যশোর সংবাদদাতা
প্রকাশ : ২৬ নভেম্বর ২০২২ ১৬:২৬ পিএম
আপডেট : ২৬ নভেম্বর ২০২২ ১৭:০০ পিএম
নষ্ট হচ্ছে কোটি টাকার সোলার স্ট্রিট লাইট। ছবি : প্রবা
সন্ধ্যা নামার পর যশোরের কেশবপুর উপজেলার মাইকেল রোড দিয়ে চলার সময় চৌরাস্তা মোড়ে আসতেই অন্ধকারে গা ছমছম করত। একই অবস্থা ছিল সোনাতোলা নামের মাঠের ভেতরেও। ছিল চোর-ডাকাতের ভয়ও। এমন অনেক রাস্তাঘাট ও জনগুরুত্বপূর্ণ স্থানে ধাপে ধাপে স্ট্রিট লাইট বসানোর মাধ্যমে আলোর ব্যবস্থা করে সাহস যুগিয়েছিল গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার (কাবিখা) এবং গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (টিআর) কর্মসূচি।
স্থানীয়রা জানান, সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জ্বলে উঠত লাইটগুলো। আবার ভোরে সূর্যের আলোতে নিভে যেত।
মানুষের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করেছিল এই প্রকল্প। তবে সেই আলো নিভে গেছে। দেখভালের অভাবে নষ্ট হচ্ছে কোটি টাকার সোলার স্ট্রিট লাইটগুলো।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের আওতায় ২০১৭-২০১৮ অর্থ বছর থেকে শুরু হওয়া এই ধারাবাহিক প্রকল্প হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায় ২০১৯-২০২০ অর্থ বছরে। ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে কাবিখার ১ কোটি ১৮ লাখ ৭৯ হাজার ৫৬০ টাকা খরচে ১৪৯টি স্ট্রিট লাইট স্থাপন করা হয়। এই অর্থ বছরে টিআর এর ৮ লাখ ৪৮ হাজার ৫৪০ টাকা খরচে ১১টি সোলার স্ট্রিট লাইট বসানো হয়। প্রতিটি লাইটে গড়ে খরচ হয় ৭৯ হাজার ৫৫০ টাকা ৬২ পয়সা।
২০১৮-২০১৯ অর্থ বছরে কাবিখার ১ কোটি ৫৪ লাখ ২৮ হাজার টাকা খরচে ২০০টি এবং টিআরের ১ কোটি ৪৩ লাখ ৪৮ হাজার ৪০ টাকা খরচে ১৮৬টি সোলার স্ট্রিট লাইট স্থাপন করা হয়। এ অর্থবছরে সর্বোচ্চ সংখ্যক লাইট বসানো হয়। গড়ে প্রতিটি লাইটে খরচ হয় ৭৭ হাজার ১৪০ টাকা।
সর্বশেষ ২০১৯-২০২০ অর্থ বছরে কাবিখার ১ কোটি ৩৩ লাখ ৪৫ হাজার ২২০ টাকা খরচে ১৭৩টি এবং টিআর এর ১ কোটি ৩১ লাখ ৯০ হাজার ৯৪০ টাকা খরচে ১৭১টি সোলার স্ট্রিট লাইট স্থাপন করে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যালয়। যেখানে গড়ে প্রতিটি লাইটে খরচ দেখানো হয় ৭৭ হাজার ১৪০ টাকা। কেশবপুর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে তিন অর্থ বছরে ৬ কোটি ৯০ লাখ ৪০ হাজার ৩০০ টাকা খরচে মোট ৮৯০টি সোলার স্ট্রিট লাইট বসানো হয়।
শুক্রবার গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার মজিদপুর এতিমখানার সামনে মেইন রোডের পাশে একটি লাইট বসানো হয়েছিল। সেটি নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। ইউনিয়ন পরিষদের মাঠে দুটি লাইটের মধ্যে একটি নষ্ট। আবু চেয়ারম্যানের কবরের সামনে রাস্তার পাশে একটি ও বাগদাহ মহিউস সুন্নাহ হাফিজিয়া মাদ্রাসার সামনে একটি লাইটের ব্যাটারি ও সোলার প্যানেল চুরি হয়ে গেছে। দেউলি বাজারের দুটি লাইটের মধ্যে একটি নষ্ট। প্রতাবপুর বাজারের চারটির মধ্যে একটি নষ্ট ও হাসানপুর বাজারের পুরাতন কৃষি ব্যাংকের সামনে একটি নষ্ট। সুফলাকাটি ইউনিয়নের ফেসবুক মোড়ে তিনটি নষ্ট। সাগরদাঁড়ি ইউনিয়ন পরিষদের সামনে একটি নষ্ট। সাগরদাঁড়ী কপোতাক্ষ নদীর দুই পাড়ে ছয়টি নষ্ট। ত্রিমোহনি-বাঁশবাড়িয়া সোনাতোলা মাঠে পাঁচটি, জিয়েলতলা বাজারের দুটিই নষ্ট ছিল। পরে বাজার কমিটি থেকে মেরামত করেছে ঝিকরা গনির মোড়ে একটি নষ্ট।
স্থানীয়রা জানান, বর্তমানে অধিকাংশ সোলার স্ট্রিট লাইটগুলো নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। রক্ষণাবেক্ষণ বা পরবর্তীতে মেরামতের জন্য কোনো ফান্ড না থাকার কারণে অনেকের নজরে আসছে না বিষয়টি। যে কারণে জনদুর্ভোগ ফিরে এসেছে। এক সময় অন্ধকার দূর করতে আলোকিত উপজেলা গড়তে এই প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। এখন যেন আবার গোটা উপজেলাব্যাপী আলোর পরে অন্ধকার নেমে এসেছে। দেখভালের অভাবে চোরেরা ব্যাটারি ও সোলার প্যানেল চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। কেউ কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এক্সপার্ট গ্রুপের ফাউন্ডার এবং ম্যানেজিং ডিরেক্টর এনএইচ রিমন বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে তিন বছর মেয়াদ শেষ হওয়া লাইটগুলো আবেদনের মাধ্যমে পিআইও অফিসকে জানিয়ে দিয়েছি। যেগুলোর মেয়াদ আছে অফিস সেগুলো মেরামতের জন্য বললে আমরা মেরামত করে দিব।’
কেশবপুর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) শুভাগত বিশ্বাস বলেন, ‘লাইটগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে সোলার প্যানেলের উপরে ময়লা পড়ার কারণে। অনেক সময় ছায়াযুক্ত স্থানে লাইট বসানোর কারণে ব্যাটারিতে চার্জ উঠছে না। প্রকল্পটি দ্রুত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করতে হয়েছিল, যার কারণে চেয়ারম্যান, মেম্বররা যে যে স্থানের লিস্ট পাঠিয়েছিল সেখানে সেখানে বসানো হয়েছে। ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে লাইট বসানোর সুযোগ হয়নি। পরবর্তীতে স্ট্রিট সোলার লাইটের জন্য কোনো বরাদ্দ আসেনি। এ কারণে আমাদের কিছু করার নেই। তবে বিষয়টি নিয়ে আমরাও চিন্তিত। দেখা যাক উপরমহল থেকে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় কি না।’