শফিক সরকার, ময়মনসিংহ
প্রকাশ : ১১ নভেম্বর ২০২৪ ১৫:২৯ পিএম
আপডেট : ১১ নভেম্বর ২০২৪ ১৫:২৯ পিএম
মুক্তাগাছার জমিদার মহারাজা সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী নির্মিত ঐতিহ্যবাহী ‘আলেকজান্ডার ক্যাসেল’টি সংস্কারের অভাবে ধ্বংসের মুখে। প্রবা ফটো
আজ থেকে প্রায় দেড়শ বছর আগে নান্দনিক এক স্থাপনা নির্মাণ করেন ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার জমিদার মহারাজা সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী। প্রভাবশালী এ মানুষটি জেলার বিভিন্ন স্থানে গড়েছেন নানা স্থাপনা। কালের সাক্ষী হয়ে টিকে থাকা তার অন্য অনেক স্থাপনার মধ্যে অন্যতম ‘আলেকজান্ডার ক্যাসেল’। লোহার পাত দিয়ে তৈরি দ্বিতল বাড়িটি সংস্কারের অভাবে বর্তমানে জরাজীর্ণ। যেকোনো সময় ধসে পড়তে পারে। তবে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর বলেছে, সংস্কারের প্রস্তাবনা মন্ত্রণালয়ে জমা রয়েছে। পাস হলেই কাজ ধরা হবে।
বিভিন্ন বই ও ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৪৫ বছর আগে ১৮৭৯ সালে ময়মসিংহের ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ে নগরীর আদালতপাড়া-সংলগ্ন এলাকায় প্রায় ২৭ একর জমির বাগানবাড়িতে অট্টালিকাটি নির্মাণ করা হয়। কথিত আছে, সেই সময় ৪৫ হাজার টাকা ব্যয় হয় বাড়িটি নির্মাণে। পরবর্তীতে এর নামকরণ করা হয় আলেকজান্ডার ক্যাসেল। তবে এ নাম নিয়ে রয়েছে মতবিরোধ। কেউ বলেছেন, ব্রিটিশ শাসক সপ্তম এডওয়ার্ডের স্ত্রী আলেকজান্দ্রা অব ডেনমার্কের নামানুসারে এই বাড়ির নামকরণ করা হয়। ইতিহাসবিদদের কেউ বলছেন, তৎকালীন কালেক্টর এনএস আলেকজান্ডারের নামানুসারে এর নামকরণ হয়। বাড়িটি তৈরিতে লোহার ব্যবহার বেশি ছিল বিধায় স্থানীয়দের কাছে এটি ‘লোহার কুঠি’ নামেও পরিচিত।
বলা হয়, বাড়িটি নির্মাণে সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী সুদূর চীন থেকে এনেছিলেন দক্ষ কারিগর। প্রায় এক বছর সময় নিয়ে কাঠ ও লোহার সমন্বয়ে দৃষ্টিনন্দন বাড়িটি নির্মাণ করেন কারিগররা। লোহার বাড়ির প্রধান ফটকের সামনে দুটি মার্বেল পাথরের মূর্তি এবং এর পাশে আরও কয়েকজন নারীর আবক্ষ মূর্তি রয়েছে।
পুরো বাড়ি একটা বিশাল স্তম্ভমূলের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। দ্বিতল ভবনের ছাদে অভ্র ও চুমকি ব্যবহার করে ভেতরে ঠান্ডা রাখার ব্যবস্থা করা। বাড়ির পেছনে ছিল বিশাল এক পুকুর, ফুলের বাগান ও একটি কৃত্রিম হ্রদ। কিন্তু এখন এসবের কিছুই নেই। বাড়ির সামনে রয়েছে ল্যাবরেটরি সরকারি স্কুল। পাশে সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ। পেছনে আদালতপাড়া। আলেকজান্ডার ক্যাসেল মূলত মহারাজ সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী অতিথিশালা হিসেবে ব্যবহার করতেন।
পুরো ভবনটিতে একসময় হস্ত বা কারুশিল্পকর্মের অসাধারণ নিদর্শন ছিল। সময়ের ধারাবাহিকতায় সেসব শিল্পকর্ম জৌলুশ হারিয়েছে। তবে যেটুকু এখনও আছে, এসব দেখেও মুগ্ধ হন দর্শকরা। জমিদারদের আরেক কীর্তি রয়েছে শশিলজ। বিভিন্ন এলাকা থেকে দর্শকরা শশিলজ দেখার পর আলেকজান্ডার ক্যাসেল বেড়াতে আসেন।
বহু গুণী ও বরেণ্য ব্যক্তি ময়মনসিংহ সফরকালে তৎকালীন সময়ে এই বাড়িতে রাত্রি যাপন করেছেন। সূত্র অনুযায়ী, ১৯২৬ সালে ময়মনসিংহ সফরে এসে এই বাড়িতে কয়েকদিন ছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। একই বছর এখানে আসেন মহাত্মা গান্ধী। এই বাড়িতে এসেছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, নওয়াব স্যার সলিমুল্লাহ, লর্ড কার্জন, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, ওয়াজেদ আলী খান পন্নীসহ আরও অনেক গুণী ব্যক্তি।
দেশভাগের পর ১৯৪৮ সালে আলেকজান্ডার ক্যাসেলকে ঘিরে নির্মিত হয় টিচার্স ট্রেনিং কলেজ। প্রথমদিকে এই বাড়িতেই ক্লাস নেওয়া হতো। পরবর্তীতে কলেজের ভবন নির্মিত হলে এটি গ্রন্থাগার হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। ক্যাসেলের একতলায় আটটি ঘরে কলেজের প্রায় বিশ হাজার বই রাখা আছে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ২০১৯ সালে আলেকজান্ডার ক্যাসেলটিকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকেই এটি এই অধিদপ্তরের আওতায় রয়েছে। তবে কলেজ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে গ্রন্থাগার হিসেবে এটি ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ চাইলে তারা ছেড়ে দেবেন বাড়িটি। ক্যাসেলের সীমানার ভেতর রয়েছে শিশুকানন কিন্ডারগার্টেন, ময়মনসিংহ গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুল, উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটসহ মোট সাতটি সরকারি প্রতিষ্ঠান।
এই আলেকজান্ডার ক্যাসেল ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে থাকলেও ভবনটি জরাজীর্ণ অবস্থায় এখনও টিকে আছে। সংস্কারের অভাবে ধ্বংসের মুখে। খসে পড়ছে ক্যাসেলের পলেস্তারা, চুরি হয়ে যাচ্ছে লোহার তৈরি বিভিন্ন অংশ, বিভিন্ন জায়গায় দেখা দিয়েছে ফাটল। অযত্ন-অবহেলায় ভেঙে গেছে মার্বেল পাথরের দুটি ভাস্কর্যের হাত। দুর্ঘটনা এড়াতে ফটকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ লিখে একটি সাইনবোর্ড টানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। কিন্তু কেউ মানছে না এ আদেশ।
ময়মনসিংহের সুজনের মহানগর সম্পাদক আলী ইউসুফ বলেন, জমিদার মহারাজা সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী ময়মনসিংহ ও মুক্তাগাছায় চীন থেকে আনা দক্ষ কারিগর দ্বারা অনেক স্থাপনা নির্মাণ করেছিলেন। আজ সেই স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি জরাজীর্ণ ও ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে। সংস্কার করা না হলে ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে যাবে পুরাকীর্তিটি।
ময়মনসিংহের সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর জয়নাল আবেদীন খান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আলেকজান্ডার ক্যাসেল কলেজের গ্রন্থাগার হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। পরবর্তীতে এটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর নিয়ে নেয়। তবে এখনও গ্রন্থাগারটি রয়ে গেছে। তারা চাইলে আমরা ছেড়ে দেব। গ্রন্থাগার থাকায় ভেতরের অবকাঠামো এখনও ঠিক আছে, না হলে অনেক আগেই ঘরের মালামাল চুরি হয়ে যেত।
এ বিষয়ে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক আফরোজা খান মিতা বলেন, আলেকাজান্ডার ক্যাসেল, মুক্তাগাছার জমিদারবাড়ি, শশিলজসহ ময়মনসিংহ অঞ্চলের প্রায় অধিকাংশ পুরাকীর্তি সংস্কারের বাজেট চেয়ে প্রস্তাবনা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। পাস হলেই কাজ করা হবে।