ঠাকুরগাঁও
রহিম শুভ, ঠাকুরগাঁও
প্রকাশ : ৩১ অক্টোবর ২০২৪ ১৮:৩০ পিএম
আপডেট : ৩১ অক্টোবর ২০২৪ ১৮:৩৬ পিএম
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার রাজাগাঁও ইউনিয়নে এলজিইডির তত্ত্বাবধানে নির্মাণ করা একটি সেতু উদ্বোধনের তিন মাসেই ধসে পড়েছে এর সংযোগ সড়ক। প্রবা ফটো
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার রাজাগাঁও ইউনিয়নে এলজিইডির তত্ত্বাবধানে নির্মাণ করা একটি সেতু উদ্বোধনের তিন মাসেই ধসে পড়েছে এর সংযোগ সড়ক। এতে সেতুটি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় দুর্ভোগে পড়েছে এলাকাবাসী।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালে সদর উপজেলার
আসাননগর ও রাজাগাঁও ইউনিয়নের মাঝামাঝি স্থানে রাজাগাঁও থেকে সদরে যাওয়ার প্রধান সড়কে
পিএসসি গার্ডার সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। সঙ্গে প্রায় এক কিলোমিটার সংযোগ সড়কও
রয়েছে। ২ হাজার ৫০০ মিটার দৈর্ঘ্যের সেতুটি নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় প্রায় সাড়ে ছয়
কোটি টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেন জামাল হোসেন নামের এক ঠিকাদার। গত বছরের ২ মার্চ
সেতুটি উদ্বোধন করেন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ও ঠাকুরগাঁও-১
আসনের সাবেক সংসদ সদস্য রমেশ চন্দ সেন।
স্থানীয়রা জানায়, সেতুটি উদ্বোধনের পর তিন
মাসের মধ্যেই এর সংযোগ সড়কের দেয়াল ও ব্লকসহ নদীতে ধসে পড়ে। এরপর এলাকাবাসী বালুর
বস্তা দিয়ে সাময়িকভাবে কোনো রকম মানুষের চলাচল ঠিক রাখার ব্যবস্থা করে। এভাবে কয়েকবারই
ধসে পড়ে আবার এলাকাবাসী ঠিক করে, কিন্তু সামান্য বৃষ্টিতে আবারও সেতুটির পশ্চিম তীরের
সড়কের একটি অংশের ব্লক ভেঙে যায়।
এ ছাড়া সড়ক ভেঙে বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হয়। এভাবে কিছু দিন থাকার পর স্থানীয়রা বালুর
বস্তা ও বাঁশ দিয়ে সংস্কার করে চলাচলের ব্যবস্থা করে। তবে মানুষ ছাড়া সব ধরনের ভারী
যানবাহন চলাচল করতে পারছে না সেতুটি দিয়ে। সংযোগ সড়ক ধসে পড়ায় সেতুটিও অকেজো হয়ে
পড়েছে। ফলে সাড়ে ছয় কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা সেতুটি মানুষের কোনো কাজেই আসছে
না। বরং সেতুর সংযোগ সড়কটি এখন পথচারীদের পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সংযোগ সড়কের বেহাল দশা নিয়ে স্থানীয়রা এলজিইডি কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার
জানালেও আমলে নেননি সংশ্লিষ্টরা। ফলে রাজাগাঁও ইউনিয়নের আসাননগর ও খড়িবাড়ি এলাকার
কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য নিয়ে শহরের পাইকারি বাজারে নিতে বাড়তি অর্থ গুনতে হচ্ছে।
আসাননগর গ্রামের বাসিন্দা বকুল হোসেন বলেন, ‘ছোট্ট একটা সেতু আর সাড়ে ৭০০ মিটারের
রাস্তার কাজে এত টাকা বরাদ্দ হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি,
ঠিকাদার ও এলজিইডি কর্তৃপক্ষ লাখ লাখ টাকা লুটপাট করে খেয়েছে। তা না হলে এমন অবস্থা
সৃষ্টি হতো না। আমরা দাবি করছি, এ কাজের সঠিক তদন্ত হোক। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়
কর্তৃপক্ষ ও বিভাগীয় দায়িত্বরতরা কাজের মান পরীক্ষা করলেই অর্থ লুটের বিষয়টি বেরিয়ে
আসবে।’
রাজাগাঁও ইউনিয়নের বাসিন্দা অভিজিৎ রায় বলেন,
‘সেতুর পাড় যখন ভেঙে যায় আমরা স্থানীয়রা বালুর বস্তা দিয়ে কোনোমতে সেতুটা মেরামত করি।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের ফসল বাজারে নিতে পারি না। এত টাকার সেতুর কাজ যদি তিন মাসে ভেঙে
যায়, তাহলে তো এখানে হরিলুট হয়েছে। এটার সঠিক তদন্ত করা হোক এবং ব্রিজটি মেরামত করা
হোক আমাদের দাবি।’
রাজাগাঁও ইউনিয়নে কলেজছাত্র রাকিব বলেন, ‘রাতের বেলায় মোটরসাইকেল নিয়ে আসা যায় না।
কোনো কোনো সময় গর্তে পড়ে যাই। পাশের এলাকার কেউ এলে দুর্ঘটনার শিকার হয়। আমাদের দাবি,
ব্রিজটা যেন দ্রুত মেরামত করা হয়।’
আরেক বাসিন্দা কবিরুল ইসলাম বলেন, ‘উদ্বোধনের
তিন মাসের মধ্যেই সেতুর রাস্তা ভেঙে গেছে। পরে আমরা স্থানীয়রা বাঁশ ও বালুর বস্তা দিয়ে
কোনোমতে মেরামত করেছি। বৃষ্টিতে আবার বালুর বস্তা সরে আগের দুর্ভোগে পড়েছি। ভারী কোনো
যানবাহন চলাচল করতে পারে না। আমাদের কৃষিপণ্য বহন করতে সমস্যা হয়। দ্রুত এটার সংস্কার
চাই।’
এ ব্যাপারে সদর উপজেলা প্রকৌশলী আব্দুল কাদের
বলেন, ‘এ প্রকল্পের আওতায় শুরুতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫ কোটি ২৫ লাখ টাকা। পরে তা বাড়িয়ে
করা হয়েছে প্রায় সাড়ে ছয় কোটি টাকা। সাম্প্রতিক টানা বৃষ্টিতে সেতুর কোনো ক্ষতি না
হলেও সংযোগ সড়ক ভেঙে গেছে। বিষয়টি আমরা অবগত। ঊর্ধ্বতনদের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
বরাদ্দ পেলেই সংস্কার করা হবে।’
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডির) নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মামুন বিশ্বাস
বলেন, ‘সেতুটির সঙ্গে সংযোগ সড়ক সংস্কার জরুরি। আমরা চেষ্টা করছি দ্রুত সংস্কার করার
জন্য। ইতোমধ্যে সংস্কারের জন্য ঢাকায় এস্টিমেট পাঠানো হয়েছে। অপেক্ষায় আছি বরাদ্দের
জন্য। তবে এ কাজে কোনো অনিয়ম ও অর্থ লুট হয়নি।’