মনিরুজ্জামান বাবলু, চাঁদপুর
প্রকাশ : ১৩ নভেম্বর ২০২৪ ১১:৩৮ এএম
আপডেট : ১৩ নভেম্বর ২০২৪ ১১:৪৮ এএম
সংস্কারের পর নান্দনিক রূপে চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জের প্রাচীন ঐতিহাসিক লোহাগড় মঠ। প্রবা ফটো
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর সংস্কারকাজ শুরু করায় নান্দনিক রূপ ফিরে পাচ্ছে চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার লোহাগড় গ্রামের ঐতিহাসিক লোহাগড় মঠ। চারশ থেকে সাতশ শতাব্দী আগে এ তিনটি মঠ নির্মিত বলে স্থানীয়দের ধারণা। নানা কুসংস্কার আর ভয়ের কারণে একসময় স্থানীয়রা মঠের কাছে না ভিড়লেও এখন এসবের কিছুই নেই।
ফরিদগঞ্জ উপজেলার চান্দ্রা বাজারের নিকটবর্তী লোহাগড় গ্রামের ডাকাতিয়া নদীর দক্ষিণে ছোট-বড় তিনটি মঠের অবস্থান। পাশে ফসলি জমি, আধা কিলোমিটার দূরে বসতবাড়ি এবং গ্রামের পাকা সড়ক। সম্প্রতি সংস্কারকাজের অগ্রগতি পরিদর্শনে গেলে দেখা যায়, প্রায় ছয় মাস আগে মঠের কাজ শুরু হয়েছে। সবচেয়ে বড় মঠটির সংস্কারকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ হয়নি বলে জানালেন শ্রমিকরা।
শ্রমিকরা জানান, সংস্কারকাজে কোনো সিমেন্ট ব্যবহার করছি না। শুধু চুন ও সুরকি দিয়ে করা হচ্ছে। বড় মঠটির সংস্কার শেষ করতে আরও দুই মাস লাগবে। এরপর ছোটগুলোর শুরু হবে। প্রতিদিন ৪ জন মিস্ত্রি এবং ৬ শ্রমিক কাজ করছি।
মঠ দেখতে আসা স্থানীয় বাসিন্দা বারাকাত উল্লাহ বলেন, এই মঠ নিয়ে নানা কুসংস্কার আছে। তবে এটি সংস্কারে স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন উদ্যোগ নেয়। স্থানীয়ভাবে কিছু অর্থ বরাদ্দ হলেও ঐতিহাসিক এই স্থাপনা সংরক্ষণ হয়নি। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কাজ শুরু করায় এর নান্দনিকতা ফিরতে শুরু করেছে। কাজ সম্পন্ন হলে এটি একটি পর্যটন এলাকা হিসেবে রূপান্তর হবে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী বিল্লাল হোসেন বলেন, আগে এখানে খুব কম লোকজন আসত। কয়েক মাস আগে শ্রমিকরা কাজ শুরু করেছেন। লোকজন এটি দেখার জন্য আসছে। দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন এলে কিছুটা হলেও সেবা দিতে পারব।
উপজেলার ধানুয়া গ্রাম থেকে মঠ দেখতে আসা শিক্ষার্থী লিমন বলেন, মঠগুলো সংস্কার হচ্ছে শুনে দেখতে এসেছি। এর আগেও এসেছি কয়েকবার। এখন খুব সুন্দর লাগছে।
স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান জসিম উদ্দীন স্বপন মিয়া বলেন, এই মঠ আমাদের জেলার ঐতিহাসিক স্থাপনার মধ্যে একটি। এগুলো নিয়ে আগের জনপ্রতিনিধিরা উদ্যোগ নিলেও কাজের অগ্রগতি হয়নি। এখন সরকারিভাবে সংস্কার শুরু হয়েছে। আমাদের পক্ষ থেকেও সহযোগিতা থাকবে।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কুমিল্লা আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী বিদ্যুৎ চন্দ্র দাস বলেন, গত অর্থবছর থেকে মঠগুলোর সংস্কারের কাজ শুরু করেছি। পুরো কাজ সম্পন্ন করতে আরও সময় লাগবে। আমরা শুধু এগুলো রিমডেলিং করছি। যাতে ঐতিহাসিক এ স্থাপনাগুলোর স্থায়িত্ব বাড়ে। এ কাজে সিমেন্টের বদলে চুন ও সুরকি ব্যবহার হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, অধিদপ্তরের কাজই হচ্ছে ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো প্রথম সংস্কার, পরে সংরক্ষণ ও নান্দনিক করে গড়ে তোলা। এখানেও তা করা হবে এবং জনগণের সামনে এটির সৌন্দর্য উপস্থাপন করা হবে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চারশ থেকে সাতশ বছর আগে লোহাগড়ের জমিদাররা এই এলাকায় রাজত্ব করতেন। মঠের মতো বিশালাকার দুটি প্রাসাদ নির্মাণ করেন। এই প্রাসাদেই জমিদাররা তাদের বিচারকার্য সম্পাদন করতেন।
অন্য আরেকটি সূত্রমতে, প্রতাপশালী দুই রাজা লৌহ এবং গহড় ছিলেন অত্যাচারী রাজা। তাদের ভয়ে কেউ মঠসংলগ্ন রাস্তা দিয়ে যেতে শব্দ করতেন না। জনৈক এক ব্রিটিশ কর্তাব্যক্তি ঘোড়া নিয়ে প্রাসাদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বলেছিলেন, কেমন রাজা রে এরা বাবু রাস্তাগুলো ঠিক নেই। পরবর্তীতে এ কথা জমিদারের গোলামরা শোনে এবং লৌহ ও গহড়কে অবহিত করে।
কথিত আছে, ওই কর্তাব্যক্তির জন্য নদীর তীর হতে জমিদার বাড়ি পর্যন্ত সিকি ও আধুলি মুদ্রা দিয়ে রাস্তা তৈরি করা হয়। যার প্রস্থ ছিল দুই হাত, উচ্চতা এক হাত ও দৈর্ঘ্য ২০০ হাত। পরে ওই রাস্তাটিতে স্বর্ণ-মুদ্রা দ্বারা ভরিয়ে দেওয়া হয়। যখন ওই ব্যক্তি রাস্তাটি ধরে আসছিলেন তখন এ দৃশ্য দেখে চমকে ওঠেন। জমিদারি আমলে সাধারণ মানুষ এদের বাড়ির সামনে দিয়ে চলাফেরা করতে পারত না। বাড়ির সামনে দিয়ে বয়ে যাওয়া ডাকাতিয়া নদীতে নৌকা চলাচল করত নিঃশব্দে। নদীর কূলে তাদের বাড়ির অবস্থানের নির্দেশিকাস্বরূপ সুউচ্চ মঠটি নির্মাণ করেন। আর্থিক প্রতিপত্তির নিদর্শনস্বরূপ তারা মঠের শিখরে একটি স্বর্ণদণ্ড¬ স্থাপন করেন। কথিত আছে, জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পর ওই স্বর্ণের লোভে মঠের শিখরে ওঠার অপচেষ্টায় অনেকে গুরুতর আহত হয়। কেউ কেউ মৃত্যুবরণ করেছে বলেও শোনা যায়।