যশোর সংবাদদাতা
প্রকাশ : ২৭ নভেম্বর ২০২২ ১৭:১৫ পিএম
আপডেট : ২৭ নভেম্বর ২০২২ ১৭:৪৯ পিএম
চাঁচড়ার আশ্রয়ণ প্রকল্পের একাংশ। ছবি : প্রবা
যশোর সদর উপজেলার চাঁচড়ার আশ্রয়ণ প্রকল্পের ১১২ ঘরের বাসিন্দারা খাবার পানি সংকটে ভুগছেন। একই সঙ্গে বৃষ্টির পানি বারান্দা ছাপিয়ে ঘরে প্রবেশ করায় ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে তাদের।
প্রকল্পের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, এ দুটি সমস্যার পাশাপাশি রাস্তা না থাকা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সমস্যা এবং বহিরাগতদের উৎপাতে অতিষ্ঠ তারা।
যশোর সদর উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ সালের জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আশ্রয়ণ প্রকল্পের অধীনে চাঁচড়ায় ১০০টি ঘর ভূমিহীনদের হাতে দেওয়া হয়। পরে সেখানে আরও ১২টি ঘর তৈরি করে হস্তান্তর করা হয়েছে। এখন সেখানে ১১২টি পরিবার বসবাস করে। যাদের নামে ঘর বরাদ্দ হয়েছে; তারাই সেখানে বসবাস করছে। এই প্রকল্পের নাম দেওয়া হয় ‘শতবর্ষ’ প্রকল্প। প্রকল্পের আগে সেখানে ঘিঞ্জি ঘনবসতি আর দুর্গন্ধময় পরিবেশ ছিল। যে কারণে অনেকে সেটাকে বস্তি বলে অভিহিত করত। এখন ঘর নির্মাণের ফলে সেটা সুদর্শন পল্লী হিসেবে গড়ে উঠেছে। সেখানে এই পরিবারগুলোর জন্য নির্মিত ঘরের পাশাপাশি রয়েছে বিনোদন কেন্দ্র, পুকুর, বনায়ন, পাকা সড়ক, মসজিদসহ নানা সুবিধা।
তবে চাঁচড়ায় নির্মিত ‘প্রধানমন্ত্রীর শতবর্ষ আশ্রয়ণ প্রকল্প’ এলাকা ঘুরে বেশকিছু সমস্যা ও সংকট দেখা গেছে।
আশ্রয়ণ প্রকল্পের ৭ নম্বর ঘরের বাসিন্দা ভ্যানচালক আব্দুর রহিম জানান, আশ্রয়ণ প্রকল্পের মধ্যে কোনো রাস্তা ও ড্রেন নেই। তাই বৃষ্টি হলেই পানি জমে যায়; পানি ঘরে উঠে যায়। আর চাপকলগুলোতে আয়রন। পানি খাওয়া যায় না। বাইরে থেকে পানি আনতে হয়।
২১ নম্বর ঘরের বাসিন্দা ফাতেমা বেগম ডেকোরেশন কর্মী। তিনি জানান, বৃষ্টি হলেই পানি আটকে যায়। এতে তাদের বড় সমস্যা হয়। এখানে কোনো ড্রেন নেই। আর ঘরের মেঝে প্রায় মাটির সঙ্গেই। তাই বৃষ্টি হলেই পানি ঘরে চলে আসে। এখানে ১২টি চাপকল আছে। কিন্তু চাপকলের পানি খাওয়া যায় না। আর পানি ব্যবহার করলেও সেই পানিও আটকে থেকে সমস্যা সৃষ্টি করে। দুটি সাবমার্সেবল টিউবয়েল স্থাপন করা হলেও তার একটি নষ্টই থাকে। ফলে খাবার পানি বাইরে থেকে আনতে হয়।
ফাতেমার মা গৃহকর্মী রহিমা বেগম জানান, চাঁচড়ার এখানেই আগে তারা বসবাস করতেন। প্রধানমন্ত্রীর উপহার একটি ঘর তিনি পেয়েছেন। সেখানে দুই ছেলে নিয়ে বসবাস করছেন। আর দুই ছেলে ঘর না পাওয়ায় পাশের এলাকায় বউ-বাচ্চা নিয়ে ভাড়া থাকেন। তাদেরও একটা ঘর দরকার।
তুলা মিলের শ্রমিক ৬৭ নম্বর ঘরের বাসিন্দা সায়েরা বেগম বলেন, বাইরের লোকজন এখানে এসে সমস্যা করে। এর প্রতিবাদ করায় তার ছেলে রনিকে দেড় মাস আগে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে সন্ত্রাসীরা খুন করেছে। এখন আর প্রতিবাদ করার কেউ নেই। রাতে আশপাশে মাদক, জুয়ার আসর বসে। আর রাস্তা ড্রেনের পাশাপাশি এখানে ময়লা-আবর্জনা ফেলারও জায়গা নেই। আশ্রয়ণ প্রকল্পের উত্তর পাশে ময়লা ফেলা হয়। কিন্তু তা সেখানে থেকে সরানো হয় না। ফলে এই ময়লা থেকে গন্ধ ছড়ায়।
৮০ নম্বর ঘরের বাসিন্দা সবুর গাজীর স্ত্রী ফাতেমা বেগম বলেন, ঘর পাওয়ার পর কিছুদিন পরই ফাটল দেখা দিয়েছে। অনেক অফিসার এসে দেখেছেন, কিন্তু কোনো কাজ হয়নি।
৮৩ নম্বর ঘরের বাসিন্দা সুফিয়া বেগম বলেন, ঘর নির্মাণের সময় তারা বলেছিলেন, পোতা একটু উঁচু করে ঘর বানাতে। কিন্তু তাদের কথা কেউ শোনেনি। মাটির ওপরেই ইট গেঁথে ঘর বানানো হয়েছে। এখন বৃষ্টি হলেই ঘরে পানি চলে আসে।
দিনমজুর মোহাম্মদ ফারুকের স্ত্রী হেনা বলেন, বৃষ্টি হলে ঘরের নিচ দিয়ে পানি ওঠে, ওপর দিয়েও পানি পড়ে। বৃষ্টি শুরু হলে বালতি ভরে ঘর থেকে পানি ফেলতে হয়।
কাশেম আলী জানান, প্রকল্পের পুকুরের সামনে যে বসার জায়গা বানানো হয়েছে, তাতে বাইরের লোকজন এসে বসে থাকে, আড্ডা দেয়। বখাটেরা উৎপাত করে।
যশোর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অনুপ দাশ জানান, চাঁচড়া আশ্রয়ণ প্রকল্পে ১১২টি পরিবার বসবাস করে। এ ছাড়াও সদরে মোট তিন ধাপে ৫৪১টি ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। আরও ৫৫টি ঘর বরাদ্দ এসেছে। এই ঘরগুলো সবই খাসজমিতে নির্মাণ করা হয়েছে। এ কারণে কোনো জায়গায় রাস্তা ও ড্রেনের সমস্যা রয়েছে। আমরা বরাদ্দ পাওয়াসাপেক্ষে সেগুলো নির্মাণ করার চেষ্টা করছি।