যশোর
বেনাপোল (যশোর) প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২১ নভেম্বর ২০২৪ ১৪:১৪ পিএম
যশোর সদরের চাঁচড়া ইউনিয়নের হরিণার বিলে জলাধার ভরাট করে এভাবে প্লট বিক্রি করছে কয়েকটি কোম্পানি। প্রবা ফটো
যশোর সদর উপজেলার চাঁচড়া ইউনিয়নের হরিণার বিলের জলাধার ভরাট করে প্লট আকারে জমি বিক্রি করার অভিযোগ উঠেছে আবাসন ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে। এতে ভেঙে পড়েছে পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা। জমিতে বছর জুড়ে জলাবদ্ধ থাকায় ব্যাহত হচ্ছে ফসল উৎপাদনও।
সদর উপজেলা কৃষি অফিস সূত্র জানায়, হরিণার বিলের আয়তন প্রায় ৫০৭ হেক্টর। ১৭ কিলোমিটার জুড়ে থাকা বিলে আবাদি জমির পরিমাণ প্রায় ৪৮৫ হেক্টর।
কৃষি ও ভূমি অফিস সূত্র জানায়, হরিণার বিল মূলত ধান আবাদ এলাকা। বিলের চাঁচড়া ও শংকরপুর অংশে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ আবাসন প্রকল্প গড়ে উঠেছে। নামে-বেনামে বিভিন্ন হাউজিং প্রকল্প গড়ে তুলে প্রাকৃতিক জলাশয় ভরাট করে প্লট আকারে ফসলি জমি বিক্রি করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে জমির শ্রেণি পরিবর্তনে ভূমি অফিসের কোনো অনুমতিও নেওয়া হচ্ছে না। ইচ্ছামাফিক মাটি ফেলে বিল ভরাট চলছে। শংকরপুর বাস টার্মিনাল, যশোর মেডিকেল কলেজের আশপাশ, চাঁচড়ার ভাতুড়িয়া ও মাহিদিয়া এলাকায় বিল ভরাট করে সবচেয়ে বেশি জমি বিক্রি হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হরিণার বিলে কাজ করছে তিনটি আবাসন কোম্পানি। এগুলো হলোÑ গ্রিন ভিউ সিটি, যশোর ভিউ সিটি এবং রোজ ভিউ সিটি। প্রকল্পের আওতায় রয়েছে বিলের প্রায় ৩০০ বিঘা জমি। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট কোনো কর্তৃপক্ষের অনুমোদন না নিয়েই বিলের কৃষিজমিতে মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে। বিল ভরাট করে প্লট বিক্রির পাশাপাশি চলছে ক্যাফে ও রেস্তোরাঁ ব্যবসাও।
সম্প্রতি সরেজমিনে চাঁচড়ার ভাতুড়িয়া বাজার পার হলে চোখে পড়ে সাইনবোর্ডে প্লট আকারে জমি বিক্রির বিজ্ঞাপন। গ্রিন ভিউ হাউজিং সিটি ছাড়াও আরও বেশ কয়েকটি সাইনবোর্ড দেখা যায়। ভাতুড়িয়া বাজার পেরিয়ে দেখা যায় প্লট আকারে জমি বিক্রির সাইনবোর্ড। রাস্তার পাশে থাকা ওই সাইনবোর্ডের বর্ণনা অনুযায়ী বিলের ভেতর গিয়ে দেখা যায়, মাটি দিয়ে জলাধার ভরাট করা হয়েছে। তারপর বিভিন্ন মাপের প্লট আকারে তা বিক্রি করা হচ্ছে। বিলের মধ্যে বিদ্যুতের একটি বড় টাওয়ারের পাশে প্লট করে জমি বিক্রি করা হচ্ছে। সেখানে অবস্থানরত কয়েকজনের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি জমি বিক্রি করছেন। জমি বিক্রেতা প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের সম্পর্কে কিছু বলার সাহস নেই স্থানীয়দের। পত্রিকায় নাম প্রকাশ করা হবে না বলে আশ্বস্ত করলেও মুখ খুলতে রাজি হননি তারা।
স্থানীয় সূত্র জানায়, ২০২০ সালের পর বিল ভরাট করে মাদ্রাসা নির্মাণ ও হাউজিং প্রকল্প শুরু করে গ্রিন ভিউ। পরে সেখানে যোগ দেয় যশোর ভিউ সিটি ও রোজ ভিউ সিটি। প্রথমে ৩৫টি প্লট নিয়ে যাত্রা শুরু হয় প্রকল্পের।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আবাসন প্রকল্পের মাধ্যমে বিলের বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে। এতে একসময়ের শস্য ও মৎস্যসম্পদে পরিপূর্ণ বিলটির প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে সদর উপজেলার চাঁচড়া ও রামনগর ইউনিয়ন এলাকা জুড়ে থাকা হরিণার বিল। এর মধ্যে সাত বিঘার বেশি জমি ভরাট করা হয়েছে গ্রিন ভিউ প্রকল্পের নামে। বর্ষা মৌসুম শেষ হলে আরও আট বিঘা জমি ভরাট করা হবে বলে জানান তারা। এই প্রকল্প আরও সম্প্রসারণ করে ৫০ বিঘায় উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে প্রকল্পটির মালিকদের।
এদিকে, যশোর শহরের বড় একটি অংশের পানি ড্রেনেজ সিস্টেমের মাধ্যমে হরিণার বিলে গিয়ে পড়ে। প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট এই জলাধার শুধু পানি নিষ্কাশন নয়, ধান উৎপাদনেরও বিশাল একটি ক্ষেত্র। ফলে এভাবে ভরাটের মুখে বিলটি বছর জুড়ে জলাবদ্ধ থাকে। বিল ভরাট করে হাউজিং, প্লট ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলায় বিলের একটি অংশে জলাবদ্ধতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বিলের কালাবাগা ও রূপদিয়ার কয়েকশ বিঘা জমি থেকে বৃষ্টির পর আর পানি সরছে না। তাদের ভাষ্য, হাউজিং ও মাদ্রাসার পাশে সারা বছর এখন পানি জমে থাকছে। যে কারণে সেখানে কোনো ফসলই আবাদ করা যাচ্ছে না।
এ ব্যাপারে গ্রিন ভিউ হাউজিং সিটির ব্যবস্থাপক আব্দুল্লা হেল বাকী জানান, ছোট পরিসরে আবাসন প্রকল্পটি পরিচালনা করা হচ্ছে। এ ধরনের প্রকল্পের আয়তন ২৯ বিঘার ওপর হলে অনুমোদন নেওয়ার প্রয়োজন হয়। এই প্রকল্প ওই রকম আয়তনের নয়। যখন সে রকম আয়তনের হবে, তখন অনুমোদন নেওয়া হবে। তবে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছ থেকে লিখিত একটা অনুমতি নেওয়া আছে।
চাঁচড়া ইউনিয়ন পরিষদের সচিব জাহাঙ্গীর আলম জানান, ইউনিয়ন এলাকায় ভবন নির্মাণের জন্য নকশার অনুমোদন নিতে হয়। নির্দিষ্ট পরিমাণ ফি দিয়ে ইউনিয়ন পরিষদে এক্ষেত্রে আবেদন করতে হয়। কিন্তু আবু বকর হাফিজিয়া ও এতিমখানা এসব নিয়ম অনুসরণ করেনি।
সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ জানান, সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের উপসহকারী কর্মকর্তাকে বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে বলবেন। এক্ষেত্রে যদি আইনের ব্যত্যয় দেখা গেলে নিয়মানুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।