ঠাকুরগাঁও
রহিম শুভ, ঠাকুরগাঁও
প্রকাশ : ১৭ নভেম্বর ২০২৪ ১১:৪৭ এএম
ঠাকুরগাঁও সদরের বচাপুকুর গ্রামের সুগারমিলের বাগানে ভোরবেলায় খেজুরের রস সংগ্রহে ব্যস্ত গাছিরা। প্রবা ফটো
উত্তরের জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে নভেম্বরের শুরুতে পড়ে শীত। তবে দিনের বেলায় তেমন ঠাণ্ডা না থাকলেও রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে শীতের প্রকোপ। শীত শুরু হলেই শুরু হয় গাছিদের খেজুরের রস আর গুড় তৈরির ব্যস্ততা।
ঠাকুরগাঁও সদরের নারগুন ইউনিয়নের বচাপুকুর গ্রামে সুগারমিলের জমিতে রয়েছে প্রায় ৮০০ খেজুর গাছ। শীতের শুরুতে রস সংগ্রহের জন্য গাছ প্রস্তুত করছেন গাছিরা। এসব গাছে বাঁধা হয়েছে রসের হাঁড়ি। প্রতিদিন রস পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ১ হাজার লিটার। এ রস বিশেষ কায়দায় জাল দিয়ে তৈরি হচ্ছে সুস্বাদু গুড় ও পাটালি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ভোর ৪টা থেকে খেজুরবাগানে রস খেতে আর গুড় তৈরি দেখতে ভিড় করছে হাজার হাজার দর্শনার্থী। তারা মোটরসাইকেল, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা অথবা মাইক্রোবাস নিয়ে এসে ভোর ৫টা থেকে অপেক্ষায় থাকে খেজুর গুড় বানানো দেখার জন্য।
গাছিদের মধ্যে কেউ বংশ পরম্পরায় জড়িত, আবার কেউবা নয়া শ্রমিক। তারা বলেন, এখন কার্তিক মাস চলছে। শীত শুরু হয়ে গেছে। রস আহরণের জন্য গাছ পরিচর্যায় ব্যস্ততা বেড়েছে। প্রতিদিন প্রায় এক হাজার লিটার রস সংগ্রহ করা হচ্ছে। তবে শীত বাড়লে রস সংগ্রহ আরও বাড়বে।
মো. সোবাহান নামে একজন গাছি বলেন, বর্তমানে ৬ জন কাজ করছি। সারা দিন গাছে হাঁড়ি বাঁধি এবং ভোরে রস সংগ্রহ করি। রসের হাঁড়ির ওপর নেট বা জাল দিয়ে মুখ বেঁধে দিই, যাতে বাদুড় বা অন্যান্য পশুপাখি মুখ না দিতে পারে। এসব গাছ রাস্তার পাশে, পুকুর পাড়ে বেড়ে ওঠা। শীতে আহৃত রস বিক্রি করে প্রতিদিন হাজার টাকা আয় হয়।
নাজমুল হক নামে আরেকজন বলেন, শীত শুরু হয়েছে। তবে ডিসেম্বরে আরও শীত বাড়বে এবং রস সংগ্রহ দ্বিগুণ হবে। ১০ বছর ধরে খেজুরের রস ও গুড় বিক্রি করে সংসার চালাই। বংশ পরম্পরায় এ পেশা জীবিকা উপার্জনের মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
সিঙ্গিয়া গ্রামের রইছ উদ্দিন বলেন, ভোর হতে না হতেই সদরের অনেক মানুষ আসে রস খেতে। যারা প্রথমে আসে, তারা রস পায় আর যারা দেরি করে আসে তারা পায় না। কারণ এখন রস কম। তবে গুড়ের চাহিদা অনেক বেশি। এই বাগানে তিন-চার মাস পরিশ্রম করলে ভালো টাকা আয় করা যায়।
ভোরে খেজুরের বাগানে রস খেতে এসেছেন পৌরসভার বাসিন্দা আইনুল হক। তিনি বলেন, প্রতিবছর এই সময় এই বাগানে আসি খেজুরের রস খেতে। সরাসরি গাছ থেকে হাঁড়ি পেড়ে রস খাই। ভালো লাগে।
পুলক নামে আরেকজন বলেন, আমরা সালন্দর ইউনিয়ন থেকে বেশ কয়েকজন মোটরসাইকেলে নারগুন খেজুরের বাগানে এসেছি। এসে রস খেলাম। প্রতি লিটার রস ৮০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। চোখের সামনে খেজুরের রস দিয়ে গুড় তৈরি হচ্ছে দেখে ভালো লাগছে।
ঠাকুরগাঁওয়ের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক মনতোষ কুমার দে বলেন, ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি খেজুরের রস ও গুড়ের ব্যবসাকে লাভজনক করতে পদক্ষেপ নিতে হবে। এ ছাড়াও বাণিজ্যিক ভিত্তিতে খেজুর গাছের বাগান করা গেলে, এটি হয়ে উঠবে সম্ভাবনাময় খাত। এ জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে।
খেজুর বাগানের মালিক মনিরুজ্জামান মনির বলেন, সুগার মিলের কাছ থেকে বাগানটি ২ লাখ টাকা দিয়ে বর্গা (ইজারা) নিয়েছি। কয়েক দিন থেকে খেজুরের রস সংগ্রহ শুরু হয়েছে। প্রতিদিন বাগানে ৬-৭ জন কাজ করে। প্রাকৃতিকভাবে নির্ভেজাল হওয়ায় এখানকার রস ও গুড়ের চাহিদা বেশি। আশা করছি সব খরচ বাদ দিয়ে আমার এবার ভালো লাভ হবে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, খেজুর গুড়ের ঐতিহ্য ধরে রাখতে গ্রামীণ সড়কগুলোর দুপাশে গাছ লাগাতে স্থানীয়দের উদ্বুদ্ধ করছে কৃষি বিভাগ। জেলার মানুষ আম, কাঁঠাল ও লিচু বাগান করতে বেশি আগ্রহী। আমরা চেষ্টা করব, যেসব অনাবাদি জমি আছে সেগুলোতে কৃষকরা যাতে খেজুরের বাগান করে স্বাবলম্বী হতে পারে। এ ছাড়াও নিরাপদ রস, গুড় উৎপাদনে গাছিদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।