× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ফরিদপুরের বোয়ালমারী

অবৈধ কারখানায় ট্যানারি বর্জ্যে কাঁচামাল

আমীর চারু বাবলু, বোয়ালমারী (ফরিদপুর)

প্রকাশ : ১৮ নভেম্বর ২০২৪ ১০:১৫ এএম

আপডেট : ১৯ নভেম্বর ২০২৪ ১৬:১৯ পিএম

অনুমোদনহীন কারখানার চুল্লিতে ট্যানারির বর্জ্য সিদ্ধ করা হচ্ছে। শনিবার বোয়ালমারী বিল-চিতলিয়াসংলগ্ন পোয়াইল গ্রাম। প্রবা ফটো

অনুমোদনহীন কারখানার চুল্লিতে ট্যানারির বর্জ্য সিদ্ধ করা হচ্ছে। শনিবার বোয়ালমারী বিল-চিতলিয়াসংলগ্ন পোয়াইল গ্রাম। প্রবা ফটো

ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে অবৈধভাবে চুল্লিতে ট্যানারির চামড়ার উচ্ছিষ্ট সিদ্ধ করেছে ঢাকার এক ব্যবসায়ী। উপজেলার বোয়ালমারী-ময়েনদিয়া সড়কের বাবুর বাজার থেকে মাত্র ২০০ মিটার দূরত্বে বিল-চিতলিয়াসংলগ্ন পোয়াইল গ্রামের একটি ধানমাড়াই চাতাল ভাড়া নিয়ে গড়েছেন এ কারখানা। যার নেই কোনো অনুমোদন, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র, এমনকি ইউনিয়ন পরিষদের ট্রেড লাইসেন্সও। ট্যানারির বর্জ্য ও পশুর চামড়া উচ্ছিষ্ট রাতের আঁধারে চুল্লিতে সিদ্ধ করে শুকানো হচ্ছে উন্মুক্ত চাতালে। ধোঁয়া আর কেমিক্যাল মিশ্রিত চামড়ার দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে পোয়াইল, হাসমদিয়াসহ আশপাশের গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ। হুমকিতে রয়েছে প্রাণ-প্রকৃতি ও জনস্বাস্থ্য। 

কারখানায় কর্মরত শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঢাকার হাজারীবাগ ও সাভারের ট্যানারিগুলোতে চামড়া প্রক্রিয়াজাত করার পর উচ্ছিষ্ট থেকে যায়। সেগুলোই স্বল্পমূল্যে কিনে ট্রাকভর্তি করে নিয়ে আসা হয় এখানে। পরে সিদ্ধ করে শুকিয়ে বস্তাবন্দি করে পাঠানো হয় ঢাকায়, মেশিনে সেগুলো পিষে গুঁড়া করে বিক্রি করা হয় মশার কয়েল উৎপাদন কোম্পানি, মুরগি ও মাছের খাবার প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ট্যানারিতে চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রায় ২০ ধরনের কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়। এসব কেমিক্যাল মিশ্রিত উচ্ছিষ্ট চামড়া সিদ্ধ করায় তা বাতাসে মিশে পরিবেশকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলেছে। উন্মুক্ত চুল্লিতে গার্মেন্টসের ছিট কাপড় ও প্লাস্টিক বর্জ্যের সঙ্গে কাঠ জ্বালিয়ে সিদ্ধ করা হয় এসব চামড়া। বৃহৎ পরিখা খনন করে তার ওপর এক টন ধারণক্ষমতার খোলা বয়লারে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা সিদ্ধ করা হয়। পরিখায় নেই কোনো চিমনি বা বায়ু পরিশোধন যন্ত্র, ফলে চামড়া সিদ্ধের দুর্গন্ধ ও ধোঁয়া বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের এলাকায়। এতে মারাত্মকভাবে বায়ু ও পরিবেশদূষণ হচ্ছে। অসুস্থ হয়ে পড়ছে শিশু-কিশোর ও বয়স্ক নারী-পুরুষ। 

সরেজমিনে দেখা গেছে, পোয়াইল গ্রামের মুন্নু শেখের চাতালের সামনে সড়কের পাশেই খোলা জায়গায় শত শত মণ চামড়ার বর্জ্য ফেলে রাখা হয়েছে। চাতালের পাশেও বর্জ্যের স্তূপ রয়েছে। পাশে বিশাল মাটির একটি চুল্লি। একটি চুল্লির কড়াইয়ে অন্তত এক টন চামড়ার উচ্ছিষ্ট ছাঁটভর্তি। দুজন শ্রমিক বর্জ্য সিদ্ধ করার প্রক্রিয়ায় কাজ করছেন। তাদের না আছে মাস্ক, হেলমেট, জুতাসহ কোনো নিরপত্তাসামগ্রী। চুল্লির পাশেই সিদ্ধ করা চামড়া স্তূপ করে রাখা হয়েছে। সারা দিন শ্রমিকরা সিদ্ধ করা চামড়া শুকানোর কাজ করেন। সিদ্ধ চামড়া অনেকটাই কয়লার মতো দেখতে, শ্রমিকদের ভাষায় এগুলোর নাম শুঁটকি। 

শ্রমিকরা জানান, চাতালজুড়ে এসব চামড়ার শুঁটকি রোদে শুকিয়ে তাঁবু ও প্লাস্টিকের চট দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। রাতে যে দুজন শ্রমিক সিদ্ধের কাজ করেন তাদের মজুরি ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা। সারা রাত চামড়া সিদ্ধ করে সকালে তারা চলে যান। আর দিনে নারী ও কিশোর শ্রমিকরা ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা মজুরিতে কাজ করেন। কারখানাটিতে কাজ করা শ্রমিকরা জানেন না যে তারা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন। 

ইয়াসিন শেখ নামে এক শ্রমিক বলেন, ‘ট্যানারিতে যেসব চামড়া পরিত্যক্ত হয়, সেগুলো নিয়ে এ সিদ্ধ করার পর শুকিয়ে দেওয়া আমাদের কাজ। শুনেছি শুঁটকি ভেঙে পাউডার করে মশার কয়েল তৈরি করা হয়।’ তিনি মালিকের নাম জানেন না। তবে লোকনাথ গ্রামের মিন্টু শেখ নামে একজন কারখানাটির তদারকির দায়িত্বে রয়েছেন বলে জানান। রাতে এসে সে শ্রমিকদের বেতন দিয়ে যায়। 

তুহিন শেখ নামে অপর শ্রমিক বলেন, ‘স্থানীয় প্রভাবশালীদের সহযোগিতায় এক মাস ধরে এই কারখানা চলছে। মালিক মাঝে মাঝে ঢাকা থেকে আসে।’ রাতে কেন সিদ্ধ করা হয়Ñ এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘মালিকের নির্দেশ। এ ছাড়া প্রশাসন ও স্থানীয় মানুষ যাতে দুর্গন্ধের কারণে বাধা না দেয়, এজন্য রাতে করা হয়।’

স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি বলেন, কারখানার গন্ধে, ধোঁয়ায় মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে আছি। এলাকার কিছু প্রভাবশালীকে ম্যানেজ করে কারখানা চালাচ্ছে। প্রতিবাদ করতে সাহস পাচ্ছি না। পোয়াইল জেলেপাড়ার বাসিন্দা ঝর্ণা রাজবংশী বলেন, ‘রাতে যখন চামড়া পোড়ানো শুরু হয়, গন্ধে ঘুমাতে পারি না। ভাত খাওয়ার সময় গন্ধে বমি পর্যন্ত হয়। আমরা গরিব মানুষ, নীরবে সহ্য করতে হচ্ছে।’ একই গ্রামের সুবোধ রঞ্জন বলেন, ‘দিনে কম গন্ধ। সন্ধ্যা হলেই চামড়া পোড়ায়, তখন বাড়িতে থাকা অসম্ভব হয়ে যায়। শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। সরকারের কাছে দাবি চামড়া সিদ্ধ বন্ধ করা হোক।’ 

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (দায়িত্বপ্রাপ্ত) মাহামুদুর রহমান বলেন, ‘ট্যানারি চামড়া প্রক্রিয়াকরণ কারখানার গন্ধ জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। চামড়া প্রক্রিয়াকরণে কী ধরনের কেমিক্যাল ব্যবহার হয় সেটা জানা থাকলে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব নির্দিষ্ট করে বলা যেত।’

চাতালমালিক মো. জাফর মোল্যা বলেন, ‘লোকনাথ গ্রামের মিন্টুর মাধ্যমে মৌখিক চুক্তি হয়। তারা শুকনো চামড়ার উচ্ছিষ্ট সিদ্ধ করবে বলে ভাড়া নেয়। ভাড়া নেওয়ার সময় জানায় সবধরনের কাগজপত্র রয়েছে। এটা যে পরিবেশদূষণ করে জানা ছিল না।’ 

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কারখানাটি তদারকির দায়িত্বে থাকা মিন্টু শেখ মোবাইল ফোনে বলেন, ‘প্রথম কিস্তিতে ৬০ টন মাল নেমেছে। এটা সিদ্ধ শেষ হলে কাগজপত্র করতে পারলে কাজ করব, না হলে আর কাজ করব না।’ তবে তিনি কারখানার মালিকের নাম-ঠিকানা কিংবা মোবাইল ফোন নম্বর জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন। 

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তানভীর হাসান চৌধুরী বলেন, ‘একজন এমন একটি কারখানা করবেন বলে ফোন করেছিলেন। তাকে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রসহ কাগজপত্র নিয়ে আসতে বলেছিলাম। পরে সে আর যোগাযোগ করেনি। এ ধরনের কারখানা লোকালয়ে করার বৈধতা নেই, পরিবেশ অধিদপ্তরের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ 

জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাঈদ আনোয়ার বলেন, ‘এ ধরনের কারখানা অবৈধ। এটা পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বা প্রশাসন আমাদের জানায়নি। আপনার মাধ্যমে জানলাম, দুয়েক দিনের মধ্যে সরেজমিনে পরিদর্শন করে কারখানাটি বন্ধের ব্যবস্থা করা হবে।’

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা