× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বগুড়া পৌরসভা

কাউন্সিলরের দায়িত্ব পালনে অনীহা কর্মকর্তাদের

বগুড়া অফিস

প্রকাশ : ২১ নভেম্বর ২০২৪ ০৯:৩১ এএম

কাউন্সিলরের দায়িত্ব পালনে অনীহা কর্মকর্তাদের

‘এলাকায় কোনো বিষয়ে বিরোধ হলে লোকজন ভোরে বাসায় এসে ডাকাডাকি করেন। বসতবাড়ি নির্মাণের সময় সমস্যা হলে অফিস ছেড়ে তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থলে ছুটে যেতে হয়। নতুন ভোটার হওয়ার জন্য কিংবা নাম সংশোধনের আবেদন নিয়ে আসা মানুষদের তাৎক্ষণিক সেবা দিতে না পারলে অফিসের ভেতরে-বাইরে চিৎকার-চেঁচামেচি করে। এসব নিয়ে মাঝেমধ্যেই বিব্রত হতে হই।’ পৌরসভার কাউন্সিলরদের অপসারণের পর ওই পদে অর্পিত দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা এভাবেই বর্ণনা করছিলেন বগুড়ার সরকারি দপ্তরের শীর্ষ এক কর্মকর্তা। বগুড়া ‘পৌরসভার পরিচালনা সহায়ক কমিটির সদস্য’ হিসেবে তাকে ৩ ওয়ার্ডে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ১৯ আগস্ট সারা দেশের মতো অপসারণ করা হয় বগুড়া পৌরসভার মেয়রকেও। আয়তনের দিক থেকে দেশের সবচেয়ে বড় বগুড়া পৌরসভায় প্রশাসকের দায়িত্ব পান স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক মাসুম আলী বেগ। তিনি গত ২০ আগস্ট প্রশাসকের দায়িত্ব বুঝে নেন। ১০ লাখ নাগরিক অধ্যুষিত এই পৌরসভার ২১ ওয়ার্ডের কাউন্সিলর এবং সংরক্ষিত ৭ মহিলা কাউন্সিলরকেও সরিয়ে দেওয়া হয় ২৬ সেপ্টেম্বর। কাউন্সিলরদের স্থলে জেলার বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের শীর্ষ ৮ কর্মকর্তাকে পৗরসভার পরিচালনা সহায়ক কমিটির সদস্য হিসেবে গত ৯ অক্টোবর দায়িত্ব দেওয়া হয়। মূলত জাতীয় পরিচয়পত্রসংক্রান্ত প্রত্যয়ন ও উত্তরাধিকার (ওয়ারিশান)-সংক্রান্ত সনদসহ ১৪ ধরনের সনদ কিংবা প্রত্যয়নের ক্ষমতা দেওয়া হয় তাদের। কাউন্সিলরদের দায়িত্ব পালনকারী সরকারি আট শীর্ষ কর্মকর্তার কাজে সহায়তার জন্য পৌরসভার ২১ ওয়ার্ডে চুক্তিভিত্তিক ২১ জন ওয়ার্ড সহকারীও নিয়োগ দেওয়া হয়। 

তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব সহকারী ওয়ার্ড পর্যায়ে পৌরসভার নিজস্ব অথবা ভাড়া করা কার্যালয়ে বসে দায়িত্ব পালন করলেও পৌরসভার পরিচালনা সহায়ক কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তারা নিজ নিজ দপ্তরে থেকেই জনপ্রতিনিধির কাজ করছেন। ফলে একজন নাগরিককে তার প্রাপ্য সেবা পেতে ওই দুই দপ্তরের পাশাপাশি পৌরসভা ভবনেও ছুটতে হয়। এভাবে তিনটি পৃথক স্থানে ছোটাছুটির কারণে নাগরিকদের ভোগান্তি বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে মৃত ব্যক্তিদের উত্তরাধিকার তথা ‘ওয়ারিশান সনদ’ নিতে। মেয়র ও কাউন্সিলররা যখন দায়িত্বে ছিলেন, তখন ওয়ারিশান সনদ কয়েক ঘণ্টায় পাওয়া যেত, এখন সেটি পেতে ১০ থেকে ১৫ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। 

শহরের বড় বেলাইল এলাকার সেলিম খান তার পিতার মৃত্যুর পর ওয়ারিশান সনদের জন্য ৩১ অক্টোবর আবেদন করেছিলেন। যাচাই-বাছাই শেষে তাকে ১০ নভেম্বর সনদ সরবরাহ করা হয়। সেলিম খান বলেন, ‘আগে যখন কাউন্সিলররা দায়িত্বে ছিলেন, তখন এসব সনদ এক দিনের মধ্যেই পাওয়া যেত। কিন্তু এখন বেশ দেরি হচ্ছে। এতে ভোগান্তি বেড়েছে।’ 

ওয়ারিশান সনদপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে দেরি হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বগুড়া পৌরসভার প্রশাসনিক কর্মকর্তা নুরুল ইসলাম বলেন, ‘আবেদনের পরপরই যাতে দ্রুত ওয়ারিশান সনদ দেওয়া যায় সেজন্য কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ফলে গতি আগের চেয়ে কিছুটা বেড়েছে। সেপ্টেম্বর মাসে মাত্র ৯২টি ওয়ারিশান সনদ ইস্যু করা হয়েছিল, অক্টোবর মাসে তা ১৫৭-এ গিয়ে পৌঁছেছে।’ 

শহরের সুলতানগঞ্জপাড়ার মহরম আলী নামের এক বাসিন্দা জানান, ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ায় ভোটার তালিকায় তিনি তার ছেলের নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য ১, ৪ ও ৫নং ওয়ার্ডের জন্য পৌরসভার পরিচালনা সহায়ক সদস্য হিসেবে কয়েক দিন আগে দায়িত্বপ্রাপ্ত জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের কাছে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি তার অফিসে বিভিন্ন মিটিংয়ে ব্যস্ত থাকায় আবেদন ফরমে স্বাক্ষর নিতেই ৪ ঘণ্টা অপেক্ষায় থাকতে হয়েছে। তিনি বলেন, ‘তিনি তো একটি অফিসের প্রধান। তার তো মিটিং থাকতেই পারে। তাই কষ্ট সত্ত্বেও অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় ছিল না। তবে এগুলো যাতে দ্রুত পাওয়া যায় সেটা নিশ্চিত করতে বিকল্প কোনো পদক্ষেপ নেওয়া বা দ্রুত নির্বাচন দেওয়া উচিত।’ 

বগুড়া পৌরসভার ১, ৪ ও ৫নং ওয়ার্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার রেজোয়ান হোসেন জানান, তারা নিজ দপ্তরের কাজের পাশাপাশি প্রত্যেক সেবাপ্রার্থীকেই দ্রুত সেবা দেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে কখনও মিটিংয়ে ব্যস্ত থাকলে হয়তো সেবাপ্রার্থীদের কিছু সময় অপেক্ষা করতে হয়। তবে মাঝেমধ্যে বিব্রতকর পরস্থিতিতে পড়তে হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ওয়ারিশান সনদ নেওয়ার ক্ষেত্রে কেউ কেউ তথ্য গোপনের চেষ্টা করে। এজন্য অনেক কিছু যাচাই-বাছাই করতে হয়। এমনটা করতে গিয়ে কখনও কখনও বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়েছে। 

তবে ব্যতিক্রম চিত্র লক্ষ করা গেছে বাড়ি নির্মাণের নকশা অনুমোদনে। ওই ক্ষেত্রে গতি ধীর হলেও নকশা অনুমোদন প্রক্রিয়ায় আগের মতো কাউকে কোনো প্রকার উৎকোচ দিতে হচ্ছে না। ভুক্তভোগীরা বলছে, আগে কোনো কোনো কাউন্সিলরকে তাদের চাহিদামতো টাকা না দিলে নকশা অনুমোদন হতো না। শহরের এলাকার এক বাসিন্দা জানান, তিনি গত জুন মাসে বাড়ির নকশা অনুমোদনের জন্য পৌরসভায় জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর তার কাছে লাখ টাকা দাবি করে বলেছিলেন টাকা না দিলে নকশা পাবেন না। তার পক্ষে টাকা দেওয়া সম্ভব ছিল না বলে তিনি কাজে নামেননি। তবে পৌরসভার কাউন্সিলরদের সরিয়ে দেওয়ার পর জানতে পারেন, কোনো লেনদেন ছাড়াই নকশা অনুমোদন হচ্ছে। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘খবর পেয়ে আমি আবেদন করি এবং কোনো টাকা ছাড়াই বাড়ির নকশা অনুমোদন পাই।’ 

বগুড়া পৌরসভার শহর পরিকল্পনাবিদ আল মেহেদী হাসান জানান, প্রশাসক দায়িত্ব গ্রহণের পর নকশা অনুমোদনসংক্রান্ত কমিটির দুটি সভা হয়েছে। তাতে ২৮৮ নকশার মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষে ২৫৫টি নকশার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নকশা অনুমোদন প্রক্রিয়ায় দেরি হচ্ছে না। আগের গতিতেই অনুমোদন প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে।

বাংলাদেশ মানবাধিকার ব্যুরো বগুড়া জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আসাদুল হক কাজল পৌরসভার নাগরিক সেবায় গতি ফিরিয়ে আনতে দ্রুত নির্বাচন দাবি করে বলেন, ‘জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রেই স্থানীয় সরকারের প্রতিষ্ঠান পৌরসভার সেবা প্রয়োজন হয়। মেয়র ও কাউন্সিলরদের অবর্তমানে যাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তারা একে তো স্থানীয় বাসিন্দা নন, তার ওপর প্রত্যেকেই সরকারি দপ্তরগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তা। কাজেই ইচ্ছা থাকলেও তাদের পক্ষে দ্রুততম সময়ে সেবা প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে না। এজন্য প্রয়োজন নির্বাচিত প্রতিনিধি। তবে এখন যদি নির্বাচন দেওয়া সম্ভব না হয়, তাহলে স্থানীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক ব্যক্তিদের দিয়ে পৌর পরিষদ গঠন করা যেতে পারে। তাতে জনগণ উপকৃত হবে।’

বগুড়া পৌরসভার প্রশাসক মাসুম আলী বেগ জানান, নাগরিকরা যাতে তাদের সেবাগুলো দ্রুত পেতে পারেন সেজন্য সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। মাসুম আলী বেগ জনবল সংকটের কথা উল্লেখ করে বলেন, এই পৌরসভায় ১৬৬ কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদ থাকলেও কাজ করছেন মাত্র ৬২ জন। পৌরসভার আয় সীমিত হওয়ায় শূন্য পদে জনবল নিয়োগ দেওয়া যাচ্ছে না। ওয়ার্ড সহকারী হিসেবে যারা কাজ করছেন তারাও স্থায়ী কর্মচারী নন, ফলে সেখানেও কিছু সমস্যা রয়েছে। এসব প্রতিবন্ধকতা নিয়েই কাজ করতে হচ্ছে। এক প্রশ্নের জবাবে প্রশাসক মাসুম আলী বলেন, ‘বগুড়া পৌরসভায় সড়ক পাকা কিংবা সংস্কারসংক্রান্ত আবেদন বেশি জমা পড়ছে। যেগুলো বাস্তবায়ন করতে হলে অন্তত ১০০ কোটি টাকা প্রয়োজন। বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হবে।’

পৌরসভায় ২৬ ধরনের নাগরিক সেবা প্রদান করা হয়। এর মধ্যে জন্মনিবন্ধন সনদের জন্যই বেশিসংখ্যক আবেদন জমা পড়ে। প্রতিদিন গড়ে ২৫০টি আবেদন জমা পড়ে। এরপর নাগরিকতা সনদ, মৃত্যু সনদ, ওয়ারিশান সনদ, বার্ষিক আয়ের সনদ।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা