সাফল্য
রিকোর্স চাকমা, রাঙামাটি
প্রকাশ : ২১ নভেম্বর ২০২৪ ০৯:৫৮ এএম
রাঙামাটি জেলা শহরের আসাম বস্তি এলাকায় কাঁঠাল ও কলার চিপসের কারখানায় উদ্যোক্তা প্রমথ চাকমা (মাঝে)। প্রবা ফটো
অপার সম্ভাবনাময় পার্বত্য জেলা রাঙামাটিতে প্রতি বছর প্রচুর মৌসুমি ফল উৎপাদিত হয়। বিশেষত কাঁঠাল, কলা ও আনারসের কদর বেশি। জেলার চাহিদা মিটিয়ে সরবরাহ করা হয় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। সম্ভাবনা থাকলেও নানা কারণে প্রতি মৌসুমে নষ্ট হয় উৎপাদিত দেশীয় ফলের বড় একটি অংশ। ফলগুলোর অপচয় ও সঠিক ব্যবহার নিশ্চিতে উদ্যোগ নিয়েছেন পাহাড়ের তিন তরুণ। প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে রাঙামাটিতে তারা তৈরি করছেন কাঁঠাল ও কলার চিপস।
রাঙামাটি জেলা শহরের আসামবস্তি এলাকায় তিন তরুণ উদ্যোক্তা সুবিমল চাকমা, প্রমথ চাকমা ও শান্তু চাকমা বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে ছোট্ট পরিসরে গড়ে তুলেছেন চিপস তৈরির প্রতিষ্ঠান। যার শুরু থেকে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ও ডাচ বাংলা ব্যাংক সহযোগিতা করে যাচ্ছে।
২০২২ সালে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের পোস্টহারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগ থেকে প্রশিক্ষণ নেয় সুবিমল, প্রমথ ও শান্তু চাকমা। চলতি বছরের মে মাস থেকে প্রায় ৩ লাখ টাকা ব্যয়ে বাঁশের বেড়া দিয়ে তৈরি ছোট্ট এক ঘরে কাঁঠাল ও কলার চিপস তৈরির কাজ শুরু করেন। ইতোমধ্যে বিভিন্ন ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তাদের উৎপাদিত পণ্য দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিপণন হচ্ছে। প্রতিটি চিপসের প্যাকেটের দাম ধরা হয়েছে ৩০ টাকা।
সম্প্রতি আসামবস্তি এলাকার চিপস প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানে গিয়ে দেখা যায় উদ্যোক্তা প্রমথ চাকমাসহ বেশ কয়েকজন সহযোগী মেশিনের মাধ্যমে কাঁঠাল ও কলার তৈরি চিপস প্রস্তুত করছেন। এ সময় কাঁঠাল ও কলায় তৈরি চিপস দেখতে গিয়েছেন বেশ কয়েকজন।
দর্শনার্থী মোহর চাকমা বলেন, বেশ কয়েক মাস ধরে আমাদের বন্ধুরা কাঁঠাল ও কলার চিপস তৈরি করছে। আজ নিজে এসে তাদের চিপসগুলো খেয়ে দেখলাম, আসলেও অনেক সুস্বাদু। আমাদের পাহাড়ে উৎপাদিত কাঁঠাল, কলা বলে স্বাদটাও অনেক ভালো। অনেকেই এই চিপস সম্পর্কে জানে না কিংবা খায়নি। না খেলে বোঝানো সম্ভব না এটা কতটা সুস্বাদু। বন্ধুদের উদ্যোগকে স্বাগত জানাই।
ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান বৈচিত্র্য ডটকমের প্রতিষ্ঠাতা পল্লব চাকমা বলেন, আমরা তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে উৎপাদিত চিপসগুলো অনলাইনের মাধ্যমে দেশজুড়ে বিতরণ, বিপনন ও প্রচার করছি। তাদের উৎপাদিত পণ্যে অনলাইনে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি।
উদ্যোক্তা প্রমথ চাকমা বলেন, আমাদের এই প্রতিষ্ঠানের তৈরি চিপসের কাঁঠাল ও কলাগুলো স্থানীয় চাষিদের থেকে সংগ্রহ করে থাকি। আমরা দেখেছি পার্বত্য চট্টগ্রামে অনেক ফল বিশেষ করে কলা, কাঁঠাল পচে নষ্ট হয়ে যায়। চাষিরাও ক্ষতির মুখে পড়েন। সে কারণে এই ফলগুলো প্রক্রিয়াজাত করে চিপস তৈরির উদ্যোগ নিয়েছি।
তিনি আরও বলেন, ক্ষুদ্র পরিসরে ৩ বন্ধু মিলে শুরু করেছি এই উদ্যোগ। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে আমাদের চিপস তৈরি মেশিন দেওয়া হয়েছে এবং আর্থিকভাবে সহযোগিতা করছে ডাচ বাংলা ব্যাংক। যদিও স্বল্প পরিসরে আমরা এটা শুরু করেছি কিন্তু গ্রাহকের দারুণ সাড়া পাচ্ছি। প্রাথমিকভাবে আমাদের পণ্য স্থানীয় বাজার, মেলা ও পর্যটন স্পটগুলোয় সরবরাহ করছি। প্রতিষ্ঠান বড় করতে পারলে জেলার বাইরেও সরবরাহ করার ইচ্ছা রয়েছে।
আরেক উদ্যোক্তা সুবিমল চাকমা বলেন, এটা আমাদের তিন বন্ধুর উদ্যোগ। আমরা কাঁঠালের ওপর বেশি জোর দিয়েছি। কেননা বছরের কয়েকটি মাস পাওয়া যায় কাঁঠাল। এই ফলকে প্রক্রিয়াজাত করে অন্য খাদ্যবস্তুতে রূপান্তর করা গেলে মানুষ বছরজুড়ে কাঁঠালের স্বাদ নিতে পারবে। সবেমাত্র আমরা যাত্রা শুরু করেছি। আমাদের সঙ্গে বিভিন্ন ই-কমার্স অনলাইন প্ল্যাটফর্ম যুক্ত রয়েছে। মোটামুটি ভালো গ্রাহকের চাহিদার সাড়া পাচ্ছি। বিভিন্ন স্থানীয় মেলায়ও কাঁঠাল, কলার চিপস সরবরাহ করি।
তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে বৃহৎ আকারে কাজ করার পরিকল্পনা আছে। চিপসের পাশাপাশি জুস, জেলিসহ আরও কয়েকটি খাদ্যপণ্য উপাদন করার ইচ্ছা আছে। যেগুলো দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি করা যায়। এখানে যদিও কাঁঠালের তেমন মূল্য নেই। কিন্তু আমরা যদি প্রক্রিয়াজাত করে ফলটি বাজারজাত করতে পারি তাহলে কাঁঠালের দাম বাড়লে চাষিরা লাভবান হবেন, উৎপাদনও বাড়বে। পাশাপাশি আমাদের প্রতিষ্ঠান কেন্দ্র করে স্থানীয়ভাবে অনেকের কর্মসংস্থানও হবে।
রাঙামাটি চেম্বার অব কর্মাস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, তিন তরুণের এটা একটা দারুণ উদ্যোগ। আশা করি, তারা সফল হবেন। এমন ভিন্নধর্মী উদ্যোক্তারা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাদের বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে লোন পেতে সহায়তাসহ বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে থাকি।