সুবল বড়ুয়া, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ২০ নভেম্বর ২০২৪ ১৩:৫২ পিএম
কর্ণফুলী নদীর বাম তীরে ৫০ একর জায়গার ওপর ১৯৯৪ সালে একটি আবাসিক প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। কিন্তু তারপর প্রায় তিন দশক পেরিয়ে গেলেও ৫১৮টি প্লটের এই আবাসিক প্রকল্পের নানা সংকট এখনও কাটিয়ে তুলতে পারেনি সংস্থাটি। কোটি টাকা ব্যয়ে প্লট কিনেছেন আগ্রহীরা, কিন্তু এখন পর্যন্ত ওই আবাসিক এলাকায় বাড়ি নির্মাণ করতে পারেননি কোনো প্লটের মালিক। বাড়ি নির্মাণের জন্য যেসব সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, এখনও প্লটমালিকদের তা দিতে পারেনি সংস্থাটি। অবশ্য সিডিএ বলছে, সংকট কাটিয়ে শিগগিরই এই আবাসন প্রকল্প আলোর মুখ দেখবে।
সিডিএ সূত্রে জানা যায়, নগরীর আবাসন সংকট কাটাতে প্রায় ৩৩ বছর আগে নগরীর শাহ আমানত সেতু লাগোয়া কর্ণফুলীর বাম তীরে মইজ্জারটেক এলাকায় কর্ণফুলী আবাসিক প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়। ৫০ একর জায়গার ওপর নেওয়া এই প্রকল্পের বরাদ্দকৃত স্থানে আবাসিক ভবনের পাশাপাশি রাস্তাঘাট, খেলার মাঠ, কবরস্থান, মার্কেট, নালা-নর্দমা ও নিরাপত্তাবেষ্টনী গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। বিদ্যুৎ, গ্যাস ও ওয়াসার সুপেয় পানি সরবরাহ করাসহ যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার কথাও উল্লেখ করেছিল প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা সিডিএ। কিন্তু এখন জঙ্গলাচ্ছন্ন এই আবাসিক এলাকার ভেতর দিনেদুপুরে যেতেও ভয় করে অনেকের। সেখানে পানি নিষ্কাশনের দুয়েকটি নালা নির্মাণ করলেও বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগের এখনও ব্যবস্থা করা হয়নি।
এ প্রসঙ্গে কর্ণফুলী আবাসিক প্লটমালিক কল্যাণ সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সহসভাপতি ও মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট জিয়া হাবিব আহসান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘৩৩ বছরেও সফলতার মুখ দেখেনি সিডিএর ৫১৮টি প্লটের মেগা প্রকল্প কর্ণফুলীর বাম তীরের আবাসিক প্রকল্পটি। ওই সময় চড়া দামে কেনা প্লটগুলো শুধু সুপেয় পানি সংকটের কারণে এখনও পড়ে আছে। এখনও সেখানে সুপেয় পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়নি। সিডিএর সাবেক প্রভাবশালী চেয়ারম্যানরা নতুন নতুন প্রকল্প হাতে নিয়েছে, কিন্তু এই আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেনি।’
তিনি বলেন, ‘এই কর্ণফুলী আবাসিক প্রকল্পে পানি সংযোগ দিলে সিডিএ-ওয়াসা উভয়ই লাভবান হতো। সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায় করত। হাজার হাজার মানুষের বসতি গড়ে ওঠায় মহানগরীর আবাসন সংকটও কাটত। আমরা এখন সিডিএ আর ওয়াসার রশি টানাটানির মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছি। ইতোমধ্যে প্লটমালিকদের অনেকেই মারা গেছেন। অনেকে মৃত্যু পথযাত্রী। নিজ ভূমিতে গৃহনির্মাণের স্বপ্ন তাদের স্বপ্নই রয়ে গেল।’
একাধিক প্লটমালিকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শতকোটি টাকা ব্যয়ে পাঁচ শতাধিক প্লটমালিক সিডিএর কাছ থেকে বাড়ি নির্মাণের আশায় প্লট কিনেছিলেন। কিন্তু এখনেও সিডিএ এখানে বসতি গড়ে তোলার মতো পরিবেশ গড়ে দেয়নি। মূলত সিডিএর সদিচ্ছার অভাবেই ৩০ থেকে ৩৩ বছর ধরে প্লটমালিকরা বাড়িঘর তুলতে পারছেন না। এখন আবার নতুন করে শোনা যাচ্ছে, কর্ণফুলী আবাসিক এলাকায় বাতাসের সঙ্গে সিসা ভাসে। তেমনটি হলে এই আবাসিকে দুই তলার ওপরে নাকি কোনো ভবন নির্মাণ করা যাবে না।’
তবে কয়েক বছর আগে ২০২১ সালের ১৮ জুলাই এই আবাসিক এলাকার সমস্যা সমাধানে কর্ণফুলী আবাসিক প্লটমালিক কল্যাণ সমিতির সদস্যরা সিডিএর চেয়ারম্যান বরাবর একটি আবেদন জমা দেন। পাশাপাশি চট্টগ্রাম ওয়াসা কর্তৃক বোয়ালখালী এলাকায় বাস্তবায়নাধীন ‘ভাণ্ডালজুরি প্রকল্প’ থেকে এখানে পানির ব্যবস্থা করার জন্যও একটি আবেদন দেওয়া হয় ওয়াসা কর্তৃপক্ষকে। কিন্তু এই সংকট নিরসনে সিডিএ এখনও কোনো উদ্যোগ নেয়নি।
এদিকে এ প্রসঙ্গে সিডিএর প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস বলেন, ‘শিগগিরই সংকট কাটিয়ে প্রকল্পটি আলোর মুখ দেখবে। নানা কারণে প্রকল্পটি আলোর মুখ দেখেনি। সুপেয় পানির সংকট রয়েছে আর দুই তলার বেশি উঁচু আবাসিক ভবন নির্মাণ করা যাবে নাÑ এমন গুজবের কারণে প্লটমালিকরা এখানে ভবন নির্মাণে অনাগ্রহী ছিল। আমরা এসব সংকট কাটাতে উদ্যোগ নিচ্ছি। সুপেয় পানির সংযোগের জন্য আমরা চট্টগ্রাম ওয়াসার সাবেক এমডিকে অনেকবার বলেছি। কিন্তু উনার সদিচ্ছা না থাকায় দেননি। এখন তিনি নেই। এখন ওয়াসার সঙ্গে সিডিএর আলোচনা চলছে। ইতোমধ্যে এই কর্ণফুলী আবাসিকে ভাণ্ডালজুড়ি প্রকল্প থেকে সংযোগ দেওয়ার জন্য ওয়াসা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেছি। আশা করি, শিগগিরই এ বিষয়ে ওয়াসা উদ্যোগ নেবে।’
পাশাপাশি গুজবের বিষয়ে সিডিএর প্রধান প্রকৌশলী বলেন, ‘ভবন নির্মাণ আইনের মধ্যে থেকে কর্ণফুলী আবাসিকে আট থেকে দশ তলা পর্যন্ত ভবন নির্মাণ করা যাবে। দুই তলার বেশি তোলা যাবে নাÑ এ তথ্য যে-ই ছড়িয়ে থাকুক না কেন, তা গুজব। আশা করি, সকল প্লটমালিক এই কর্ণফুলী আবাসিকে ভবন নির্মাণে উদ্যোগী হবেন। এই প্রকল্প হলে কর্ণফুলী, পটিয়া ও আনোয়ারা উপজেলার বাসিন্দাদের বড় একটি অংশকে আর শহরমুখী হতে হবে না।’