন কৈরী
প্রকাশ : ২৪ নভেম্বর ২০২৪ ১০:০৭ এএম
আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০২৪ ১১:১৭ এএম
গ্রাফিক্স : প্রতিদিনের বাংলাদেশ
মানসম্মত গণপরিবহনের অনুপস্থিতি ও যানজটের কারণে মোটরসাইকেলের ব্যবহার রাজধানীসহ সারা দেশে অস্বাভাবিক হারে বেড়ে চলেছে। গণপরিবহনের অব্যবস্থাপনা ও বিশৃঙ্খলায় মোটরবাইক অনেকের কাছেই হয়ে উঠেছে স্বস্তিদায়ক বিকল্প। বর্তমানে রাইড শেয়ারিংয়ের কারণেও দুই চাকার এই যানের ব্যবহার অনেক বেড়েছে। তবে পাশাপাশি বেড়েছে সড়ক-মহাসড়কে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনাও। অধিকাংশ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনাই ঘটছে ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, পিকআপ ও বাসের ধাক্কা, চাপা ও মুখোমুখি সংঘর্ষে। মোটরসাইকেলচালকদের অধিকাংশই কিশোর-যুবক।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রশিক্ষণের অভাব, সড়কে বেপরোয়া গতি ও সড়ক পরিবহন আইন না মেনে চলাচল করায় ঘটছে পরিবহন দুর্ঘটনা। সড়কের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা না থাকাও এসব দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির অন্যতম কারণ। উদ্বিগ্ন অভিভাবক ও নাগরিকরা মনে করছেনÑ মোটরসাইকেল বর্তমানে পরিণত হয়েছে দুই চাকার মৃত্যুদূতে।
রাজধানীতে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বেশি ঘটছে গুলিস্তানের মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইভারে। এ ছাড়া মাওয়া একপ্রেসওয়ে ও চট্টগ্রামের এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতেও ঘটছে এ দুর্ঘটনা। এসব ফ্লাইওভার ও এক্সপ্রেসওয়েতে গত কয়েক মাসে দুর্ঘটনায় নিহত-আহত হয়েছে বেশ কয়েকজন। মৌচাক, মহাখালী ও খিলগাঁও ফ্লাইওভারেও প্রায়ই শোনা যায় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার খবর।
মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় হতাহতের পরিসংখ্যান
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত অক্টোবর মাসে সারা দেশে ৪০৫টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রাণ হারিয়েছে ৩৭৭ জন। আহত হয়েছে ৪১৫ জন। এসব দুর্ঘটনার মধ্যে ১৩৬টিই হচ্ছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা। যা মোট দুর্ঘটনার ২১ দশমিক ৫৯ শতাংশ। এর আগে সেপ্টেম্বর মাসে সারা দেশে ৩৬৭টি দুর্ঘটনায় মৃত্যু ঘটে ৩৬১ জনের। আহত হয় ৩৭৭ জন। এর মধ্যে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ছিল ১৩২টি। যা মোট দুর্ঘটনার ২২ দশমিক ৬৪ শতাংশ। গত আগস্টে সারা দেশে ২১৪টি দুর্ঘটনার মধ্যে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটে ৭২টি। যা মোট দুর্ঘটনার ২১ দশমিক ১১ শতাংশ। জুলাই মাসে সারা দেশে ৩৮৫টি সড়ক দুর্ঘটনার মধ্যে ১০৩টি হচ্ছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা। জুন মাসে ৭৩০টি সড়ক দুর্ঘটনার ২৩৩টিই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা। মে মাসে ৫১০টি দুঘটনার মধ্যে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ছিল ১৬১টি। এপ্রিল মাসে ৬৫৮টি সড়ক দুর্ঘটনার মধ্যে ২৫২টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটে।
সড়ক দুর্ঘটনা পর্যবেক্ষণ ও পরিবীক্ষণকারী সংগঠন রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, গত অক্টোবর মাসে সারা দেশে ৪৪৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয় ৪৬৯ জন। এসব দুর্ঘটনার মধ্যে ২০৮টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ১৯৬ জন। যা মোট নিহতের ৪১ দশমিক ৭৯ শতাংশ। অক্টোবরের মোট দুর্ঘটনার ৪৬ দশমিক ৯৫ শতাংশই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা। এর আগের ৯ মাসে (জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত) সারা দেশে ৫ হাজার ৪৮৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫ হাজার ৫৯৮ জন নিহত এবং ৯ হাজার ৬০১ জন আহত হয়। এসব দুর্ঘটনার মধ্যে ২ হাজার ৪১টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হয় ১ হাজার ৯২৪ জন। যা মোট দুর্ঘটনার ৩৭ দশমিক ২১ শতাংশ।
সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করছে এমন আরেকটি সংগঠন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। গত ২১ অক্টোবর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক আলোচনা সভায় গত ১১ বছরের সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিবেদন তুলে ধরেন এ সংগঠনের মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী। তিনি জানান, ২০১৪ থেকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১১ বছরে দেশে ৬০ হাজার ৯৮০টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত হয়েছে ১ লাখ ৫ হাজার ৩৩৮ জন। আহত হয়েছে ১ লাখ ৪৯ হাজার ৮৪৭ জন। সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা গেছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়। এ সময় ২০ হাজার ১২৪টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ৩৭ হাজার ৫৫৩ জন নিহত ও ৪৬ হাজার ১৬৭ জন আহত হয়েছে। যা মোট নিহতের ৩৯ দশমিক ৬৫।
জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের (পঙ্গু হাসপাতাল) কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ওই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যাওয়া সারা দেশের বিভিন্ন দুর্ঘটনায় আহতদের অধিকাংশই মোটরসাইকেল আরোহী। তাদের ৭০ শতাংশই তরুণ।
জনপ্রিয়তার কারণ সহজলভ্যতা ও গতিশীলতা
দুর্ঘটনাপ্রবণ বাহন হওয়ার পরও মোটরসাইকেলের জনপ্রিয়তার কারণ এর সহজলভ্যতা ও গতিশীলতা। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সাল পর্যন্ত দেশে নিবন্ধিত মোটরসাইকেল ছিল ১৫ লাখের কম। বর্তমানে নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যা প্রায় ৪২ লাখ। ২০১৬ সাল থেকে প্রতিবছর ৩ লাখের বেশি মোটরসাইকেল নিবন্ধিত হচ্ছে। শুধু রাজধানীতেই চলছে ১৫ লাখের বেশি মোটরসাইকেল। মানসম্মত গণপরিবহনের অনুপস্থিতি, পরিবহন খাতের অব্যবস্থাপনা এবং সড়ক-মহাসড়কে যানজটের কারণে মোটরসাইকেলের ব্যবহার অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। উন্নত দেশগুলোতে মোটরসাইকেল চার চাকার যানবাহনের তুলনায় ২৯ গুণ বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। মহাসড়ক, আঞ্চলিক সড়ক ও গ্রামীণ সড়কে মোটরসাইকেল চালানোর ক্ষেত্রে চালকেরা নিয়ম মানছেন না। অনেকে নিয়ম-কানুন জানেন না এবং যথাযথভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্তও নন। চালক ও আরোহীরা হেলমেট পরে না। এক মোটরসাইকেলে দুজনের বেশি না ওঠার নিয়মটিও মানা হয় না। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে অনিবন্ধিত মোটরসাইকেলও চলে অহরহ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মোটরসাইকেল ঝুঁকিপূর্ণ বাহন। কারণ এটি চালনার ক্ষেত্রে ভারসাম্য ঠিক থাকে না। কিন্তু একদিকে সহজলভ্য হওয়ায়, অন্যদিকে নগরজীবনে গতিশীলতা অপরিহার্য হওয়ায় এর ব্যবহার ঠেকানো যাচ্ছে না। মহাসড়কে মোটরসাইকেলে যাত্রী পরিবহন সম্পূর্ণভাবে নিরুৎসাহিত করার পরামর্শ দিয়ে তারা বলছেন, মোটরসাইকেল দূরপাল্লার বাহন হিসেবে ব্যবহার করা ঝুঁকিপূর্ণ। এটাকে পুরোপুরি নিরুৎসাহিত করা প্রয়োজন। যারা মোটরসাইকেলে চলবেন, তাদের মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার করা দরকার। চালক ছাড়া একজনের বেশি যাত্রী পরিবহন করা নিষিদ্ধ করা প্রয়োজন। তারা মনে করেন, মোটরবাইকচালক ও যাত্রীদের মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার ও ট্রাফিক আইন মানতে বাধ্য করা প্রয়োজন।
ঝুঁকি কমাতে প্রয়োজন সচেতনতা ও সুষ্ঠু ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়কে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে হলে প্রথমেই কিশোর-যুবকদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। মাত্রাতিরিক্ত গতিসম্পন্ন মোটরসাইকেল উৎপাদন, বিক্রি ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। দক্ষ চালক তৈরির উদ্যোগ বাড়াতে হবে। ট্রাফিক আইনের বাধাহীন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। মহাসড়কে মোটরসাইকেলের জন্য আলাদা লেন তৈরি করতে হবে এবং স্বল্পগতির স্থানীয় যানবাহন বন্ধ করতে হবে। স্বল্পগতির যানবাহনের জন্য মহাসড়কের পাশাপাশি সার্ভিস রোড নির্মাণ করতে হবে। পর্যায়ক্রমে সকল মহাসড়কে রোড ডিভাইডার নির্মাণ করতে হবে। গণপরিবহন উন্নত ও সহজলভ্য করে মোটরসাইকেল নিরুৎসাহিত করতে হবে। রেল ও নৌপথ সংস্কার এবং বিস্তৃত করে সড়কপথের ওপর থেকে ট্রাক-কাভার্ড ভ্যানের মতো পণ্যবাহী যানবাহনের চাপ কমাতে হবে। সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে গণমাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচার চালাতে হবে এবং সড়ক পরিবহন আইন সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান সম্প্রতি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘সড়কে অব্যবস্থাপনার কারণে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বাড়ছে। সড়কগুলোতে মোটরসাইকেল চলাচলের জন্য পৃথক লেন নেই। ফলে ভারী যানবাহনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ঝুঁকি নিয়েই মোটরসাইকেল চালাতে হচ্ছে চালকদের। মোটরসাইকেলচালকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ নেই। এটিও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।’ তিনি বলেন, ‘উন্নত দেশগুলোয় সুষ্ঠু ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা থাকার পরও গবেষণা অনুযায়ী সেসব দেশে চার চাকার যানবাহনের চেয়ে দুই চাকার যানে ২৯ শতাংশ ঝুঁকি বেশি থাকে। সেখানে আমাদের দেশে এই ঝুঁকি আরও বেশি।’
মোটরসাইকেলচালক ও আরোহীদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘দেশে বর্তমানে উচ্চ সিসির মোটরসাইকেল ক্রয় ও ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে অধিক মাত্রায় সতর্ক হতে হবে। গবেষণাভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আর মোটরসাইকেল সহজলভ্য না করে ভালো মানের সার্টিফায়েড হেলমেট সহজলভ্য করা উচিত। সড়কে আইনের প্রয়োগ করতে হবে কঠিনভাবে। অভিভাবকদেরও সন্তানদের মোটরসাইকেল চালানোর বিষয়ে সচেতন হতে হবে।’
যা বলছে হাইওয়ে পুলিশ
হাইওয়ে পুলিশের রংপুর অঞ্চলের এসপি (অতিরিক্ত ডিআইজি পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ জাকারিয়া বলেন, ‘উঠতি বয়সি কিশোর ও তরুণরা সঠিক প্রশিক্ষণ না নিয়ে, নিয়ম না জেনেই মহাসড়কে মোটরসাইকেল চালচ্ছে। তারা হেলমেট না পরে সড়কে বেপরোয়া গতিতে অন্য যানবাহনকে ওভারটেক করতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। এমনও দেখা যায় যে, দুই-তিনজন একই বাইকে উঠছে।’ তিনি বলেন, ‘মহাসড়কে দ্রুতগতিসম্পন্ন বড় বড় দূরপাল্লার যানবাহন চলাচল করে। সেসব যানবাহনের সঙ্গে একই সড়কে মোটরসাইকেল চালানো কঠিন। সেখানে উঠতি বয়সি কিশোর ও তরুণরা রেসিং দিচ্ছে। ওভারটেক করছে। এতেই ঘটছে দুর্ঘটনা। পুলিশের বিভিন্ন সময়ের অভিযানে দেখা গেছে, এসব উঠতি বয়সের কিশোর-তরুণরা লার্নার লাইসেন্স দিয়ে বাইক ড্রাইভ করছে। হেলমেট পরছে না। মহাসড়কে চলাচলের নিয়মও জানে না।’
এসব প্রতিকারের বিষয়ে পুলিশ কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাকারিয়া বলেন, ‘আমরা প্রায় প্রতিদিনই মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি করছি। মামলা দিচ্ছি। কিন্তু এরপরও মোটরসাইকেল চালানো হচ্ছে। এমনও হয়েছে যে, হাইওয়ে পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করা হচ্ছে।’
মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় হতাহতের ঘটনায় অভিভাবকদেরও দায় দেখছেন এই পুলিশ কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ‘সন্তানরা চাওয়ামাত্রই অভিভাবকরা প্রয়োজন না থাকলেও মোটরসাইকেল কিনে দিচ্ছেন। অভিভাবকদের এ বিষয়ে তো আরও বেশি সতর্ক হওয়া উচিত। তাহলে দুর্ঘটনা অনেকাংশেই কমবে।’
হাইওয়ে পুলিশের ডিআইজি (প্রশাসন) মো. রেজাউল করিম বলেন, ‘মোটরসাইকেলচালকদের আইন না মানার প্রবণতা থাকার কারণে তারা দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন। আবার দ্রুতগতিতে চালাতে গিয়েও দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন। পুলিশের পক্ষ থেকে প্রতিদিনই চেকপোস্ট বসিয়ে চেক করা হচ্ছে, প্রয়োজনে মামলা দেওয়া হচ্ছে।’
কয়েকটি সাম্প্রতিক মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা
গত ৯ নভেম্বর চট্টগ্রাম নগরের এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় দুই যুবকের মৃত্যু ঘটে। নিহতরা হলেনÑ মোকতার (২৮) ও রুবেল (৩৬)। তারা নগরের সদরঘাট থানার মাদারবাড়ী এলাকার বাসিন্দা। পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকা থেকে তারা মোটরসাইকেলে করে এক্সপ্রেসওয়ে ধরে শহরে যাচ্ছিলেন। পুলিশ জানায়, মোটরসাইকেলটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এক্সপ্রেসওয়ের বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে ধাক্কা লাগে। এতে তারা দুজন ছিটকে পড়েন। ঘটনাস্থলেই তাদের মৃত্যু হয়।
একই দিন লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে বাসের ধাক্কায় শাকিব হোসেন (১৬) নামে এক মোটরসাইকেল আরোহী কিশোর নিহত হয়। শাকিব রামগঞ্জ পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কলচমা এলাকার মুন্সিবাড়ির আবুল কাশেমের ছোট ছেলে। পুলিশ জানায়, বাড়ি থেকে উপজেলার কাটাখালী এলাকায় যাওয়ার পথে জননী পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে শাকিবের মোটরসাইকেলের মুখোমুখি ধাক্কা লাগে। এতে তার মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন অংশে গুরুতর আঘাত লাগে। পরে স্থানীয়রা শাকিবকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়। সেখানে চিকিৎসক তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নিয়ে যেতে বলেন। পরে ঢাকায় নেওয়ার পথে রাতেই তার মৃত্যু হয়।
একই দিন ৯ নভেম্বর বরিশালের মুলাদীর চরকালেখান ইউনিয়নের নোমরহাট বাজারসংলগ্ন একটি ব্রিজের কাছে মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুই বন্ধু নিহত ও আরও দুজন আহত হয়। নিহতদের মধ্যে রয়েছেনÑ চরকালেখান ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর গ্রামের বাসিন্দা মো. স্বপন ভূঁইয়া (৩৫) এবং মো. কাওসার হোসেন (২৫)। তারা উভয়েই পেশায় অটোরিকশাচালক ছিলেন। একই দিন লালমনিরহাটের কালীগঞ্জে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ফিরোজ হোসেন জিহাদ বাবু (৫২) নামে এক আওয়ামী লীগ নেতার মৃত্যু হয়েছে। মৃত আওয়ামী লীগ নেতা জেলার হাতীবান্ধা উপজেলার ভেলাগুঁড়ি ইউনিয়নের মধ্যকাদমা এলাকার মৃত রুহুল আমিনের ছেলে। তিনি হাতীবান্ধা উপজেলার ভেলাগুঁড়ি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি।
গত ৮ নভেম্বর মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরে ট্রাকচাপায় মোটরসাইকেল আরোহী দুই তরুণ নিহত হয়। আহত হয় মোটরসাইকেল আরোহী আরেকজন। নিহতরা হলেনÑ সিঙ্গাইরের ইরতা গ্রামের বাঁধন হোসেন (১৯) ও মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার গড়পাড়া গ্রামের রাতুল হোসেন (২৫)। আহত লাদেন হোসেনের (১৮) বাড়ি ইরতা গ্রামে। পুলিশ জানায়, তিন তরুণ মোটরসাইকেলে উপজেলা সদরের দিকে যাচ্ছিলেন। ইরতা উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি ট্রাক তাদের চাপা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই মোটরসাইকেলচালক বাঁধন নিহত হন।
গত ৭ নভেম্বর ভোরে সাতক্ষীরা-খুলনা মহাসড়কের বিনেরপোতা এলাকায় ট্রাকচাপায় মোটরসাইকেলে থাকা তিন আরোহী নিহত হয়। তারা হলেনÑ যশোরের ঝিকরগাছার আকবর আলী গাজীর ছেলে আরিজুল গাজী (২৮), সাতক্ষীরার তালার শামসুর কবিরের ছেলে আসাদুল ইসলাম ফকির (৫৫) ও একই উপজেলার সুজনশাহা গ্রামের আব্দুল আজিজের ছেলে আব্দুস সেলিম (৩৫)। পুলিশের ধারণা, ট্রাক ও মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে এই প্রাণহাণি ঘটেছে।
৫ নভেম্বর দিনাজপুর-গোবিন্দগঞ্জ মহাসড়কের জোয়ালকামড়া এলাকায় ট্রাকের চাপায় রিফাত হোসেন ও খোকা বাবু নামের দুই বন্ধু মারা যান। নিহত রিফাত হোসেন বিরামপুর পৌর শহরের সারাংগপুর মহল্লার জিয়ারুল ইসলামের ছেলে। তার বন্ধু খোকা বাবু ওই এলাকার মৃত রফিকের ছেলে। রিফাত মুদি দোকানি ছিলেন। নিহতদের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, রিফাত ওই দিন দুপুরে খাবার খেয়ে বন্ধুকে মোটরসাইকেলে নিয়ে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খোলার উদ্দেশ্যে বিরামপুর শহরের দিকে রওনা হয়। কিছুক্ষণ পর দোকান না খুলে বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে বিজুল এলাকায় যান। সেখান থেকে শহরে ফেরার পথে পৌর শহরের জোয়ালকামড়া এলাকায় একটি ট্রাককে পাশ কাটাতে গিয়ে সেটির নিচে চাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই রিফাতের মৃত্যু হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় খোকা বাবুকে উদ্ধার করে বিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করেন। পরে বিকাল সোয়া ৫টায় দিকে মোহনপুর এলাকায় খোকা বাবুর মৃত্যু হয়।
গত ৩ নভেম্বর কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ার মঠখোলা নতুনবাজার এলাকায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাছের সঙ্গে ধাক্কা লেগে রাস্তার পাশে মোটরসাইকেল আরোহী দুই বন্ধু নিহত হয়। নিহতরা হলেনÑ পাকুন্দিয়া উপজেলার এগারসিন্দুর ইউনিয়নের চরখামা এলাকার কামাল হোসেনের ছেলে পলাশ (১৭) ও আসাদ মিয়ার ছেলে রিয়াদ (১৮)।
গত ২৪ অক্টোবর দিবাগত রাতে রাজধানীর চন্দ্রিমা উদ্যানসংলগ্ন লেক রোডে দুটি গাড়ির মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটে। এতে একটি সরকারি স্টিকারযুক্ত গাড়ি ও একটি ব্যক্তিগত গাড়ির মুখোমুখি সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে মারা গেছেন মোটরসাইকেলচালক আব্দুর রহমান। তিনি রাইড শেয়ার করতেন। সংঘর্ষে মোটরসাইকেল আরোহীসহ আরও বেশ কয়েকজন আহত হয়েছে।
গত ১১ অক্টোবর রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডে কাভার্ড ভ্যানের ধাক্কায় মো. ফুয়াদ মৃধা (৩২) নামে এক মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হন। নিহত ফুয়াদ পেশায় ড্রাইভার। তিনি আল নূর চক্ষু হাসপাতালে কাজ করতেন। অফিস শেষে নিজের মোটরসাইকেল নিয়ে কাজলায় ভাড়া বাসায় ফেরার পথে এলিফ্যান্ট রোডে মাল্টিপ্ল্যান সেন্টারের সামনে কাভার্ড ভ্যানের ধাক্কায় নিহত হন তিনি।