ইসমাইল মাহমুদ, মৌলভীবাজার
প্রকাশ : ২৬ অক্টোবর ২০২৪ ১৪:৩৮ পিএম
শ্রীমঙ্গল উপজেলার দক্ষিণ মুসলিমবাগ এলাকার বাড়িতে রাব্বি হোসেন। প্রবা ফটো
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার দক্ষিণ মুসলিমবাগ এলাকার সতেরো বছরের রাব্বি হোসেন। স্বপ্ন ছিল লেখাপড়া শেষে বড় চাকরি করে পরিবারের কষ্ট লাঘব করবে। কিন্তু তার স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় পরিবারের দরিদ্রতা। দিনমজুর বাবার একার আয়ে পরিবার চালানো কঠিন হয়ে পড়ায় ২০২২ সালে পরিবারের বড় ছেলে হিসেবে লেখাপড়ার ইতি টেনে টমটম চালানো শুরু করে রাব্বি। বাবা-ছেলের আয়ে পরিবারে যখন কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে, তখনই রাব্বির জীবনে নামে অমানিশার অন্ধকার।
গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আনন্দ মিছিলে অংশ নিয়ে গুলিতে বাম চোখ হারিয়ে দারুণ দুঃখে-কষ্টে দিন কাটছে রাব্বির। শুধু বাম চোখ নয়, মাথা, কণ্ঠনালিসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আরও ৩০টি ছররা গুলি লাগে। সবার সহায়তায় গত দুই মাস চিকিৎসা চালিয়েছে তার পরিবার। এখন অর্থাভাবে অনেকটা বন্ধ হয়ে গেছে চিকিৎসা। এ পরিস্থিতিতে চিকিৎসার অভাবে রাব্বির ডান চোখ নিয়েও দেখা দিয়েছে শঙ্কা।
পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শ্রীমঙ্গল বর্ডার গার্ড পাবলিক হাই স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষার্থী রাব্বি হোসেন ২০২১ সালে অষ্টম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়। এরপর পরিবারের টানাপড়েনে লেখাপড়ার পাট চুকিয়ে শুরু করে কালিঘাট রোড থেকে মুসলিমবাগ গাংপাড় রোডে ভাড়ায় টমটম চালানো। গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর গাড়ি বন্ধ করে মুসলিমবাগ এলাকা থেকে অন্যদের সঙ্গে রাব্বি আনন্দ মিছিলে যোগ দেয়। বেলা ৩টা নাগাদ মিছিলটি শ্রীমঙ্গল শহরের চৌমুহনা চত্বরের পাশে মৌলভীবাজার রোডস্থ থানার সামনে এলে শুরু হয় মুহুর্মুহু গুলি। ছররা গুলিতে মিছিলের অনেকেই আহত হন। তবে সবচেয়ে বেশি গুলিবিদ্ধ হয় মিছিলের অগ্রভাগে থাকা রাব্বি। তার বাম চোখ, মাথা, গলা ও শরীরে অন্তত ৩০টি গুলি লাগে। কে বা কারা গুলি করেছে এখনও জানে না রাব্বি বা তার পরিবার। ঘটনার পরপরই স্থানীয়রা রাব্বিকে প্রথমে শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। পরে সেখান থেকে তাকে পাঠানো হয় মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট সদর জেনারেল হাসপাতালে। ওই হাসপাতালে তার কণ্ঠনালি থেকে ছররা গুলি বের করার পর তাকে স্থানান্তর করা হয় মাতারকাপন আধুনিক চক্ষু হাসপাতালে। পরে বাড়িতে নিয়ে এসে এক দিন পর স্থানীয়দের সহায়তায় তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। ঢাকায় নেওয়ার পর অপারেশন করে তার বাম চোখ তুলে ফেলা হয় এবং ডান চোখে লেন্স সংযোজনের পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা। কিন্তু টাকার অভাবে ডান চোখে লেন্স সংযোজনসহ শরীরের ছররা গুলি বের করার ব্যয়বহুল চিকিৎসা অব্যাহত রাখা সম্ভব হয়নি পরিবারের পক্ষে। বর্তমানে অর্থাভাবে বিনা চিকিৎসায় ডান চোখও নষ্ট হওয়ার পথে।
ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে রাব্বি হোসেন বলেন, ‘৫ আগস্ট মুসলিমবাগ থেকে অনেকের সঙ্গে আনন্দ মিছিলে যাই। মৌলভীবাজার রোড থানার সামনে এলে হঠাৎ ধাওয়া পাল্টা-ধাওয়া শুরু হয়। এরপর শুরু হয় গুলি। একটা গুলি আমার বাঁ চোখে লাগে। এ ছাড়া শরীরে অনেকগুলো গুলি লাগে। গুলির পর রাস্তায় পড়ে যাই। আমাদের ২নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর আব্দুল জব্বার আজাদ ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করে শ্রীমঙ্গল সরকারি মেডিকেলে নিয়ে আসেন। সেখান থেকে আমাকে মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে রেফার করা হয়। মৌলভীবাজার থেকে বলা হয় আমাকে ইমার্জেন্সি ঢাকা নিয়ে যেতে হবে। এরপর টাকা-পয়সার সমস্যা হওয়ায় আমাকে বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। এক দিন বাড়িতেই ছিলাম। পরদিন সেইভ দ্যা ফিউচার ফাউন্ডেশন শ্রীমঙ্গল শাখার সভাপতি মতিউর রহমান মতিন ও অন্যান্য মানুষের সহায়তায় আমাকে ঢাকা নিয়ে যাওয়া হয়। ঢাকার এশিয়া ডিজিটাল চক্ষু হাসপাতালে আমাকে নিয়ে যাওয়ার পর সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান আমার বাম চোখ পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। আমার এ অবস্থায় সরকারি বা বেসরকারি কোনো স্থান থেকেই আমাকে কোনো সাহায্য করা হয়নি। আমি আমার চিকিৎসায় সরকারি সহযোগিতা কামনা করছি।’
রাব্বি হোসেনের মা রুনা বেগম বলেন, ‘৫ আগস্ট আমরা পুতে আনন্দ মিছিলে গিয়া চোখ হারাইছে। মিছিলে গিয়া পুতের চোখ ও সারা শরীরে গুলি লাগছে এ কথা ঘর থাইকা শুইন্না দৌড়াইয়া গেছি। যখন গাংপাড় গেছি তখন কোনো গাড়ি নাই, কিছু নাই। তখন মতিন ভাইরে সাথে লইয়া হাইট্টা হাসপাতাল গেছি। হাসপাতালে গিয়ে আমার ছেলের সারা শরীরে অনেক গুলি দেইখ্যা তারে মৌলভীবাজার নিয়া গেছি। ওইদিন সন্ধ্যার পর বাড়িতে আসি। তখনও তারা বলে নাই তার চোখ নষ্ট অইয়া গেছে। পরদিন রাত ১২টার দিকে সবার সহযোগিতায় পুলার বাপে পুতেরে নিয়া ঢাকায় যায়। ঢাকার হাসপাতালে অপারেশন করে বাম চোখ থেকে গুলি বাইর কইরা আনে। আমার ছেলের জীবন নষ্ট হয়ে গেছে। ডাক্তার কইছে সে রইদে কাজ করতে পারতো না, ওজন কিছু লইতে পারতো না। সারা জীবন সে কীভাবে খাইবো, কীভাবে চলবো। তার বয়স মাত্র ১৭ বছর। কীভাবে তার ভবিষ্যৎ যাইবো, কীভাবে সে কর্ম কইরা খাইবো? সরকারের কাছে আবেদনÑ আমার ছেলের চিকিৎসার ব্যবস্থা ও তাকে যেন একটা কর্ম দেয়। আর কিছুই দরকার নাই আমরার।’
রাব্বির বাবা আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘৫ আগস্ট আনন্দ মিছিলে গিয়া আমার ছেলে আহত অইছে। তার একটা চোখ নষ্ট অই গেছে। শরীরেও অনেকগুলা গুলি লাগছে। আমি সরকারের কাছে আবেদন করতেছি আমার ছেলের একটা কর্মের ব্যবস্থা করে দিক। আমি অন্য কোনো কিছুই সরকারের কাছে চাইতেছি না।’
সেইভ দ্যা ফিউচার ফাউন্ডেশন শ্রীমঙ্গল শাখার সভাপতি মতিউর রহমান মতিন বলেন, ‘আমি রাব্বি হোসেনের প্রতিবেশী। যখন শুনেছি, ছেলেটার একটি চোখ নষ্ট হয়ে গেছে তখন সর্বোচ্চ চেষ্টা ও সহযোগিতা কইরা তারে ঢাকা পাঠাইছি। ঢাকায় অপারেশন কইরা তার চোখটা ফালাই দেওয়া হইছে। তারা অসহায় মানুষ, দিনমজুর। ছোট এক বাসায় ভাড়া থাকে। প্রত্যেকটা উপজেলায় ইউএনও পর্যায়ে যারা আছেন উনার নাকি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে যে ছাত্ররা আহত হইছে তাদের সুচিকিৎসা এবং পাশাপাশি সরকারিভাবে সহযোগিতা করছেন। আমার আবেদন থাকবে রাব্বি হোসেনকে যেন আমাদের শ্রীমঙ্গলের উপজেলা প্রশাসন এবং সরকারের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হয়। পাশাপাশি তার একটা চাকরি বা একটা কর্মের ব্যবস্থা যেন করে দেওয়া হয়।’
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবু তালেব বলেন, ‘৫ আগস্ট সারা দেশে মিছিলের ধারাবাহিকতায় আমাদের শ্রীমঙ্গলেও মিছিল হয়েছে। সে মুহূর্তে অনেকেই আক্রান্ত হয়েছেন। রাব্বি হয়তো শ্রীমঙ্গল হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নেয়নি। সে হয়তো মৌলভীবাজার হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়েছে। শ্রীমঙ্গলে রাব্বিসহ আহত সবাই যেন সরকারি সাহায্য, সহযোগিতা পায় আমরা সে ব্যবস্থা নেব।’