নড়াইলে ভাঙছে নবগঙ্গা নদী
এস কে সুজয়, নড়াইল
প্রকাশ : ২৮ অক্টোবর ২০২৪ ০৯:৩৪ এএম
নবগঙ্গা নদীর তীব্র ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে বহু স্থাপনাস বসতভিটা। গত শুক্রবার দুপুরে কালিয়া উপজেলার শুক্তগ্রামে। প্রবা ফটো
‘আমার বাড়িঘর সব নদীতে চলে গেছে। বসতবাড়ি হারায়ে এখন আমি সর্বস্বান্ত হয়ে গিছি। ছেলে-মেয়েদের নিয়ে কোথায় থাকব, কী করব-কিছুই বুঝতে পারছি না। এই বাড়িটুকু ছাড়া আমার আর কোনো জায়গাজমিও নেই, যে সেখানে একটু মাথা গোঁজার মতো জায়গা পাব। আকাশের নিচে ছাড়া আমার থাকার কোনো জায়গা নেই।’
কথাগুলো বলছিলেন নড়াইলের কালিয়া উপজেলার নবগঙ্গা নদীর ভাঙনে বসতবাড়ি হারিয়ে সর্বস্বান্ত ফুলি বিবি। শুধু ফুলি বিবির বাড়িঘর নয়, গত ১৫ দিনে নবগঙ্গা নদীর তীব্র ভাঙনে নদীগর্ভে চলে গেছে বহু লোকের বসতভিটা, ফসলি জমি, কাঁচাপাকা ঘর, গাছপালা ও বিভিন্ন স্থাপনা। আর ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ বারইপাড়া মাহাজন সড়ক, বসতবাড়ি, বাজার ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। এতে আতঙ্কে রয়েছে এলাকাবাসী।
উপজেলার নদীপাড়ের বিভিন্ন ইউনিয়নের হাজারো বাসিন্দার কাছে নদীভাঙন একটি চিরচেনা বিষয়। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে বাসিন্দারা তীব্র ভাঙনের কবলে পড়েন। এ বছরও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। কয়েক সপ্তাহের তীব্র ভাঙনে নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে নদীতীরবর্তী বিভিন্ন স্থাপনা।
সরেজমিনে জানা যায়, কয়েক সপ্তাহ ধরে কালিয়া উপজেলার কাঞ্চনপুর এলাকায় চলছে নবগঙ্গা নদীর তীব্র ভাঙন। নদীগর্ভে চলে গেছে বহু ঘরবাড়ি, গাছপালা ও বিভিন্ন স্থাপনা। ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে বারইপাড়া মাহাজন সড়ক, মানুষের বসতভিটা, কবরস্থান, মসজিদ, পাকা রাস্তা ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। সড়কটি নদীগর্ভে বিলীন হলে তলিয়ে যাবে হাজার হাজার একর ফসলি জমি, ভেসে যাবে শত শত মাছের ঘের।
কাঞ্চনপুর এলাকার বাসিন্দা মো. আলেক শেখ বলেন, ‘আমাদের বাড়িঘর সব নদীতে চলে গেছে। আমাদের মাথা গোঁজার মতো এই বাড়িটাই শুধু ছিল; তাও চলে গেল। এখন আমার ছেলে-মেয়েদের নিয়ে খুব কষ্টে জীবনযাপন করছি।’
একই গ্রামের বাসিন্দা আশরাফ মুক্তার বলেন, আমরা খুবই আতঙ্কে দিন পার করছি। আমাদের এই রাস্তা যদি ভেঙে যায় তাহলে আমাদের বাড়িসহ সবকিছু নদীতে চলে যাবে। সেইসঙ্গে আমাদের এলাকার সব পুকুর ঘেরসহ ফসলি জমি নদীতে চলে যাবে। আমাদের এলাকার প্রায় সবাই এই কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে।
বসতবাড়ি হারিয়ে দিশাহারা তবিবুর শেখ আবেগঘন হয়ে বলেন, আমার সারা জীবনের কষ্টের ফসল এই বাড়িটা, তাও নদীতে চলে গেল। অনেক কষ্টে আমি বাড়িটা করেছিলাম। আমার আর কিছুই থাকল না। জানি না এখন পরিবার নিয়ে কোথায় থাকব।
আঙিনার সবজিক্ষেত ও বসতবাড়ি হারিয়ে কান্নায় ভেঙে পথে আশ্রয় নেওয়া হাসি বেগম বলেন, আমার আার কিছুই নেই। সব নদীতে চলে গেছে। আশ্রয় নেওয়ার মতো এখন আমার রাস্তা ছাড়া আর কোথাও জায়গা নেই। রাতে ঘুম নেই, ঠিকমতো খাবার নেই, কীভাবে রাতদিন পার করছি আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না।
ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ভাঙন রোধে অতীতে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলে নদীভাঙন রোধে প্রাথমিক চেষ্টা করা হয়। ভাঙনকবলিত এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন নদীপাড়ের বাসিন্দারা।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে নড়াইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী উজ্জ্বল কুমার সেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে জরুরিভাবে ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আশা করছি, দ্রুতই কাজ শুরু করা সম্ভব হবে।’