চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে
সুবল বড়ুয়া, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ২১ অক্টোবর ২০২৪ ১১:৫৮ এএম
আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০২৪ ১১:৫৮ এএম
চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। ছবি: সংগৃহীত
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) তিন দফায় মেয়াদ বাড়িয়েও শেষ করতে পারেনি নগরীর লালখানবাজার থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত ১৫ দশমিক ২ কিলোমিটার ‘এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের’ নির্মাণকাজ। অথচ গত বছরের ১৪ নভেম্বর দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগ মুহূর্তে ‘নির্বাচনী ট্রাম্প কার্ড’ হিসেবে এই এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের উদ্বোধন করে সদ্য ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার। র্যাম্পবিহীন অনেকটা ‘নামকাওয়াস্তে’ উদ্বোধন করা এই এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েটি এখনও যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়নি। নির্মাণকাজও ‘শেষ হয়েও হয় না শেষ’ অবস্থা। তবে সিডিএর কর্মকর্তারা বলছেন, পুরো নির্মাণকাজ শেষ করতে আরও আট মাস লাগবে।
২০১৭ সালের ১১ জুলাই বন্দরনগরী চট্টগ্রামের যানজট নিরসনে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ প্রকল্পটি অনুমোদন পেলেও ২০১৯ সালে নির্মাণকাজ শুরু হয়। চার দফায় মেয়াদ ও বরাদ্দ বাড়ানো এই প্রকল্পের বর্তমান ব্যয় ঠেকেছে ৪ হাজার ২৯৮ কোটি ৯৫ লাখ টাকায়। তৃতীয় দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে গত জুনের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও প্রকল্পটির নির্মাণকাজ শেষ করতে পারেনি বাস্তবায়নকারী সংস্থা সিডিএ। উদ্বোধনের সময় এই এক্সপ্রেসওয়েটি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) সাবেক মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর নামে নামকরণ করা হয়েছিল।
গতকাল সরেজমিন চট্টগ্রাম মহানগরীর লালখানবাজার গিয়ে দেখা যায়, নবনির্মিত এই এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ প্রায় শেষ। এই এক্সপ্রেসওয়েতে কিছুক্ষণ পরপর দুয়েকটি যানবাহন চলাচল করছে। এর মধ্যে বেশিরভাগই প্রাইভেট কার ও মাইক্রোবাস। কোনো পাবলিক বাস কিংবা সিএনজি অটোরিকশা, মোটরসাইকেল চলাচল করতে দেখা যায়নি। যেসব গাড়ি লালখানবাজার থেকে এক্সপ্রেসওয়েতে উঠছে, সেগুলো সরাসরি পতেঙ্গা প্রান্তে গিয়ে নামছে। এখনও কোনো র্যাম্প নির্মিত না হওয়ায় এক্সপ্রেসওয়ের মাঝপথে এসব গাড়ি ওঠানামার সুযোগ নেই।
লালখানবাজার এলাকায় এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মুখে সিডিএর নিয়োগকৃত একজন নিরাপত্তারক্ষী বলেন, ‘গত মাসের শেষ দিকে জোর করে কিছু প্রাইভেট গাড়ি চলাচল শুরু করে। এরপর থেকে আর রোধ করা যায়নি। সিডিএর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জানালে তারাও প্রাইভেট কার চলাচলে কোনো বাধা না দিতে বলেছে। কেউ জিজ্ঞেস করলে পরীক্ষামূলকভাবে এসব গাড়ি চলাচল করছে বলে বলতে বলেছে।
এদিকে, নগরীর ওয়াসা মোড় ও বাওয়া স্কুলের সামনে গিয়ে দেখা যায়, গত তিন মাস আগে শুরু হওয়া একটি র্যাম্পের নির্মাণকাজ বন্ধ রাখা হয়েছে। সেখানে র্যাম্প নির্মাণের জন্য চারদিকে টিনশেড দিয়ে যে কার্যক্রম চালানো হয়েছিল, তা এখন পুরোপুরি বন্ধ। টিনশেডগুলোও সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বাওয়া স্কুলের পার্শ্ববর্তী মোহাম্মদ সাইফুল নামে একজন দোকানদার বলেন, ‘অহেতুক আমাদের কষ্ট দিয়েছে। র্যাম্প নির্মাণের নামে রাস্তা খুঁড়ে এক পাশ শেষ করে দিয়েছে। এখন বলতেছে এখানে আর র্যাম্প নির্মাণ করবে না। তাই টিনশেড সরিয়ে নিয়েছে।’
তবে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক ও সিডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী মাহফুজুর রহমান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘নানা কারণে প্রকল্পটি যথাসময়ে শেষ করা সম্ভব হয়নি। তবে ইতোমধ্যে প্রকল্পের ৯০ শতাংশ নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। ১৪টি র্যাম্পের নির্মাণকাজ শেষে যান চলাচলের জন্য এক্সপ্রেসওয়েটি পুরোপুরি খুলে দেওয়া হবে। এখন পরীক্ষামূলকভাবে কিছু যান চলাচল করছে। পাশাপাশি এক্সপ্রেসওয়ের বিভিন্ন অংশে আটটি র্যাম্পের নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। সবকটি র্যাম্পসহ এক্সপ্রেসওয়ের নানা আনুষঙ্গিক কাজ শেষ করতে আগামী জুন পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়েছে। এই সময়ে মধ্যে প্রকল্পের নির্মাণকাজ শেষ হবে। পাশাপাশি নগরীর যানজট নিরসনে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে এই এক্সপ্রেসওয়েটি।
সিডিএর তথ্যানুযায়ী, প্রকল্পের অনুমোদনের সময় এক্সপ্রেসওয়ের অধীনে ৯টি জংশনে ২৪টি র্যাম্প নির্মাণের কথা ছিল। এর মধ্যে মহানগরীর টাইগারপাস জংশনে চারটি, আগ্রাবাদে চারটি, বারিক বিল্ডিং মোড়ে দুটি, নিমতলা মোড়ে দুটি, কাস্টমস মোড়ে দুটি, সিইপিজেডে চারটি, কেইপিজেডে দুটি, কাঠগড়ে দুটি ও পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় দুটি র্যাম্প নির্মাণের কথা ছিল।
প্রকল্প পরিচালক জানান, সংশোধিত ডিপিপিতে ২৪টির বদলে ১৪টি র্যাম্প নির্মাণ করা হবে। এর মধ্যে জিইসি মোড়ে একটি, টাইগারপাসে দুটি, আগ্রাবাদে চারটি, ফকিরহাটে একটি, নিমতলায় দুটি, সিইপিজেডে দুটি এবং কেইপিজেড এলাকায় দুটি র্যাম্প নির্মাণ করা হবে। বর্তমানে আটটি র্যাম্পের কাজ চলছে। বাকিগুলোর কাজও শিগগির শুরু হবে।
এদিকে, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) ব্যুরো অব রিসার্চ টেস্টিং অ্যান্ড কনসালটেশনের সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে, সিডিএর এই এক্সপ্রেসওয়েটি র্যাম্পসহ পুরোপুরি চালু হলে প্রতিদিন অন্তত ৬৬ হাজার গাড়ি চলাচল করবে। এতে যেমনি যানবাহন রক্ষণাবেক্ষণ খরচ কমবে; তেমনি মানুষের কর্মঘণ্টাও সাশ্রয় হবে। পাশাপাশি কমবে দুর্ঘটনা ও পরিবেশ দূষণ।