সাইদুল ইসলাম মন্টু, বেতাগী (বরগুনা)
প্রকাশ : ২৮ অক্টোবর ২০২৪ ০৯:২০ এএম
বাবার কোলে চড়ে স্নাতক পরীক্ষা দিতে এসেছেন সাগর মল্লিক। বেতাগী সরকারি পাইলট উচ্চবিদ্যালয় থেকে শনিবার তোলা। প্রবা ফটো
বেতাগী সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় পরীক্ষাকেন্দ্রে স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষা চলছে। শেষ ঘণ্টা ৫টা বাজতেই কেন্দ্রের ওপর তলার সিঁড়ি বেয়ে পরীক্ষার্থীরা বেরিয়ে আসতে লাগল। তাদের পেছনেই চুল-দাড়ি পাকা এক ব্যক্তিকে কোলে করে নিয়ে আসতে দেখা গেল একজনকে। প্রথমটায় মনে হলো হলো হয়তোবা কেউ অসুস্থ। আসলে তা নয়। একটু সম্মুখপানে এগিয়ে কক্ষ পরিদর্শক প্রভাষক তাসলিমা বেগমকে জিজ্ঞেস করতেই বিভ্রান্তি দূর হলো। তার কোলে একটি ছেলে। ষাটোর্ধ্ব মো. হারুণ মল্লিক তার বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ছেলে স্নাতক পরীক্ষার্থী মো. সাগরকে নিয়ে কেন্দ্র থেকে বের হচ্ছেন।
এভাবেই প্রতিদিন শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কাছে হার না-মানা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সাগর কখনও বাবা কখনও ভাইয়ের কোলে করেই পরীক্ষাকেন্দ্রে যাওয়া-আসা করছেন। এর আগে সাগর উপজেলার সদর ইউনিয়নের দক্ষিণ রানীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে লেখাপড়ায় হাতেখড়ি দিয়ে বাড়ি থেকে তিন কিলোমিটার দূরে পুটিয়াখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসিতে ৩.৮৫, ৫ কিলোমিটার দূরে পৌর শহরে অবস্থিত বেতাগী সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসিতে ৩.৮৩ পেয়ে উত্তীর্ণ হন।
দুটো পা আছে, থাকলেও তা বেঁটে। সেগুলোয় বল পায় না ছেলেটি। হাতের অবস্থাও বেঁটে ও দুর্বল। বাম হাতেও নেই শক্তি। তবে যেটুকু সম্বল তার ডান হাত। এ নিয়েই চলেছে তার নিরন্তর লড়াই। এর আগেও সব সময় মা-বাবা ও ভাইয়ের কোলে চড়েই ওকে স্কুলে যেতে হয়েছে।
জানা গেছে, উপজেলার সদর ইউনিয়নের দক্ষিণ রানীপুর গ্রামে তার বাড়ি। সাগরের মা রুমা বেগম গৃহিণী। তিন বোন ও তিন ভাইয়ের মধ্যে সাগর মেঝ। এর মধ্যে এইচএসসি পড়ুয়া বড় ভাই মো. শাহীন সংসারের জোগান দিতে ব্যস্ত, ছোট ছেলে হাসান রহমতপুর মাদ্রাসায় অধ্যয়নরত। দুই বোনের বিয়ে হয়েছে আর ছোট বোন মোসা. জান্নাতি ওই কলেজে এইচএসসি পাসের পর এখন বিএ ক্লাসে ভর্তির অপেক্ষায়।
বাবা হারুণ মল্লিক জানান, তার ছেলে জন্ম থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধী। তবে দূর থেকে সবটা বুঝে ওঠার উপায় নেই। দুটো পা, একটি হাত নিশ্চল। তাই নিজের পায়ে দাঁড়াতে বা হাঁটতে পারে না। শুধু বসা অবস্থায় ডান হাতটি দিয়ে কলম ধরে লিখতে পারে সে।
জন্ম থেকেই সাগর বড় মনের অধিকারী। তার হাসিভরা মুখ। তাই তার মা-বাবা আদর করে নাম রাখেন সাগর। শরীরের এই প্রতিবন্ধিতাকে হাসিমুখেই জয় করেছে ছেলেটি। মনোবল হারায়নি।
সাগরের চিকিৎসার জন্য তার বাবা অনেক ডাক্তার ও কবিরাজের কাছে নিয়েছেন। কিন্তু ভাগ্য তাদের সহায় হয়নি। তবুও আশা ছাড়ছেননি।
বেতাগী সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ সমর কুমার বেপারি জানান, জন্ম থেকে সে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন। অন্যের সহায়তা ছাড়া একা একা সে হাঁটতে পারে না। এর মাঝেও পড়ালোখা করার ইচ্ছটা তার প্রবল।
বেতাগী উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. মাসুম বিল্লাহ জানান, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তি হিসেবে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির আওতায় ছেলেটিকে সমাজসেবা থেকে প্রতিবন্ধী ভাতা প্রদান করা হয়। তবে তা যথেষ্ট নয়। মেধাবী ও দরিদ্র শিক্ষার্থী হিসেবে তাকে আরও সহায়তা দেওয়া জরুরি। এ জন্য সমাজের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
জানতে চাইলে বেতাগী উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও উপজেলা পরিষদের প্রশাসক ফারুক আহমদ বলেন, ‘অদম্য ছেলেটি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন হয়েও সমাজের জন্য অনুকরণীয় ও দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তার প্রতি আমাদের বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। প্রশাসন তার পাশে থাকবে।’