শাহিনুর সুজন, চারঘাট (রাজশাহী)
প্রকাশ : ২৬ অক্টোবর ২০২৪ ১৬:৩৭ পিএম
স্বাস্থ্যবিধি না মেনে ধানক্ষেতে কীটনাশক ছিটাচ্ছেন কৃষক। গত রবিবার রাজশাহীর চারঘাটের নিমপাড়া ইউনিয়নের ভাটপাড়া গ্রামে। প্রবা ফটো
আমন ধান ও আমগাছের পরিচর্যায় এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন রাজশাহীর কৃষকরা। জমিতে ধানের রোগ দমন এবং পোকার হাত থেকে রক্ষায় বিভিন্ন কীটনাশক ছিটাচ্ছেন তারা। পাশাপাশি জমি ও ধানের পুষ্টি জোগাতে প্রয়োগ করছেন রাসায়নিক সার। আমগাছের পরিচর্যায়ও ব্যবহার করা হচ্ছে হরমোন ও কীটনাশক। কিন্তু এসব রাসায়নিক স্যার, কীটনাশক ও হরমোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনো নিয়মকানুনই মানা হচ্ছে না। এতে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে কৃষকদের।
কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (আইপিএম) ও গুড এগ্রিকালচার প্র্যাকটিস (জিএপি) নীতিমালার পরামর্শ হলো, রাসায়নিক সার বা কীটনাশক ব্যবহারের সময় মুখে মাস্ক ব্যবহার ও শরীরের অন্যান্য অংশে কীটনাশকের অনুপ্রবেশ রোধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা থাকতে হবে। এ ছাড়া বাতাসের উল্টোদিকে তা প্রয়োগ করা যাবে না। এ বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়াসহ ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যসচেতনতা অবলম্বন করতে পরামর্শ দেওয়ার পরও কৃষকরা সচেতন হচ্ছেন না বলে অভিযোগ কৃষি বিভাগের। তবে কৃষকরা বলছেন, কৃষি অফিস শুধু কাগজকলমে পরামর্শ দেওয়ার মধ্যেই তাদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রেখেছে। মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নে কোনো উদ্যোগ নেই তাদের।
জিরো বাজেট ন্যাচারাল ফার্মিং (জেডবিএনএফ) রাজশাহীর জরিপ বলছে, রাজশাহীতে কোনো ধরনের সুরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়াই কীটনাশক ও হরমোন প্রয়োগ করছেন ৮৫ শতাংশের বেশি কৃষক। ফলে এসব রাসায়নিক ও কীটনাশকের ক্ষতিকারক উপাদানগুলো দেহে প্রবেশ করে মরণব্যাধির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। একই সঙ্গে তা মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে কমিয়ে দিচ্ছে। তা ছাড়া এতে কৃষকের যেমন বাড়তি খরচ হচ্ছে, তেমনি নিজের শরীর ও পরিবেশের ওপরও পড়ছে বিরূপ প্রভাব।
সম্প্রতি সরেজমিনে রাজশাহীর চারঘাট ও বাঘা উপজেলার বিভিন্ন মাঠে গিয়ে দেখা যায়, কৃষকরা আমনের ক্ষেতে ছত্রাক ও মাজরা পোকা দমনে নানা রকম কীটনাশক ছিটাচ্ছেন। কিন্তু কীটনাশক ছিটানোর ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যগত বিধিনিষেধ একেবারেই মানছেন না তারা।
চারঘাট উপজেলার ভাটাপাড়া গ্রামের কৃষক রবিউল ইসলাম বলেন, ‘আমন ক্ষেতে ছত্রাক আক্রমণ করেছে। এজন্য ছত্রাকনাশক টুপার কীটনাশক স্প্রে করছি। কিন্তু কীটনাশক স্প্রে করার ক্ষেত্রে কোনো বিধিনিষেধ আছে বলে শুনিনি কখনও। মুখ না ঢেকে খালি হাতেই স্প্রে করি। মাঝেমধ্যে মাথাব্যথা ও মাথা ঘোরার মতো ভাব হয়। তখন বেশি পানি দিয়ে গোসল করি। দোকান থেকে মাথাব্যথার ওষুধ খাই।’
চারঘাট উপজেলার সরদহ গ্রামের কৃষক মোস্তাফিজ আলী বলেন, ‘কৃষি অফিসে প্রশিক্ষণে গেলে কীটনাশক স্প্রে করার নিয়মকানুনের কথা বলা হয়। কিন্তু মাঠে কাজ করার সময় এসব মনে থাকে না। তা ছাড়া হ্যান্ড গ্লাভস, মাস্ক কেনার টাকাও নেই। কৃষি অফিস পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো সরবরাহ করলে আমার মতো কৃষকরা নিয়মকানুন মানতে পারত।’
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, রাজশাহী জেলায় মোট কৃষিজমির পরিমাণ ১ লাখ ৮১ হাজার ৬০৯ হেক্টর। এই জমিতে ২ লাখ ৯৯ হাজার ৬৭০ মেট্রিক টন ইউরিয়া, ১ লাখ ৫ হাজার ১১৪ মেট্রিক টন টিএসপি, ১ লাখ ৪৬ হাজার ২০০ মেট্রিক টন এমওপি ও ১ লাখ ২৯ হাজার ৬৩২ মেট্রিক টন ডিএপি সার ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া নানা রকমের কীটনাশক ও হরমোন ব্যবহার হয়ে থাকে, যার সঠিক পরিসংখ্যান কৃষি অধিদপ্তরের কাছে নেই। ২ লাখ ২৯ হাজার ১৯৪টি কৃষি পরিবার এসব সার ও কীটনাশক ব্যবহার করে থাকে। তা ছাড়া জেলায় ১৯ হাজার ৫৭৮ হেক্টর জমিতে আম বাগান রয়েছে।
বাঘা উপজেলার তুলশিপুর গ্রামের আমচাষি তারিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমগাছের পরিচর্যায় আমরা হরমোন ও কীটনাশক ব্যবহার করছি। এসব বিষ স্প্রে করার আগে নিজের শরীরকে সুরক্ষিত করে নিতে হয়। কিন্তু যেসব শ্রমিক এসব কাজ করছেন তাদের বারবার বলার পরও তাদেরকে বিধিনিষেধের আওতায় আনতে পারছি না।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রাজশাহীর উপপরিচালক মোছা. উম্মে ছালমা বলেন, আমরা সারা বছরই কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি কীটনাশক ছিটানোর আগে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যসচেতনতা নিশ্চিত করতে তাগিদ দিয়ে যাচ্ছি। আইপিএম অনুযায়ী কীটনাশক ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছি। কিন্তু অনেকেই বিষয়টি মানছেন না। ভবিষ্যতে বিষয়টি নিশ্চিত করতে আরও বিশেষ উদ্যোগ নেব।