বরগুনার বেতাগী
সাইদুল ইসলাম মন্টু, বেতাগী (বরগুনা)
প্রকাশ : ২৪ অক্টোবর ২০২৪ ১৪:৩১ পিএম
বিদ্যালয়ের খেলার মাঠ নেই। সামনে ছোট্ট জায়গা, সেখানেও নানা উপকরণ। তাই শিক্ষার্থীরা খেলছে চলাচলের রাস্তায়। বুধবার সকালে বরগুনার বেতাগী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। প্রবা ফটো
‘ফুটবল খেলা দেখলে খুব খেলতে ইচ্ছে করে; কিন্তু খেলব কোথায়। বিদ্যালয়ে তো খেলার মাঠ নেই।’ মনের কষ্টে কথাগুলো বলছিল বেতাগী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী ইফতেহাদ ইকবাল সাইফ।
সাইফ একাই নয়, পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী মাউসুফা নওরীণ, তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী সুহায়েলা সুবহা সাউদা, দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষাথী তামজিদ মাহামুদ সাফিনসহ এই প্রতিষ্ঠানে খেলার জন্য উন্মুক্ত মাঠ না থাকায় খেলাধুলার সুযোগ পাচ্ছে না তারা।
বেতাগী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে। মাত্র ৫ শতক জমির ওপর টিনশেডের ঘরে পাঠদান শুরু করা হলেও ২০০৬-০৭ অর্থবছরে এলজিইডির অর্থায়নে নতুন দ্বিতল ভবন করা হয়েছে। ছয়টি ক্লাসরুমে ২০৭ জন শিক্ষার্থীর জন্য প্রধান শিক্ষকসহ মোট ১২ জন শিক্ষক রয়েছেন। কিন্তু বিদ্যালয়টিতে খেলার মাঠ বলতে মানুষের যাতায়াতের সড়ক। যে কারণে ক্লাস শেষে শিক্ষার্থীদের কেউ খেলাধুলা করতে পারে না।
বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক রুহুল আমীন সোহেল বলেন, ‘মাত্র ৫ শতক জমিতে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। দুই ভবনের মাঝে সামান্য পরিমাণেও জমি নেই, রয়েছে চলাচলের পথ। সেই চলাচলের পথেই কিছু শিক্ষার্থী খেলাধুলা করে।’
একই অবস্থা বেতাগী মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টিরও। বিদ্যালয়টি ১৯৪২ সালে ৭ শতক জমির ওপর প্রতিষ্ঠার পর টিনশেডের ঘরে শুরু চলে পাঠ কার্যক্রম। ১৯৯৯ সালে সাইক্লোন সেন্টার কাম প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবনের কাজ শুরু হয়। পরবর্তীতে ২০০৭ ও ২০২২ সালে এক তলা ও তিন তলাবিশিষ্ট আরও দুটি ভবন নির্মাণ করা হয়। যার কাজ এখনও চলমান রয়েছে। এখানে বর্তমানে ৫০৪ জন শিক্ষার্থীর জন্য রয়েছে প্রধান শিক্ষকসহ মোট ১৯ জন শিক্ষক। এত শিক্ষার্থী থাকা সত্ত্বেও বিদ্যালয়টিতে নেই কোনো খেলার মাঠ।
বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক জেসমিন আক্তার বলেন ‘জমি না থাকার কারণে আমাদের এখানে খেলার মাঠ নেই। পাশের একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে খেলার মাঠ থাকায় আমাদের শিক্ষার্থীরা সেখানে খেলতে যায়। এমনকি বিদ্যালয়ের বার্ষিক ক্রীড়ানুষ্ঠানের আয়োজনও সেখানে করা হয়।’
শুধু ওই দুটি বিদ্যালয় নয়, এভাবেই মাঠের অভাবে মনের কষ্টে ভুগছে দেড় লাখ জনসংখ্যা অধ্যূষিত উপকূলীয় এ জনপদের প্রাথমিক পর্যায় পড়ুয়া অধিকাংশ শিক্ষার্থী। বেতাগী পৌর এলাকায় খেলার মাঠ খুবই কম। পৌর এলাকায় ছয়টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একমাত্র পূর্ব বেতাগী আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ব্যতিরেকে বেতাগী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বেতাগী মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মধ্য বেতাগী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পূর্ব বেতাগী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও বাসন্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কোনো খেলার মাঠ নেই।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত এক জরিপের দাবি, ১২৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৪০টিতেই কোনো খেলার মাঠ নেই। স্বল্প পরিসরে রয়েছে ৩৯টিতে, তার অবস্থাও খুবই নাজুক; আর চলনসই রয়েছে ৫০টিতে।
বেতাগী স্পোর্টস একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও শিক্ষক মো. সোহেল রানা বলেন, ‘খেলাধুলার ব্যবস্থা না থাকলে শিক্ষার্থীদের মেধার বিকাশ ঘটানো সম্ভব নয়। যেসব বিদ্যালয়ে খেলার মাঠ নেই, সেসব প্রতিষ্ঠানে বিশেষ প্রকল্পের আওতায় খেলার মাঠ স্থাপন করা জরুরি।’
সাবেক বাংলাদেশ জাতীয় দলের ফুটবলার ও অনূর্ধ্ব-২৩ ফুটবল দলের অধিনায়ক ফিরোজ মাহমুদ টিটু বলেন, ‘প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শ্রেণিকক্ষের তুলনায় বাইরের শিক্ষা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। খেলাধুলার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মাঝে প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব তৈরি হয়। খেলতে গিয়ে একে অন্যের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে, সামাজিকীকরণ হয়। তাই বিদ্যালয় যখন প্রতিষ্ঠা করা হয় তখন অবশ্যই মাঠের বিষয়টি খেয়াল রাখা উচিত।’
উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ওয়াহিদুর রহমান বলেন, ‘অধিকাংশ বিদ্যালয়ে মাঠ না থাকার বিষয়টি আমাদের জানা আছে। এ নিয়ে শিক্ষা কমিটির সভায় আলোচনা হয়েছে। বিদ্যালয়গুলোর পরিচালনা কমিটি ও শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে পরিকল্পনা করে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হবে।’
বরগুনা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবু জাফর মো. সালে বলেন, ‘জেলায় যেসব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে, এর মধ্যে নতুন ভবন সম্প্রসারণ, স্থানান্তরসহ নানা কারণে জমি স্বল্পতায় অনেক বিদ্যালয়ে বর্তমানে খেলার মাঠ নেই। যেসব স্কুলে খেলার মাঠ নেই, আমরা সেসব স্কুলের তালিকা করে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি।’
বেতাগী ক্রীড়া সংস্থার সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারুক আহমদ বলেন, ‘লেখাপড়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো খেলাধুলা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অবশ্যই খেলার মাঠ থাকতে হবে। যেসব স্কুলে খেলার মাঠ নেই, জায়গার সমস্যা না হলে সেসব প্রতিষ্ঠানে পর্যায়ক্রমে মাঠ তৈরি করা হবে।’