সাইফুল হক মোল্লা দুলু, মধ্যাঞ্চল
প্রকাশ : ১৬ নভেম্বর ২০২৪ ০৯:৪০ এএম
কিশোরগঞ্জ ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতাল। প্রবা ফটো
কিশোরগঞ্জ ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতাল একটি বড় দালালচক্র নিয়ন্ত্রণ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। চক্রটির প্রায় ১০০ সদস্যের কাছে হাসপাতালটির চিকিৎসক ও নার্স থেকে শুরু করে সাধারণ কর্মচারীরাও জিম্মি হয়ে পড়েছে। চক্রটির দাপটে অসহায় হয়ে পড়েছে হাসপাতালে রোগী ও তাদের স্বজনরা।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, জেলার ১৩ উপজেলার অন্যতম চিকিৎসাকেন্দ্র কিশোরগঞ্জ ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতাল। প্রতিদিন জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রায় ১ হাজার ৫০০ রোগী বহির্বিভাগে ও আন্তঃবিভাগে চিকিৎসা নিয়ে থাকে। এর মধ্যে প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ২০০ জন বহির্বিভাগে এবং প্রায় সাড়ে ৩০০ রোগী আন্তঃবিভাগে ভর্তি থেকে হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে অবস্থান করে চিকিৎসা নিয়ে থাকেন।
গতকাল সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, হাসপাতালে দালাল চক্রের সদস্যরা কোনো কোনো চিকিৎসকের কক্ষে দীর্ঘ সময় ধরে আড্ডা দিচ্ছেন।
রোগীদের অভিযোগ, দালালরা হাসপাতালের চিকিৎসক ও অন্য কর্মকর্তাদের কক্ষে আড্ডা দেওয়ায় দূরদূরান্ত থেকে আসা রোগীরা ঠিকমতো চিকিৎসা নিতে পারেন না। সুযোগটি কাজে লাগিয়ে দালালচক্র রোগীদের নানা প্রলোভনে প্রাইভেট ক্লিনিকে নিয়ে যান। গত বৃহস্পতিবারও সদর উপজেলার যশোদল নয়াপাড়া থেকে আসা রোগী আসমা খাতুন ও তার আত্মীয়কে উন্নত চিকিৎসাসেবার কথা বলে এক দালাল হাসপাতালসংলগ্ন একটি ক্লিনিকে নিয়ে যান। পরে প্যাথলজি পরীক্ষার নামে তার কাছ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা হাতিয়ে নেন। একই অভিযোগ করেন বিন্নাটি গ্রামের নূর হোসেন। তার স্ত্রী রোকেয়াকে কম টাকায় সিজার করে দেওয়ার কথা বলে একটি ক্লিনিকে নিয়ে ১৫ হাজার টাকার বিল হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয়। পরে ওই টাকা থেকে দালাল তিন হাজার টাকা কমিশন নেন। নূর হোসেন দুঃখ করে বলেন, এই অবস্থার মধ্যেই চলছে ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, কখনও ফার্মেসি থেকে ওষুধ এনে দেওয়ার নাম করে, কখনও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়ে দেওয়ার কথা বলে দালালরা রোগীর স্বজনদের সর্বস্বান্ত করছে। চক্রটির সঙ্গে তাল মিলিয়ে কিছু চিকিৎসক, নার্স এবং কর্মচারীও প্রতারণার জাল বিস্তার করে রেখেছেন। হাসপাতাল থেকে কোনো রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা কিংবা ময়মনসিংহে স্থানান্তর করা হলে রোগী বহনের জন্য হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স পর্যন্ত পাওয়া যায় না। চক্রের সঙ্গে সমঝোতায় না এলে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সও পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। অস্ত্রোপচারের সময় নার্সদের সঙ্গে গোপন রফায় চক্রের সদস্যরা রোগীর স্বজনকে বাইরের ফার্মেসি থেকে দামি ওষুধ কিনে আনার স্লিপ দেওয়া হয়। সেই স্লিপ অনুযায়ী মোটা টাকায় ওষুধ বা অস্ত্রোপচারসামগ্রী কিনে এনে নার্সের হাতে হস্তান্তর করার পর অধিকাংশ ওষুধ ও সামগ্রী ব্যবহার না করে তা বাইরে বিক্রি করে দেওয়া হয়। প্রসূতি মায়েদের সিজার করার সময়ও এই চক্র নানা খরচের অজুহাত দেখিয়ে স্বজনদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেয়। প্রসূতি মা সন্তান জন্ম দেওয়ার পর নার্সরা বকশিশ বাবদ টাকা দাবি করেন। না দিলে প্রসূতি ও নবজাতকের প্রতি তাদের অবহেলার মাত্রা বেড়ে যায়। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা সদর উপজেলার লতিবাবাদ গ্রামের আফরোজ চুমকি, মহিনন্দ গ্রামের বিলকিস আক্তারসহ একাধিক রোগী অভিযোগ করেন, দুজন দালাল তাদের হাসপাতালে ভালো চিকিৎসা নেই বলে পার্শ্ববর্তী একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এতে রাজি না হওয়ায় ওই দুই দালাল তাদের সঙ্গে অশোভন আচরণ করেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ওই দুই অভিযুক্ত দালাল রমজান মিয়া ও বশির। তাদের কাছে অভিযোগের বিষয়টি তুলে ধরলে তারা দাবি করেন, রোগীদের সহযোগিতা দিয়ে তারা বাড়তি কিছু আয় করেন। তারা বলেন, জমি বিক্রি থেকে শুরু করে সবকিছুতেই দালালি আছে। দালালি একটি ব্যবসা। তাই আমাদের কাজটিকে এত নেতিবাচকভাবে প্রচার করা ঠিক না।
এ ব্যাপারে হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. মো. মাকসুদুর রহমান দালাল চক্রের প্রভাবের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, রোগীর প্রচণ্ড ভিড়ের মধ্যে দালালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন। সপ্তাহে দুই দিন ভ্রাম্যমাণ আদালত কাজ করলে অবস্থার পরিবর্তন হতে বাধ্য। হাসপাতালের কর্মচারীদের এ বিষয়ে সজাগ থাকা ও কোনো অপতৎপরতায় জড়িত না থাকার ব্যাপারে কড়া নির্দেশনা দেওয়া আছে। অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিকভাবে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক ডা. নূর মোহাম্মদ শামসুল আলম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘এ হাসপাতালে আগে থেকেই দালালের উৎপাত ছিল। হাসপাতালসংলগ্ন অনেকগুলো ডায়াগনস্টিক সেন্টার থাকার কারণে দালালের তৎপরতা বেশি।’ তিনি বলেন, দালালের তৎপরতা কমাতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে হাসাপাতালে একটি অস্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ির দাবি জানাচ্ছি। পুলিশ-জনতা এক হয়ে দালাল চক্র প্রতিরোধ করা সম্ভব।