সাইদুল ইসলাম মন্টু, বেতাগী (বরগুনা)
প্রকাশ : ১২ নভেম্বর ২০২৪ ১১:৩৬ এএম
আপডেট : ১২ নভেম্বর ২০২৪ ১৩:৪২ পিএম
বরগুনার বেতাগীতে সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে রোপন করা গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। উপজেলার সদর ইউনিয়নের ঝোপখালী বেড়িবাঁধ থেকে তোলা। প্রবা ফটো
সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে রোপণ করা বরগুনার বেতাগী উপজেলার বিভিন্ন সড়কের গাছের মৃত্যু পরোয়ানা জারি করেছে বন বিভাগ। এর মধ্যে এসব গাছের গায়ে নম্বর দিয়ে কেটে ফেলার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কিছু কিছু সড়কের গাছ কাটাও হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষেত্রে খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় এসব গাছ ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের সময় উপজেলার বাসিন্দাদের সুরক্ষা দিয়েছে। একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক গাছ কেটে ফেলার ঘটনায় তাদের মধ্যে শঙ্কা বিরাজ করছে।
স্থানীয়রা জানান, বেতাগী পৌরসভার সবদার চান মুন্সীর মাজার থেকে বেতাগী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স প্রধান ফটক পর্যন্ত সড়কের দুপাশের রেইনট্রি, আকাশমণি, কড়ই, মেহগনিসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ রোপণ করা হয়েছিল। সেখানের বেশিরভাগ গাছ নেই। তবে কয়েকটি আকাশমণি গাছ মৃত্যুর পরোয়ানা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিটি গাছে নম্বর দেওয়া হয়েছে কাটার জন্য।
উপজেলার বুড়ামজুমদার ইউনিয়নের বদনীখালী বাজার থেকে কনার খাল পর্যন্ত সড়কের দুপাশে লাগানো গাছ কাটা হবে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দরপত্র আহ্বান করে গাছ বিক্রি করেছে বন বিভাগ। স্থানীয়রা মনে করতেন, এই লাল চিহ্নিত নম্বরগুলো গাছ গণনার জন্য দেওয়া হয়েছে। গাছগুলো কাটা হবে- এ কথা শুনে বিস্মিত হন তারা। একসঙ্গে এত গাছ কাটার কথা শুনে তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
বেতাগী পৌরসভার দাস বাড়ি থেকে সদর ইউনিয়নের বাসন্ডা পুলের হাট ৪ কিলোমিটর সড়ক, কাজীর হাট মহাসড়ক থেকে বেড়িবাঁধ হয়ে জলিসা ইউপি পর্যন্ত ৬ কিলোমিটার সড়ক, বদনীখালী খেয়াঘাট থেকে কাউনিয়া খেয়াঘাট ২ কিলোমিটার সড়ক ও বদনীখালী থেকে চরখালী ৩ কিলোমিটারসহ বিভিন্ন এলাকার একাধিক সড়কের লাল কালিতে গাছে নম্বর দিয়ে চিহ্নিত করে রাখা হয়েছে। গাছগুলো কবে কাটা শুরু হবে- এমন প্রশ্নে বন বিভাগ জানায়, সেটা বলা যাচ্ছে না, তবে সাময়িক কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও পর্যায়ক্রমে গাছ কাটা শুরু হবে। এক-দেড় বছর সময় লাগতে পারে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৫ হাজার ৯৫৭ হেক্টর আয়তনের বেতাগী উপজেলায় ১ লাখ ২৫ হাজার ৪৬৪ মানুষের বসবাস। এখানে ৪ হাজার ৩৬৯ হেক্টর বন রয়েছে; যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। উপজেলা বন বিভাগ জানিয়েছে, ১৯৯১ সাল থেকে বন বিভাগ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ১৮০ কিলোমিটার সড়কে সামাজিক বনায়নের আওতায় নানা প্রজাতির গাছ রোপণ করেছিল। তাদের হিসাব অনুযায়ী এর মধ্যে উন্নয়নের প্রয়োজনে ৫০ কিলোমিটার সড়কের গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। সামাজিক বনায়নের বিধিমালা অনুযায়ী অংশীদারত্বমূলক বনায়নের সর্বনিম্ন বয়স ১০ বছর আর সর্বোচ্চ ২০ বছর। কিন্তু গাছগুলোর বয়স ১৫-২০ বছরেরও অধিক, তাই এখন কাটতেই হবে।
স্থানীয় মোকলেচুর রহমান হয়ে বলেন, ‘এই গাছগুলো আমাদের জীবন বাঁচায়। এদের আশ্রয় করেই আমরা টিকে আছি। আমাদের মানবজাতির অক্সিজেন হলো গাছ। এই গাছগুলো কাটলে আমাদের নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে। আমাদের প্রত্যাশা গাছগুলো বেঁচে থাকুক।’
কৃষক ও পরিবেশবান্ধব স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুস সোবাহান বলেন, ‘সাম্প্রতিক ঘূর্ণিঝড় ও বন্যায় ব্যাপক গাছ ভেঙে ও উপড়ে পড়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবল থেকে রক্ষা পেতে তাই অধিক হারে গাছ লাগানোর কথা। সেখানে গাছ কাটার কথা শুনে বিস্মিত হয়েছি। প্রয়োজনে স্থানীয় মানুষদের বন বিভাগ অন্যভাবে সুবিধা দেওয়া হোক। তবুও সময়ের প্রয়োজনে হাজারো গাছ কাটার উদ্যোগ বন্ধ করা জরুরি।’
বেতাগী সরকারি কলেজের ভূগোল বিষয়ের অধ্যাপক মানবেন্দ্র সাধক বলেন, সরকারি কোনো কর্মসূচি থাকলে তা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়নে এগিয়ে আসতে হবে। সামাজিক বনায়নের ক্ষেত্রে সুষ্ঠু নীতিমালা প্রণয়ন, জনগোষ্ঠীকে নতুন করে বনায়নে উদ্বুদ্ধকরণে সরকাারি-বেসরকারি উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির সঙ্গে সম্পৃক্ত উপজেলা এনজিওবিষয়ক সন্বয়ক রফিকুল ইসলাম বলেন, সামাজিক বনায়নের এই নীতি থেকে বন বিভাগের বেরিয়ে আসা দরকার। এ রকম মুনাফাকেন্দ্রিক নীতি শেষ পর্যন্ত পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর; যা দ্রুত বর্ধনশীল গাছ লাগানোর দিকে নিয়ে যায়। পরিবেশ, প্রকৃতি ও বাস্তুসংস্থানের কথা চিন্তা করে সামাজিক বনায়নের ক্ষেত্র দেশীয় ঔষধি, বনজ ও ফলদ গাছ লাগানো প্রয়োজন। তাতে করে গাছ না কেটে উপকারভোগী ও বন বিভাগ দুই-ই লাভবান হবে ও এলাকাও সুরক্ষা পাবে।
উপজেলা বন বিভাগের কর্মকর্তা বেলায়েত হোসেন বলেন, বিধিমালা অনুযায়ীই গাছগুলো কাটতে হবে। রাস্তায় সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে গাছ লাগানো হয়েছিল। স্থানীয় বাসিন্দারা গাছের পরিচর্যা করেছেন। সামাজিক বনায়ন বিধিমালা-২০০৪ অনুযায়ী, গাছ বিক্রির টাকা উপকারভোগী ৫৫ ভাগ, বন অধিদপ্তর ১০ ভাগ, ভূমির মালিক হিসেবে সওজ ২০ ভাগ ও ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) পাঁচ ভাগ পাবে। বাকি ১০ ভাগ টাকা দিয়ে আবার বনায়ন করা হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও উপজেলা প্রশাসক ফারুক আহমদ বলেন, বিষয়টি বন বিভাগের দায়িত্বে। তাদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করব।