রহিম শুভ, ঠাকুরগাঁও
প্রকাশ : ২২ নভেম্বর ২০২৪ ১৮:৫৩ পিএম
আপডেট : ২২ নভেম্বর ২০২৪ ১৮:৫৪ পিএম
‘আমাদের প্রতি মাসে অনেক বিদ্যুৎ বিল আসে। বারবার অভিযোগ করার পরও কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। গত অক্টোবর মাসে পরিবার নিয়ে আমরা ঢাকায় থাকি। বাসায় কোনো সংযোগ দেওয়া ছিল না। তবু আগের মতোই ৩ হাজার ১০০ টাকা বিল আসছে। অভিযোগ করতে গেলে কথা তো শোনেই না, বরং বাসার সংযোগ কেটে দিতে আসছে।’ অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন ঠাকুরগাঁও পৌরসভার হাজীপাড়ার বাসিন্দা শিলা মমতাজ লিপি।
কেবল শিলা মমতাজ নন, মিটার না দেখেই নিজেদের ইচ্ছামতো বিদ্যুৎ বিল প্রস্তুত করে নিয়মিত তা গ্রাহকের হাতে ধরিয়ে দেওয়ার এমন অভিযোগ ঠাকুরগাঁও পৌরসভার অধিকাংশ গ্রাহকের। এতে ব্যবহৃত ইউনিটের চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের।
গ্রাহকদের অভিযোগ, বিদ্যুতের ইউনিট ব্যবহার না করেও তাদের ওপর চাপানো হচ্ছে ভুতুড়ে বিলের বোঝা। কয়েক মাস পর পর অতিরিক্ত বিল করে তাদের কাছ থেকে বেশি ইউনিটের বিল নেওয়া হচ্ছে। বিদ্যুৎ অফিসের দায়িত্বরতরা মিটার না দেখেই ইচ্ছামতো গ্রাহকদের হাতে ধরিয়ে দিচ্ছেন বাড়তি বিলের কাগজ। ফলে প্রতি ইউনিটে যোগ হচ্ছে অতিরিক্ত অর্থ। কোনো কোনো মাসে দুই থেকে তিনগুণ টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে গ্রাহকদের। আর বিল পরিশোধ না করতে পারলেই করা হচ্ছে সংযোগ বিচ্ছিন্ন। এমন অবস্থা চলমান থাকলেও সংশ্লিষ্ট অফিসে ধরনা দিয়েও মিলছে না কোনো সমাধান। নর্দার্ন ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড (নেসকো) তাদের হাতে এই ভুতুড়ে বিল ধরিয়ে দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ নেসকোর তথ্যমতে, সদর উপজেলার আওতাভুক্ত এলাকায় ৪৩ হাজার ২০৭ জন গ্রাহককে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে আবাসিকে ৩৬ হাজার ৭৭৯টি, বাণিজ্যে ৫ হাজার ১৯৮টি ও বিভিন্ন শ্রেণিবিশেষে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়েছে ১ হাজার ২৩০টিতে। এর বিপরীতে সংস্থাটির মিটার রিডার রয়েছেন ২৯ জন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আবাসিকে সর্বনিম্ন ৫০ ইউনিট খরচে ইউনিটপ্রতি পরিশোধ করতে হবে ৪ টাকা ৬৫ পয়সা। এভাবে পর্যায়ক্রয়ে ছয়টি ধাপে ৬০০ ইউনিট পর্যন্ত মূল্য বাড়িয়ে সর্বোচ্চ প্রতি ইউনিটে ১৪ টাকা ৬১ পয়সা পরিশোধের কথা উল্লেখ রয়েছে। এ ছাড়া অফিস, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন শ্রেণিবিশেষে প্রতি ইউনিটে ৭ টাকা ৫৫ পয়সা থেকে ২০ টাকা ১৭ পয়সা পরিশোধ করতে হচ্ছে গ্রাহককে। এর সঙ্গে আরও যুক্ত করা হয় ভ্যাট ও ডিমান্ড চার্জ।
গ্রাহকদের অভিযোগ, কয়েকটি ধাপে ব্যবহৃত ইউনিটের দাম নির্ধারিত রয়েছে। অথচ প্রতি মাসে ইউনিট কম ব্যবহার করা হলেও মিটার না দেখায় ইউনিট জমতে থাকে। আর সেই ইউনিট সমন্বয় করতেই কখনও কখনও দুই থেকে তিনগুণ ইউনিটের বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে। এতে বাড়তি অর্থ খরচ করতে হচ্ছে গ্রাহকদের। এমন অবস্থা বছরের পর বছর চললেও এর কোনো সমাধান মিলছে না।
পৌরসভার গোয়ালপাড়ার বাসিন্দা নয়ন বলেন, মিটার রিডাররা নিয়মিত মিটার রিডিং দেখেন না। খেয়ালখুশিমতো বিলের ইউনিট বসান। পরে তার ইচ্ছামতো এক দিন এসে কয়েক মাসের জমে থাকা ইউনিট এক মাস বা দুই মাসের বিলের সঙ্গে যুক্ত করে দেন। কয়েক মাস ধরে আমাকে দ্বিগুণ বিল দিতে হচ্ছে। না দিলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হচ্ছে। তাদের অবহেলার কারণে গ্রাহকদের পকেট থেকে একটি বড় অংশের অর্থ বের হয়ে যায়। এটি গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণা ও জালিয়াতি।
পৌরসভার আশ্রমপাড়ার বাসিন্দা আশা আক্তার বলেন, গ্রাহকদের বিল নিয়ে ভেলকিবাজি শুরু করেছে নেসকো। বিদ্যুৎ বিভাগের লোকজন মিটার না দেখেই বিল করে থাকেন। মিটারের সঙ্গে যার কোনোভাবেই মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। কোনো মাসে দুই হাজার আবার কোনো মাসে ৩৫০০ টাকার বিল ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বিল সংশোধনের জন্য বিদ্যুৎ অফিসে গেলে তারা কোনো পরামর্শ দিতে পারেন না। হঠাৎ করে মাইকিং করে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার হুমকি দেওয়া হয়। অথচ বিদ্যুৎ বিল শোধ না করার কারণ তারা দেখতে চান না।
শাহাপাড়ার স্কুলশিক্ষক আলতাফুর রহমান বলেন, বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা শুধু টেবিল-চেয়ারে বসে বেতনের জন্য অপেক্ষা করছেন। বিদ্যুৎ সংযোগে কোনো সমস্যা দেখা দিলে তো কথাই নেই। লাইনম্যান ও মেরামতকারীরা আসেন তাদের ইচ্ছামতো। তাও আবার মেরামতের পর তাদের মেটাতে হয় বকশিশ দিয়ে। বকশিশ না দিলে ভবিষ্যতে তাদের আচরণ বদলে যায়।
ঠাকুরগাঁও বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের জেনারেল ম্যানেজার বাচ্চু মিয়া বলেন, কোনো কর্মকর্তা ও মিটার রিডারের গাফিলাতি থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।