সাভার প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৯ অক্টোবর ২০২৪ ২০:৩০ পিএম
আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০২৪ ২১:০০ পিএম
বেসরকারি বিনোদন কেন্দ্র নন্দন পার্কের চেয়ারম্যান বেলাল হককে গ্রেপ্তারের পর তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ পাওয়া গেছে। বেলাল হকের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে মানি লন্ডারিংসহ বিনোদন কেন্দ্রের শেয়ার দখলের। এছাড়াও রয়েছে সাবেক ডিবি প্রধান হারুন-অর-রশিদের মৌখিক শেয়ার প্রদানের অভিযোগ। শুধু তাই নয়, প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও বোনাসের টাকা আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে প্রাথমিক তদন্তের অংশ হিসেবে আজ শনিবার (১৯ অক্টোবর) বিকালে যৌথবাহিনী অভিযান চালায় আশুলিয়ার বাড়ইপাড়ায় অবস্থিত নন্দন পার্কে। ঢাকা জেলা সহকারী পুলিশ সুপার শাহিনুর কবির নেতৃত্বে সেনাবাহিনী ও থানা পুলিশ অভিযানে অংশ নেয়। উদ্ধার করা হয় চেয়ারম্যানের একটি ব্যক্তিগত ব্যাগ। যেখানে পাওয়া যায় ২ লাখ ১৩ হাজার ৭০০ টাকা ও আই প্যাডসহ কাগজপত্র।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গতকাল শুক্রবার (১৮ অক্টোবর) মধ্যরাতে প্রতারণার দায়ে করা একটি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে আজ শনিবার (১৯ অক্টোবর) সকালে তাকে আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে পাঠানো হয়। গ্রেপ্তারের আগে একটি কালো ব্যাগ পার্কের ভেতরে রেখে আসেন বেলাল হক। সে ব্যাগের সন্ধানে অভিযান পরিচালনা করে যৌথবাহিনীর সদস্যরা। তবে গ্রেপ্তারের পর থেকে বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে মুখ খুলতে শুরু করে প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।
প্রাথমিক জানা গেছে, চেয়ারম্যান বেলাল হকের পরিচালক পদ দখলের জন্য কয়েকজন মিলে তাকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর চেষ্টা করছে। সেই সঙ্গে ব্যক্তিগত ব্যাগ আটকে রেখে দেড় কোটি টাকা আত্মসাৎ করতে কয়েকজন পরিচালক তাকে পার্কে আটকে রেখেছিল। বেলাল হোসেনের এমন অভিযোগের ভিত্তিতে ঘটনাস্থলে তদন্তে আসে যৌথবাহিনী। তবে সেই সব অভিযোগের সত্যতা খুঁজে পায়নি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। উল্টো পার্কের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা বেলাল হকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দুর্নীতি ও মানিলন্ডারিং খবর। পার্কে দেড় কোটি টাকা নয়, উদ্ধার করা হয় ব্যাগে থাকা ২ লাখ ১৩ হাজার ৭০০ টাকা ও আই প্যাডসহ কাগজপত্র।
এদিকে পার্কের কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছে গ্রেপ্তার হওয়ার আগেই বেলাল হক সরিয়ে ফেলেন তৎকালীন সময়ের আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী এমপি-মন্ত্রীসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে থাকা ব্যক্তিগত ছবি। যা বেলাল হক ক্ষমতা প্রদর্শনের একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতেন।
আজ শনিবার বেলাল হকের গ্রেপ্তারের খবরে আনন্দ মিছিল ও পদত্যাগের দাবিতে মানববন্ধন করেছে নন্দন পার্কের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
পার্কের রাইড অপারেটর আব্দুর রশিদ বলেন, ‘গত সাত বছর ধরে অনেক নির্যাতন করেছে চেয়ারম্যান স্যার। আমরা সাত বছরে কোনো বোনাস পায়নি। বেতন দেওয়া হয় মাসের অর্ধেক। কিছু বলতে গেলে সব সময় হুমকি দিত সে। তার বিচারের দাবি জানাচ্ছি।’
পরিচালক পরিষদের সিরাজুল হক কথা বলেন প্রতিদিনের বাংলাদেশের সঙ্গে। জানান গত সাত বছরের নানা অপকর্মের কথা। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে বেলাল চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্ত এর আগে নিয়ম অমান্য করে পূর্বের চেয়ারম্যানকে সড়িয়ে নিজে বসেন। ধীরে ধীরে নিজের সঙ্গে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের এমপি, মন্ত্রী, স্পিকারসহ ক্ষমতাধর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সক্ষ্যতা গড়ে তুলেন। সেই সঙ্গে প্রভাব খাটিয়ে বাকী পরিচালকদের নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। সে সময় বিনোদন কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতন ও বোনাস বন্ধ করে দিয়ে নিজের মত করে ছাঁটাই করে। এরপর থেকে বিনোদন কেন্দ্রের কোনো লাভের মুখ দেখেনি। লোন দেখিয়ে পরিচালকদের কাছ থেকে টাকা আদায়ের প্রক্রিয়া চালাচ্ছে। তাই বাধ্য হয়ে এক পরিচালক চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা করেন।
তিনি আরও বলেন, গত সাত বছর দেখিয়ে আমাদের কোনো পরিচালকের সঙ্গে কোনো বোর্ড মিটিং করতে পারেনি। চেয়ারম্যান তার নিজের মত করে বাকী পরিচালককে ভয়-ভীতি দেখিয়ে নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখে সভা পরিচালনা করত। কিন্ত অনলাইন মিটিং করত। নিজেরা সিদ্ধান্ত নিয়ে আমাদের জানিয়ে দিত। আবার শেয়ার বিক্রি বা পার্ক বিক্রির উদ্যোগ নিলেও সে বিভিন্ন বাহানা দিত। আর মিথ্যা তথ্য দিয়ে পরিচালকদের কাছে মেইল করত। যার সত্যতা আমরা পাইনি।
ডিবি প্রধান হারুন অর রশিদের শেয়ার নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘আমরাও আপনাদের মাধ্যমে শুনেছি। আমরা ১২ জন পরিচালক ও ৩০ জন শেয়ার হোল্ডার রয়েছি। কোথাও হারুন-অর-রশিদের নাম নেই। তবে শুনেছি তার নামে ২০ শতাংশ একটি মৌখিক শেয়ার প্রদান করত বেলাল হক। তার ভয় দেখিয়ে আমাদের কন্ট্রোল করত। ভয়ে আমরা আসতে পারতাম না।’
ঢাকা জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শাহিনুর কবির (সাভার সার্কেল) বলেন, ‘আজ বিকালে নন্দন পার্কের ভেতরে একটি কালো ব্যাগের সন্ধানে অভিযান পরিচালনা করে যৌথ বাহিনির সদস্যরা। এ সময় ব্যাগটি উদ্ধার করে ২ লাখ ১৩ হাজার ৭০০ টাকা উদ্ধার করা হয়। তার বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিংসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে সাবেক ডিবি প্রধান হারুনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের কোনো তথ্য প্রমান পাওয়া যায়নি। তবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’