মিয়ানমারের সংঘাত
কক্সবাজার অফিস
প্রকাশ : ২০ নভেম্বর ২০২৪ ২০:৪৭ পিএম
আপডেট : ২০ নভেম্বর ২০২৪ ২০:৫১ পিএম
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সরকারি বাহিনীর সঙ্গে সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির মধ্যে চলমান যুদ্ধের ব্যাপকতা বেড়েছে। গত কয়েক দিন মর্টার শেল, বোমা, গ্রেনেড ও গুলির শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল টেকনাফ সীমান্তের এপারে। এবার নতুন করে উখিয়া ও নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের মানুষও বিস্ফোরণের বিকট শব্দ শুনতে পাচ্ছে। গত তিন মাসের বেশি সময় এই দুই সীমান্তে বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের তথ্যমতে, গত মঙ্গলবার দুপুর থেকে শুরু হয়ে বুধবার (২০ নভেম্বর) সকাল ১০টা পর্যন্ত থেমে থেমে বিকট শব্দ শোনা যায় নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম ও উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের সীমান্ত এলাকায়। একই সঙ্গে মঙ্গলবার রাত ১টা থেকে বুধবার দুপুর ১টা পর্যন্ত টেকনাফ সীমান্তের হ্নীলা, পৌরসভা, টেকনাফ সদর ও সাবরাং ইউনিয়নের মানুষও মিয়ানমারের সংঘাতের বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পেয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় মিয়ানমার সরকারি বাহিনীর সঙ্গে আরাকান আর্মি তুমুল সংঘর্ষ চলছে। এ ছাড়াও সংঘর্ষ চলছে ঘুমধুম ও উখিয়ার পালংখালী সীমান্তের ওপারে রাখাইনের বিভিন্ন গ্রামে। এদিকে সংঘর্ষের প্রভাব পড়ছে উখিয়ার ঘুমধুম ও পালংখালী ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামে। অন্যদিকে একই অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে টেকনাফ সীমান্তেও।
পালংখালীর বাসিন্দা রফিক মাহমুদ বলেন, মঙ্গলবার দুপুরের পর থেকে শুরু করে থেমে থেমে আজ (বুধবার) সকাল ১০টা পর্যন্ত ভারী গোলার শব্দ এপারে শোনা যাচ্ছে। যে কারণে সীমান্ত এলাকায় বিনা প্রয়োজনে না যেতে নির্দেশ দিয়েছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।
ঘুমধুমের বাসিন্দা হামিদুল হক বলেন, মঙ্গলবার দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত থেমে থেমে মিয়ানমারের মর্টার শেল ও ভারী বোমার শব্দ শোনা যায়। কয়েক মাস পর আবার গোলাগুলির শব্দ শুনতে পেয়েছি আমরা যারা ঘুমধুম ও পালংখালী সীমান্ত এলাকায় বসবাস করছি। সীমান্তবর্তী বসবাসকারীরা ভয়ে আছেন। টেকনাফ সীমান্তে টানা দশ মাস ধরে যুদ্ধ চলমান রয়েছে।
পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, টানা ৩ মাস বন্ধ থাকার পর পালংখালী সীমান্তের ওপারে ভারী গোলা ও মর্টার শেলের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। সীমান্ত এলাকার লোকজন আতঙ্কে রয়েছে।
টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মোহাম্মদ শরিফ বলেন, কয়েক দিন ধরে মিয়ানমার সীমান্তবর্তী টেকনাফের বাসিন্দারা কিছুটা স্বস্তিতে ছিল। হঠাৎ করে মঙ্গলবার রাতে আবারও বিস্ফোরণের শব্দে বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এভাবে আর কত দিন চলবে। বর্তমানে সীমান্ত এলাকার মানুষগুলো আতঙ্কের মধ্যে বসবাস করছে।
সীমান্তঘেঁষা ইউপির চেয়ারম্যানরা জানান, বিস্ফোরণের বিকট শব্দে এলাকার বাসিন্দাদের ঘরবাড়ি কেঁপে উঠছে। কিছুদিন বিরতি থাকলেও সীমান্তের লোকজন শান্তিতে ঘুমাতে পারছে না। বিশেষ করে, শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে খুবই বিপাকে পড়তে হচ্ছে।
সীমান্তের একাধিক সূত্র জানায়, টানা দশ মাসের বেশি সময় রাখাইন রাজ্যে সরকারি বাহিনীর সঙ্গে লড়ছে আরাকান আর্মি। ইতোমধ্যে আরাকান আর্মি মংডু শহরের আশপাশে দেশটির সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড পুলিশের (বিজিপি) বেশকিছু সীমান্তচৌকি দখলে নিয়েছে। বর্তমানে মংডু টাউনের অভ্যন্তরে থাকা দেশটির সেনাবাহিনী ও বিজিপির দুটি ব্যাটালিয়ন দখলের চেষ্টা চালাচ্ছেন আরাকান আর্মির সদস্যরা। এ দুটিতে পাঁচ হাজারের মতো সৈন্য রয়েছে। এতে আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে সরকারি বাহিনীর পক্ষে যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠিগুলোও।
গত মঙ্গলবার ঘুমধুম বাইশফাঁড়ি সীমান্ত দিয়ে মিয়ানমার থেকে অনুপ্রবেশ করা ৬৫ চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যা সদস্যকে উখিয়ার কুতুপালং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রশাসনের নিরাপত্তা হেফাজতে রাখা হয়েছে।
এদিকে, গত ১২ নভেম্বর টেকনাফ থেকে নির্মাণসামগ্রী নিয়ে সেন্টমার্টিন যাওয়ার সময় উধাও হওয়া দুটি ট্রলারের ৭ মাঝিমাল্লার কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে গত ১৩ নভেম্বর উখিয়ার নাফ নদ সীমান্ত থেকে মাছ ধরার সময় পাঁচ জেলেকে আরাকান আর্মি ধরে নিয়ে যাওয়ার পর একজনের মরদেহ উদ্ধার হলেও এখনও হদিস নেই অপর চারজনের।
আরাকান আর্মির পক্ষে গত ১২ নভেম্বর ২ ট্রলারসহ ৭ মাঝিকে ধরে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছে বলে জানান বিজিবির টেকনাফ-২ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ।