অনিয়ম
সুবল বড়ুয়া, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ১৬ নভেম্বর ২০২৪ ০৮:২৫ এএম
আপডেট : ১৬ নভেম্বর ২০২৪ ০৯:৫২ এএম
ছবি: সংগৃহীত
বরাদ্দের দিক দিয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রকল্প হিসেবে খ্যাত ‘আড়াই হাজার কোটি টাকার’ প্রকল্পের অগ্রগতিতে ভাটা দেখা দিয়েছে। ‘চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের আওতায় এয়ারপোর্ট রোডসহ বিভিন্ন সড়ক উন্নয়ন ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্প অনুমোদনের তিন বছর পার হলেও এখনও নির্মাণ হয়নি ৬০০ মিটার ওভারপাস। এমনকি প্রকল্পটি অনুমোদনের তারিখ থেকে পরবর্তী এক বছরের মধ্যে প্রায় ২০০ লটের দরপত্রের ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে চসিকে তুঘলকি কাণ্ড ঘটে।
প্রকল্পটি থেকে ‘হরিলুটের’ অভিযোগে এক বছরে তিন প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন করা হয়। এমনকি প্রকল্পটির স্বচ্ছতা নিশ্চিতে চসিকের দুই প্রকল্প পরিচালককে বাদ দিয়ে কর্মস্থলে সুনাম থাকা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) নির্বাহী প্রকৌশলী গোলাম ইয়াজদানীকে সমঝোতায় কাজ না দেওয়ায় মারধরও করেন চসিকের সংঘবদ্ধ ঠিকাদার চক্রের একটি দল।
তবে প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, অর্থ বরাদ্দ সংকট, বন্দর কর্তৃপক্ষের গড়িমসি, ঠিকাদারদের ঝামেলাসহ নানা কারণে প্রকল্পটি যথাযথভাবে এগোয়নি। তবে চসিকের নতুন মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে প্রকল্পটিকে এগিয়ে নিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছেন।
চসিকের প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের আওতায় ‘এয়ারপোর্ট রোডসহ বিভিন্ন সড়ক উন্নয়ন ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পটি ২০২২ সালের ৪ জানুয়ারি একনেক সভায় অনুমোদন পায়। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ২ হাজার ৪৯০ কোটি ৯৬ লাখ ৬৯ হাজার টাকা। প্রকল্পের অধীনে চট্টগ্রাম নগরীর গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দর সড়ক সম্প্রসারণসহ রুবি সিমেন্ট এলাকায় ৬০০ মিটারের ওভারপাস, ৭৬২ দশমিক ৮৩ কিলোমিটার সড়ক সংস্কার, ৩৮টি ফুটওভার ব্রিজ, ১৪টি ব্রিজ, ২২টি কালভার্ট এবং ১০টি গোলচত্বর নির্মাণের কথা রয়েছে।
আরও জানা যায়, প্রকল্পটি অনুমোদনের পর শুরুতেই প্রকল্পের পরিচালক করা হয়েছিল চসিকের তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলামকে। পরে একই বছরের ১৪ জুলাই রফিকুল ইসলামকে বাদ দিয়ে চসিকেরই নির্বাহী প্রকৌশলী আবু সাদাত মোহাম্মদ তৈয়বকে প্রকল্প পরিচালক করা হয়। তাদের দুজনের বিরুদ্ধে ১৩৪ কোটি টাকার ৩৭টি লটের দরপত্র ‘পছন্দের ঠিকাদারদের’ সমঝোতার মাধ্যমে ভাগ-বাটোয়ারা করার অভিযোগ ওঠে। তখন ঠিকাদার নিয়োগে ‘হরিলুট’ হওয়াসহ নানা অভিযোগে বিষয়টি নিয়ে বেশ আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল।
সেই সময় চসিকের এই সমালোচনা ঢাকতে এবং সঠিকভাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে হাত দেয় স্থানীয় সরকার বিভাগ। একই বছরের ১৪ আগস্ট প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) সুনাম থাকা নির্বাহী প্রকৌশলী গোলাম ইয়াজদানীকে। তিনি দায়িত্ব নিয়ে ২২০ কোটি টাকার ৩৭ লটের দরপত্র আহ্বান করেন এবং সরকারি ক্রয়পদ্ধতি (পিপিআর) অনুসরণ করে দরপত্র মূল্যায়নে জোর দেন। কিন্তু এরপরও কাজ পেতে নানা তদবির করতে থাকেন চসিকের বেশ কিছু ঠিকাদার। যারা ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী। কিন্তু প্রকল্প পরিচালক রাজি না হওয়ায় গত বছরের ২৮ জানুয়ারি ওইসব ঠিকাদার ওই পরিচালকের কার্যালয়ে ঢুকে তাকে মারধর করেন।
ওই ঘটনায় চসিকের পক্ষ থেকে ১১ ঠিকাদারের বিরুদ্ধে মামলা করেন চসিকের নিরাপত্তা কর্মকর্তা কামাল উদ্দিন। এ সময় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন চার আসামি। আসামিরা হলেনÑ এসজে ট্রেডার্সের সাহাব উদ্দিন, শাহ আমানত ট্রেডার্সের সঞ্জয় ভৌমিক কংকন, মাসুদ এন্টারপ্রাইজের ফেরদৌস, শাহ আমানত ট্রেডার্সের সুভাষ মজুমদার, মেসার্স খান করপোরেশনের হাবিব উল্লাহ খান, মেসার্স নাজিম অ্যান্ড ব্রাদার্সের নাজিম, মেসার্স রাকিব এন্টারপ্রাইজের নাজমুল হাসান ফিরোজ, ইফতেখার অ্যান্ড ব্রাদার্সের ইউসুফ, জ্যোতি এন্টারপ্রাইজের আশীষ বাবু, ফরহাদ ও আলমগীর। কয়েকজনকে অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করা হয়েছে। গ্রেপ্তার চারজন হলেনÑ সঞ্জয় ভৌমিক কংকন, সুভাষ মজুমদার, নাজমুল হাসান ফিরোজ ও মাহমুদ উল্লাহ। তারা ইতোমধ্যে জামিন নিয়ে বের হয়ে গেছেন।
নাম না প্রকাশ করার শর্তে চসিকের প্রকৌশলী বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রকল্প পরিচালক গোলাম ইয়াজদানী ঠিকাদার কর্তৃক মারধরের শিকার হওয়ার পর আর চসিকে আসেননি। তবে প্রকল্পের অধীনে সড়ক সংস্কার, ব্রিজ, কালভার্ট নির্মাণে লট হিসেবে যেসব দরপত্রের ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর কাজ চলমান রয়েছে।’
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নগরের বিমানবন্দর সড়কের সৌন্দর্যবর্ধন, নগরীর চাঁন্দগাও, কাপ্তাই রাস্তার মাথা, হালিশহর এলাকায় কালভার্ট নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। এ ছাড়া আরও কয়েকটি ওয়ার্ডে সড়ক সংস্কারকাজও চলমান রয়েছে। তবে রুবি গেট এলাকায় যে ছয়শ মিটার ওভারপাস নির্মাণের কথা ছিল, তার কোনো অগ্রগতিই নেই।
চসিকের গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পকে এগিয়ে নিতে প্রকৌশলী গোলাম ইয়াজদানীকে সরিয়ে গত জুনে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী আনিসুর রহমানকে। প্রকল্পের অগ্রগতি প্রসঙ্গে তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছি খুব বেশি দিন হয়নি। তবে এই প্রকল্পকে এগিয়ে নিতে পরিকল্পনা অনুসারে কাজ করে যাচ্ছি। তা ছাড়া ইতোমধ্যে সিটি করপোরেশনে নতুন মেয়র (ডা. শাহাদাত হোসেন) দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এই প্রকল্প এগিয়ে নিতে নানা উদ্যোগ নিয়েছেন। বন্দর এলাকায় ছয়শ মিটার ওভারপাস নির্মাণকাজকে এগিয়ে নিতে ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যানের সঙ্গে নতুন মেয়র মহোদয় আলোচনা শুরু করেছেন। সার্ভে করে আমরা বন্দর কর্তৃপক্ষকে দিয়েছি। প্রকল্পটিকে জোরালোভাবে এগিয়ে নিতে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে শিগগিরই একটি বৈঠকে বসব।’
প্রকল্প পরিচালক আরও বলেন, ‘প্রকল্পের অধীনে চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ৭৬২ দশমিক ৮৩ কিলোমিটারের মধ্যে ১৫০ কিলোমিটার সড়ক সংস্কারকাজ করা হয়েছে। আরও ২৫০ কিলোমিটার সড়ক সংস্কারে দরপত্র প্রক্রিয়াধীন। ৩৮টি ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণে ইতোমধ্যে চারটি শেষ হয়েছে। আরও ১৭টি ফুটওভার ব্রিজের ডিজাইন শেষ পর্যায়ে। ১০ গোলচত্বরের মধ্যে চকবাজার, আলকরণ, সিমেন্ট ক্রসিং এলাকার গোলচত্বরের কাজ একদম শেষ পর্যায়ে। এ ছাড়া ১৪টি ব্রিজ, ২২টি কালভার্ট নির্মাণের কাজও শেষ পর্যায়ে।’