লালন স্মরণোৎসব
জহুরুল ইসলাম, কুষ্টিয়া
প্রকাশ : ১৭ অক্টোবর ২০২৪ ২১:৩৫ পিএম
‘সৃষ্টিকর্তার সন্ধানে আমরা হিল্লি-দিল্লি ঘুরে বেড়াই। তাঁর সান্নিধ্য পেতে কত পথ, কত মত। কিন্তু মানুষের মাঝেই সৃষ্টিকর্তার বাস। মানুষকে ভালোবাসলেই তাঁকে পাওয়া যায়। লালন সাঁই তার গানে সে কথাই তুলে ধরেছেন’, কথাগুলো বলছিলেন লালন আখড়াবাড়িতে আসন পেতে বসা প্রবীণ বাউল বীর মুক্তিযোদ্ধা নহির উদ্দিন শাহ।
ফকির লালন সাঁইয়ের ১৩৪তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে বৃহস্পতিবার (১৭ অক্টোবর) থেকে শুরু হয়েছে তিন দিনের লালন স্মরণোৎসব। এদিন রাতে আখড়াবাড়ির মরা কালীগঙ্গা নদীর তীরে উন্মুক্ত মঞ্চে তিন দিনের উৎসবের উদ্বোধন করেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আক্তার। অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেনÑ মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের সচিব সাঈদ মাহমুদ বেলাল হায়দার, কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নকিব মোহাম্মদ নসরুল্লাহ, কুষ্টিয়ার ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক শারমিন আক্তার ও পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান।
লালন স্মরণোৎসবে বাউল সাধু গুরুদের পদচারণায় এখন মুখরিত এ তীর্থ। তিল ধারণের ঠাঁই নেই মরা কালীগঙ্গার তীরের লালন আখড়ায়।
১২৯৭ বঙ্গাব্দের পহেলা কার্তিক ফকির লালন সাঁই দেহত্যাগ করেন। এরপর থেকে তার অনুসারী ভক্ত বাউল সাধকরা এ দিনটিকে লালন স্মরণোৎসব হিসেবে পালন শুরু করেন। সেই ধারা আজও ধরে রেখেছেন তার অনুসারী বাউল-বৈষ্ণবরা।
তবে লৌকিক অনুষ্ঠানের বাইরে লালনভক্তরা এই অনুষ্ঠানে নিজস্ব কিছু রীতিনীতি পালন করেন। চিরাচরিত প্রথা অনুযায়ী বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় অধিবাসের মধ্য দিয়ে তাদের এই কর্মকাণ্ড শুরু হয়। আজ শুক্রবার সকালে বাল্যসেবা অর্থাৎ দই ও চিড়া নাশতা দেওয়া হবে বাউলদের। এরপর দুপুরে তাদের দেওয়া হবে পূর্ণসেবা। এই সেবার আওতায় বাউলরা খাবেন ভাত, ডাল, পঞ্চব্যঞ্জন ও মাছ। এ ছাড়া আজ লালন মতে নতুন করে দীক্ষিতদের খেলাফত (শিষ্যত্ব) প্রদান করবেন তাদের নিজ নিজ গুরুরা।
এবারের উৎসবে যোগ দিতে উৎসব শুরুর কয়েকদিন আগে থেকেই দেশের নানা প্রান্ত থেকে কয়েক হাজার বাউল জড়ো হয়েছেন ছেঁউড়িয়ার লালন ধামে। এই মানুষগুলো আধুনিক সামাজিক লোকাচারের বাইরে থেকে ঈশ্বরকে পাওয়া আর আত্মশুদ্ধির সাধনা করেন বাউলতীর্থ ছেঁউড়িয়ায় এসে। ভাবগান আর বাউল আচারের যজ্ঞ পালন ছাড়াও বাউল পথ ও মতের দীক্ষাও নিচ্ছেন অনেকে। স্মরণোৎসব মানেই বাউল ফকিরদের মহাসম্মেলন। এখানে আগত বাউলরা ভাবপরম্পরা বিনিময় করেন আপন মনে, নিজস্ব রীতিতে। গুরুবাদী এই ধর্মে বিশ্বাসীদের কাছে গুরুই সব। গুরুর নির্দেশিত পথে সাধন-ভজন এবং রস আস্বাদনের সব পথই উন্মুক্ত। আর এই যজ্ঞ সম্পাদনের মধ্য দিয়েই সীমার মাঝে অসীম খুঁজে ফেরেন এই মতে বিশ্বাসীরা।
লালনের মাজারের আশপাশে ও মরা কালীগঙ্গা নদীর তীর ধরে বাউলরা ছোট ছোট আস্তানা গেড়ে সাঁইজিকে স্মরণ করেন তার গাওয়া গান গেয়ে। ধামের পাশে বিশাল মাঠের খোলা প্রান্তরে গুরু-শিষ্যের মিলনমেলায় মনের মানুষের সন্ধানে আকুল ভক্তদের চলছে নাচে-গানে দিন-রাত ভাবের খেলা।
আখড়াবাড়িতে কথা হয় কুষ্টিয়ার মিরপুরের বাউল আজিজ শাহের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘সহজ মানুষ খোঁজা আর ভজার কাজে দীক্ষা নিয়েছি। এই পথেই সারা জীবন কাটাতে চাই।’
লালন অনুসারীরা বলেন, তার মূল চিন্তায় থাকে মানুষের কল্যাণ কামনা করা, মানুষের মঙ্গল চাওয়া। তাই তো লালন বলে গেছেন, ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’। উৎসবের মূল আকর্ষণ লালনের গান। এ গান শুনতেই আসেন অনেকে। খালি গলায়, একতারা হাতে গান করেন বেশিরভাগ বাউল।
অধিকাংশ প্রবীণ বাউল বসেছেন লালন ফকিরের আখড়ার পাশেই। বাউলদের একেকটি পরিবার আস্তানা গেড়েছেন। সেখানে মূল যিনি গুরু তাকে ঘিরে বসেছেন নবীনরা।
বাউল দলিল ফকির বলেন, ‘এদিন শোকের। আমরা শোক পালন করি। গুরুকে স্মরণ করি তার গানের মাধ্যমে। উৎসবে তাদের দাওয়াতের প্রয়োজন হয় না। মনের মধ্যে আগে থেকেই দিনটি গাঁথা থাকে। তার টানেই চলে আসি।’
বাউল সাধুদের পাশাপাশি আখড়াবাড়ির স্মরণোৎসবে যোগ দিয়েছেন হাজারো দর্শনার্থী। আখড়াবাড়িতে কথা হয় খুলনা শহরের সোনাডাঙ্গার একদল বাউলের সঙ্গে। তারা বলেন, এখানে এলে মানুষের আলাদা একটা রূপ চোখে পড়ে। মানুষকে ভালোবাসার মন্ত্র শেখা যায়। ঢাকা থেকে আসা দর্শনার্থী আসলাম ফারহান বলেন, ‘উৎসব দেখতে এসেছি। লোকজনের প্রচুর ভিড়। গান শুনতে ভালো লাগছে। তবে অনুষ্ঠানের সময় খাবার ও আবাসিক হোটেল মালিকরা কয়েকগুণ বেশি অর্থ নিচ্ছে। এতে অনেকের সমস্যা হচ্ছে।’
একই অভিযোগ আছে অন্যদের। অন্য সময় যেসব হোটেলে সাধারণ মানের কক্ষ এক হাজার টাকায় পাওয়া যায়, সেটি এখন দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা ও এসি কক্ষ একলাফে চার হাজার টাকায় উঠেছে।
লালন গবেষক ড. আজাদুর রহমান বলেন, লালন ফকির ছিলেন সাধক। তিনি এমন এক সমাজ গঠনের চিন্তা করতেন যেখানে কোনো হানাহানি ও হিংসা থাকবে না। মানুষের কল্যাণের বিষয়টি ছিল তার মূল চিন্তার জায়গা। তিনি গানে গানে সমাজের নানা অসঙ্গতির চিত্র যেমন ফুটিয়ে তুলেছিলেন, তেমনি প্রতিবাদ করেছিলেন নানা অন্যায়ের।