জহুরুল ইসলাম, কুষ্টিয়া
প্রকাশ : ২৩ অক্টোবর ২০২৪ ১২:১৭ পিএম
কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার কয়া গ্রামের ‘স্বপ্নভূমি ফুটবল একাডেমির’ খুদে ফুটবলাররা। প্রবা ফটো
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা বিপ্লবী বাঘা যতীনের পদধন্য কয়া গ্রামের অবস্থান কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলায়। এই গ্রামেই জন্মেছিলেন বিখ্যাত ঔপন্যাসিক আকবর হোসেন। তবে পূর্বসূরিদের ঐতিহ্য হারিয়ে এখানকার শিশু, কিশোর ও উঠতি যুবকদের গ্রাস করে নিয়েছে মোবাইল ফোন আর নেশাদ্রব্য। তাদের একটি অংশ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছিল। বিপদগামী এসব যুবা-কিশোরদের সেখান থেকে তুলে ফুটবল মাঠে নিয়ে এসেছেন তরুণ ব্যবসায়ী মিলন হাসান। তিনি প্রত্যন্ত ওই গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘স্বপ্নভূমি ফুটবল একাডেমি’। যেখানে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে দেড় শতাধিক কিশোর-যুবক। এই একাডেমি স্থানীয় কিশোর আর উঠতি যুবকদের আলোর দিশা দেখাচ্ছে।
মিলনের পূর্বসূরিরাও খেলাধুলায় যুক্ত ছিলেন। তার দাদা আব্দুল গণি শেখ ছিলেন কুস্তিগীর। আর বাবা উকিল উদ্দিন শেখ ছিলেন কাবাডি খেলোয়াড়। মা পরীজান নেসার ঘরে ছিল ১০ সন্তান। সবার মধ্যে খেলাধুলার প্রতিভা ছিল। ভাইবোন প্রায় সবাই স্কুলের খেলায় পুরস্কার নিয়ে ঘরে ফিরতেন। ছোট সন্তান মিলন হাসানের বয়স যখন ১৮ মাস, তখন মা পরীজান মারা যান। একটু বড় হওয়ার পর তার ফুটবল খেলায় হাতেখড়ি। চোখজোড়া স্বপ্ন বড় ফুটবলার হবেন, জাতীয় দলে খেলবেন। কিন্তু বড় ভাইয়ের চাপে পড়াশোনার জন্য মিলনকে ঢাকায় আনা হলেও ফুটবল প্রেমের টানে কৌশল করে কুষ্টিয়ায় ভর্তি হন। মিলনের ভাষায়, ‘ইন্টার শেষ করে চিন্তা করলাম ঢাকার কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলে আমি ফুটবল খেলতে পারব না। আমিও ফুটবল ছাড়া বাঁচব না। মুক্তির উপায় বের করলাম। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েছি জানিয়ে ঢাকা ছাড়ার সুযোগ নিলাম। ওখানে গিয়ে আমি ফুটবল খেলেছি একই সঙ্গে কেমিস্ট্রিতে অনার্স ও মাস্টার্স করলাম।’
পড়াশোনা শেষে ফের ঢাকায় ফেরা মিলনের। গার্মেন্টস ব্যবসা দিয়ে কর্মজীবন শুরু হলেও এখন তিনি আবাসন নির্মাণ ব্যবসায় যুক্ত। রাজধানীর রূপগঞ্জে স্বপ্নভূমি প্রকল্প গড়ে তুলেছেন মিলন হাসান। যে প্রকল্পে রয়েছে খেলার মাঠও।
ফুটবল একাডেমি গড়ার ভাবনা
কয়েক দশক আগেও কয়া গ্রাম খেলাধুলা, শিল্প-সংস্কৃতিচর্চায় অগ্রগণ্য ছিল। একটা সময় এই গ্রামের কিশোর-যুবকরা মোবাইল ফোন আর নেশায় আসক্ত হয়ে ওঠে, পাশাপাশি নানা অপরাধেও জড়ায়। মিলন হাসান প্রায়ই গ্রামের বাড়ি আসতেন। কিশোর-যুবকদের এ অবক্ষয় মানতে পারেননি তিনি। আর এই চিন্তা থেকে ফুটবল একাডেমি গড়ার কথা ভাবেন।
মূলত নিজের স্বপ্নের গাছটা অন্যদের মধ্যে বুনে দিতে একাডেমি গড়েছেন। পকেটের টাকা খরচ করে ফুটবলার তৈরির কারখানা বানিয়েছেন। নতুন প্রজন্ম যেন বিপথে না যায় খেয়াল রাখার জন্য আলাদা লোকবল নিয়োগ দিয়েছেন। অনুশীলনের পর খেলোয়াড়দের বাসায় গিয়ে দেখে আসবে তারা পরিবারের সঙ্গে আছে কি না, সন্ধ্যার পর বাসায় ফিরেছে কি না, খোঁজ নিচ্ছেন বাবা-মায়ের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করছে কি না, গলির মোড়ে আড্ডা দেওয়া যাবে না। খেলার পর বিশ্রাম, পড়ায় ব্যস্ত থাকতে হবে।
মিলন বলেন, ‘কিছু লোক থাকে যারা জমিজমা দখলের কাজে কিশোরদের ব্যবহার করে। ভুল পথে গিয়ে জীবন হারানোর ঘটনা এখনকার সমাজে অহরহ। আমরা এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে চাই না। সন্তান হারিয়ে বাবা-মা যেন আর না কাঁদেন। ওদের খেলার মাঠে রাখতে চেষ্টা করছি।’
যুগে যুগে কুষ্টিয়ার ক্রীড়াঙ্গন আলোকিত করে এসেছেন অসংখ্য কৃতী ক্রীড়াবিদ। প্রধান দুই খেলা ক্রিকেট ও ফুটবল ছাড়াও শুটিং, সাঁতার, অ্যাথলেটিকস, দাবাসহ বিভিন্ন ক্রীড়ায় আলো ছড়িয়েছে এ জেলার ক্রীড়াবিদরা। ক্রিকেটার হাবিবুল বাশার সুমন, ফুটবলার সৈয়দ রুম্মান বিন ওয়ালী সাব্বির, শুটার আলম চৌধুরী রিংকী, সাঁতারু রুবেল রানা, প্রয়াত অ্যাথলেট শাহ আলমসহ অনেকে জেলার নামডাক সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন। নিজ জেলার এমন গৌরবময় কীর্তি একাডেমি গড়ার ক্ষেত্রে অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে বলে জানান মিলন হাসান। তার একাডেমি থেকে সাব্বির, জমিরের মতো ফুটবলাররা বেরিয়ে আসবে বলে স্বপ্ন দেখেন তিনি। প্রত্যন্ত অঞ্চলে মিলন হাসানের এমন উদ্যোগ এখন অনেকেরই আশার আলো।