বাউফল (পটুয়াখালী) প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২১ অক্টোবর ২০২৪ ১৫:৫৪ পিএম
প্রজনন মৌসুমে অভয়াশ্রমে চলছে মা ইলিশ নিধন। রবিবার তেঁতুলিয়া নদীর ধানদী এলাকা থেকে তোলা। প্রবা ফটো
ইলিশের নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত তেঁতুলিয়া নদী। ২০০৫ সালে ভোলা ভেদুরিয়া থেকে পটুয়াখালীর চর রুস্তুম পর্যন্ত তেঁতুলিয়া নদীর ১০০ কিলোমিটার এলাকা ইলিশের অভয়াশ্রম কেন্দ্রে হিসেবে ঘোষণা করে সরকার। তবে প্রজনন মৌসুমে নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও এ অভয়াশ্রমে চলছে মা ইলিশ নিধনের মহোৎসব। অসাধু জেলের থাবায় অভয়াশ্রম কেন্দ্রেই অনিরাপদ হয়ে পড়েছে মা ইলিশ মাছ।
দেশে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য মা ইলিশ রক্ষায় ১৩ অক্টোব থেকে ৩ নভেম্বর পর্যন্ত ইলিশ ধরা, কেনা-বেচা, পরিবহন ও মজুদে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা চললেও তা মানছেন একদল অসাধু জেলে।
সরেজমিনে দেখা যায়, সকাল থেকে তেঁতুলিয়াতে শত শত ডিঙ্গি নৌকা ও ইঞ্জিন চালিত ট্রলার দাপিয়ে বেড়াচ্ছে পুরো নদী। নদী জুড়ে ইলিশ নিধনের উৎসব চললেও প্রশাসনের উপস্থিতি তেমন চোখে পড়েনি। তেঁতুলিয়া নদীর চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের বাতির খাল, চরমিয়াজান, চর রায়সাহেব, চর ব্যারেট, কালাইয়া ইউনিয়নের শৌলা তারের পোল, চরকালাইয়া, নুরজাহান পার্কের রাস্তার মাথা ও বগী তুলাতলা, নাজিরপুর ইউনিয়নের কচুয়া, ধানদী, নিমদী, তাঁতেরকাঠি, কেশবপুর ইউনিয়নের মমিনপুর, ধুলিয়া ইউনিয়নের মঠবাড়িয়া, ধুলিয়া লঞ্চঘাট, চর সাবুদেবপাশা ও কারখানা নদীর কাছিপাড়া ইউনিয়নের কারখানা পয়েন্টে অবাধে চলছে ইলিশ শিকার।
অভিযোগ রয়েছে, ইলিশ রক্ষা অভিযান দলের মধ্যে কিছু অসাধু ব্যক্তিকে ম্যানেজ করে অবাধে ইলিশ নিধন করছেন জেলেরা। ওই অসাধু ব্যক্তিরা বিশেষ সুবিধা নিয়ে প্রশাসনের অভিযানে নামার খবর জেলেদের কাছে পৌঁছে দেয়। এতে জেলেরা নিরাপদ স্থানে চলে যান। প্রশাসন চলে গেলে পুনরায় নদীতে মাছ শিকারে নামেন তারা। এ যেন জেলে ও প্রশাসনের চোর-পুলিশ খেলা। যে সব জেলে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ শিকারে নামেন তাদের অধিকাংশই মৌসুমী জেলে বলে দাবি করেছেন প্রকৃত জেলেরা।
উপজেলার নিবন্ধিত জেলেরা জানান, যারা প্রকৃত জেলেরা তারা নিষেধাজ্ঞা মেনে চলেন। অবরোধের ২২ দিন তারা মাছ ধরা থেকে বিরত থাকনে। কিন্তু যারা প্রকৃত জেলে না, তারা বেশি লাভের আশায় নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নদীতে মাছ শিকারে নামেন।
ইলিশ ধরার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র থেকে জানা যায়, কালাইয়া নৌ পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা ও উপজেলা মৎস্য বিভাগ একাধিক টিমে ভাগ হয়ে নদীতে অভিযান চালায়। এসব অভিযানে দ্রুত গতির ট্রলার ও স্পিড বোট ব্যবহার করা হয়। এসব ট্রলার ও স্পিড বোটে যারা মাঝি থাকেন তারা জেলেদের কাছে থেকে বিশেষ সুবিধা নিয়ে অভিযানের সংবাদ জেলেদের কাছে পৌঁছে দেন। এসব মাঝিরা অবৈধভাবে ধরা মাছ পরিবহন ও বিক্রির সঙ্গেও জড়িত। গত বৃহস্পতিবার রাতে মৎস্য কর্মকর্তার স্পিড বোট চালক নান্নু তার বোটে ৫ মণ ইলিশ পাচার করছিলেন। খবর পেয়ে মাছ ও স্পিড বোট জব্দ করে প্রশাসন।
প্রতিদিনের বাংলাদেশের অনুসন্ধানে জানা যায়, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় প্রভাবশালী নেতারা অসাধু জেলেদের নিয়ে নদীতে মাছ শিকারে নামেন। এসব প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ইলিশ রক্ষা অভিযানে থাকা টিমের কিছু অসাধু ব্যক্তিদের ম্যানেজ করে নদীতে মাছ শিকার করার সুযোগ তৈরি করেন। এ সুযোগে জেলেরা অবাধে মা ইলিশ শিকার করেন। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ধরা মাছ বিক্রি করতে নদীর আশেপাশে হাট বসে। অনেকটা প্রকাশ্য চলে বেচাকেনা। এ মাছ বিক্রির টাকা জেলে ও রাজনীতিক দলের নেতাদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা হয়। বিগত মৌসুমে আওয়ামী লীগের নেতারা অবৈধভাবে মাছ ধরা নিয়ন্ত্রণ করলেও এখন বিএনপি নেতারা নিয়ন্ত্রণ করেন বলে জানান জেলেরা।
উপজেলা মৎস্য বিভাগ জানান, মা ইলিশ রক্ষায় নদীতে নিয়মিত অভিযান চলছে। তবুও মাছ নিধন বন্ধ করা যাচ্ছে না। অভিযানের শুরু থেকেই সচেতন করার চেষ্টা করা হলেও সরকারের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে অনেকে মাছ ধরার চেষ্টা করছেন। আমরা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি। কিন্তু আমরা নদীতে নামলেই দূর থেকে তা লক্ষ্য করে তারা পালিয়ে যায়। মাছ ধরা বন্ধ করতে হলে পুরো নদী এলাকায় একযোগে অভিযান চালানো দরকার। তবে পর্যাপ্ত জনবল ও লজিস্টিক সহায়তা নেই। তারপরেও আমরা কঠোর অবস্থানে রয়েছি।
ইলিশ মা রক্ষা অভিযানের বিষয়ে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ ধরার দায়ে এ পর্যন্ত ১৯ জন জেলেকে আটক করা হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বিভিন্ন মেয়াদে আটক জেলেদের সাজা দেওয়া হয়েছে।’
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. বশির গাজী বলেন, ‘মা ইলিশ রক্ষা অভিযান সফল করতে উপজেলা প্রশাসন কঠোরভাবে কাজ করছে। যদি মৎস্য বিভাগ বা নৌ পুলিশের কোনো সদস্য বিশেষ কোনো সুবিধা নিয়ে জেলেদের কাছে অভিযানের তথ্য ফাঁস করে- এমন প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’