রাজু আহমেদ, রাজশাহী
প্রকাশ : ১৭ অক্টোবর ২০২৪ ১৯:০৪ পিএম
আপডেট : ১৭ অক্টোবর ২০২৪ ১৯:৩৪ পিএম
নগরীর মালোপাড়া এলাকার একটি মার্কেটের দোতলায় রাজশাহী মহানগর বিএনপির কার্যালয়। ২০২১ সালের আগস্টে এক বছরের চুক্তিতে ওই মার্কেটের দুটি ঘর দলীয় কার্যালয় হিসেবে মাসিক ১২ হাজার টাকায় ভাড়া নেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মিজানুর রহমান মিনু। চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২২ সালের আগস্ট। মার্কেট মালিকপক্ষের দাবি, চুক্তি শেষ হবার পর বর্তমান কমিটির কাছ থেকে তারা আর ভাড়া পাননি। বাকি পড়েছে প্রায় ৩ লাখ টাকা। এখন তারা মার্কেটি ভেঙে নতুন করে ভবন নির্মাণ করবেন। এ বিষয়ে আইনি নোটিস দিয়ে বিএনপিকে সরে যেতে বলা হলেও তারা দখল ছাড়ছেন না। ৫ আগস্টের পর দলের নেতাদের সুরেও পরিবর্তন এসেছে। এ বিষয়ে মালিকপক্ষ প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করলেও কোনো সমাধান মেলেনি।
দখলদারত্ব ও চাঁদাবাজিতে পিছিয়ে নেই বিএনপির তৃণমূলের কর্মীরাও। তানোর উপজেলার চান্দুড়িয়া ইউনিয়ন বিএনপির সদস্য মফিজ উদ্দিন ও তার ছেলে উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মাহফুজুর রহমান রিমনের বিরুদ্ধে এলাকার বিত্তশালীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে চাঁদাবাজি ও পুকুর দখলের অভিযোগ উঠেছে। এরই মধ্যে মফিজ উদ্দিনের একটি মোবাইল কল রেকর্ড রাজশাহী জুড়ে ভাইরাল হয়েছে। সেখানে তিনি এক নারীর কাছ থেকে বিএনপির নাম ভাঙিয়ে টাকা চাইছেন। এই চক্রটি এলাকার মানুষের ৫ আগস্টের ঘটনায় মামলায় জড়ানোর ভয়ভীতি দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করছে। এ বিষয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির মহাসচিব বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছেন চান্দুড়িয়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আজাদ রহমান। এদিকে শুক্রবার রাতে বাগমারা উপজেলার গনিপুর ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি মহব্বত হোসেনের নেতৃত্বে প্রায় ৫০ জন দেশীয় অস্ত্রসহ একটি বাড়ি ঘেরাও করে দুটি পুকুরের মাছ লুট করে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় শনিবার বাগমারা থানায় জড়িতদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী মৎস্যচাষি মো. রুবেল হক।
রাজনৈতিক পালাবদলের পর অন্য রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ও দখলদারত্বের কবল থেকে রেহাই পায়নি। রাজশাহী নগরীর গণকপাড়া মোড়ে অবস্থিত মহানগর জাতীয় পার্টির কার্যালয়। দলটির দেয়া তথ্যমতে, ৩০ বছর আগে জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে ৫.৪০ শতক জমিসহ পুরোনো ভবনটি জাতীয় পার্টি লিজ নেয়। প্রতি বছর খাজনাসহ সব মিলিয়ে ৮ হাজার টাকা সরকারি কোষাগারে পরিশোধ করে আসছে জাতীয় পার্টি। গত ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর হঠাৎই ওই জমির সামনের বিশাল জায়গা দখল করে তিনটি দোকান গড়ে তোলে নগরীর রাজারহাতা এলাকার সমর ও নুরুল ইসলাম নামে দুজন কাপড় ব্যবসায়ী। এই ঘটনার পর গত ১৫ আগস্ট জেলা প্রশাসক বরাবর এবং ১৭ আগস্ট বোয়ালিয়া থানায় লিখিত অভিযোগ করা হয় দলটির পক্ষ থেকে।
জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান ও দলটির রাজশাহী মহানগর কমিটির আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম স্বপন দাবি করেন, দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিকে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়ে তদের দলীয় কার্যালয়ের সামরে বহুমূল্যবান জায়গাটি বহিরাগতদের দিয়ে দখল নিয়েছেন রাজশাহী মহানগর বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক নজরুল হুদা।
নজরুল হুদার বিরুদ্ধে নগরীর বাণিজ্যিক এলাকায় ছয় কাঠা আয়তনের একটি বহুমূল্যবান জমি দখলের অভিযোগ এনে আদালতে মামলা করেছেন দলটির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মিজানুর রহমান মিনু। সরকারি সম্পত্তি জালিয়াতির অভিযোগ এনে তিনি এই মামলাটি করেন। আদালত ওই সম্পত্তিতে ‘স্থিতাবস্থা’ বজায় রাখার আদেশ দিয়েছেন। এই জমি নগরের বোয়ালিয়া মৌজায় অবস্থিত। এদিকে এই ঘটনায় আদালতে মামলার পাশাপাশি হুদার দখলদারত্বের চিত্র তুলে ধরে কেন্দ্রেও লিখিত অভিযোগ করেছেন মিনু। মিনুর দাবি, স্থানটিতে রাজশাহীর ঐতিহাসিক ব্রিটিশ কাউন্সিল ছিল, যা ১০০ বছরের পুরোনো। যে কারণে ওই স্থানটি হেরিটেজ হিসেবে সংস্কার করে তা জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া উচিত।
সূত্রমতে, সরকারের খাতায় ১০০ বছরের বেশি সময় ধরে মি হেমিলটন নামের এক ব্যক্তির নামে জমিটি রেকর্ড ছিল। বাংলাদেশে বর্তমানে তার কোনো ওয়ারিশ না থাকায় এটি সরকারি সম্পত্তি হয়ে যায়। তবে স্বল্প সময়ের মধ্যে সেই জমিটি চার্চ অব বাংলাদেশের নামে করে নেওয়া হয়েছে এবং নামমাত্র মূল্যে বিক্রয় দেখানো হয়েছে।
হুদার বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ, তিনি সম্প্রতি রাজশাহী সরকারি সিটি কলেজের অধ্যক্ষ আমেনা আবেদিনের কক্ষে তার অনুসারীদের নিয়ে প্রবেশ করে অধ্যক্ষকে হুমকি-ধমকি দিয়ে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করেন। বিষয়টি অধ্যক্ষ গণমাধ্যমে জানান এবং এ-সংক্রান্ত ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
এ ছাড়াও ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে বিএনপির মিনুপন্থি ও হুদাপন্থিদের বিরুদ্ধে রাজশাহী সড়ক পরিবহন গ্রুপের কার্যালয় দখলকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের অভিযোগ রয়েছে। ওই ঘটনায় উভয়পক্ষের একাধিক নেতাকর্মী গুরুতর আহত হন।
এদিকে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) রাজশাহী আঞ্চলিক অফিসের পরিচালককে হত্যার হুমকির অভিযোগে মহানগর যুবদলের সাবেক সভাপতি আবুল কালাম আজাদ সুইটকে দল থেকে অস্থায়ী বহিষ্কারের ঘটনায় মহানগর বিএনপি ও সুইটপন্থিদের মধ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। একপক্ষ অপর পক্ষকে আওয়ামী লীগের দোসর হিসেবে উল্লেখ করে তাদের অপকর্মের নানা চিত্র তুলে ধরেছে। সুইটের দাবি, তিনি নিজ দলে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার।
দখলদারত্বের চিত্র রাজশাহী জেলার সর্বত্র
এ ছাড়া পবা, মোহনপুর, গোদাগাড়ী, বাঘা, চারঘাট, পুঠিয়া ও দুর্গাপুর উপজেলার বিভিন্ন হাটবাজারসহ বালুঘাটে চাঁদাবাজি, গ্রামের পুকুর ও মাছসহ বিরোধপূর্ণ ও খাসজমি দখলের অভিযোগ সামনে আসছে। অভিযোগ আসছে, মামলায় নাম দেওয়ার ভয় দেখিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীর পরিবারের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এসবের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বিএনপি নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততা সামনে আসছে। থানায় অভিযোগ দিয়েও কোনো সমাধান পাননি ভুক্তভোগীরা। আর এসব ঘটনায় বিব্রত স্বয়ং বিএনপি। এমনকি এসব ঘটনায় বিএনপির মধ্যেই দুটি পক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষের আশঙ্কা করছেন অনেকে
বিএনপি নেতা রবিউল ইসলাম মিলু বলেন, একপক্ষ আওয়ামী লীগের অপরাধীদের পুলিশে ধরিয়ে দিচ্ছে, অপরপক্ষ থানায় তাদের ছাড়াতে তদবির করছে। মহানগর বিএনপির বর্তমান যে কমিটি তারা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীকে বাঁচাতে সাহায্য করছে। ৫ আগস্টের আগে বিএনপির পার্টি অফিসে হামলা চালিয়ে ভাঙা হয়েছে। নিজেদের পিঠ বাঁচাতে বর্তমান কমিটি নিজেরা মামলা না করে অন্যকে দিয়ে মামলা করিয়েছে। তারা আওয়ামী লীগের এজেন্ট। কেন্দ্র বুঝতে পেরেছে, এখন ভুলের মাশুল দিচ্ছে। বাস টার্মিনাল দখল করেছে সাবেক কাউন্সিলর মনির, আওয়ামী লীগের এজেন্ট হেলাল। আওয়ামী লীগকে ছাড়ানোর যে উদ্যোগ নেবে, তাদের বিরুদ্ধে আমরা অ্যাকশন নেব। এই কমিটি বাতিল না করলে রাজশাহী বিএনপি অচল করে দেব আমরা।
রাজশাহী জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবু সাইদ চাঁদ বলেন, তানোরের চান্দুড়িয়া ইউনিয়নের মফিজ অনেকদিন ধরেই চাঁদাবাজি করে বেড়াচ্ছে। তাকে দল থেকে শোকজ করে চিঠি দেওয়া হয়েছে। দলের মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দলের মধ্যে দুটা ভাগ বলতে কিছু নেই। তারেক রহমান দেশে ফিরে এলে সবাই একখানে হবে। তারেক রহমানের জন্য আমরা সবাই অপেক্ষা করছি। তিনি কাউকে ছাড় দেবেন না।
রাজশাহী মহানগর বিএনপির কার্যালয় দখল প্রসঙ্গে দলটির আহ্বায়ক অ্যাডভোটেক এরশাদ আলী ঈশা বলেন, আমরা মার্কেট মালিকের কথামতো বিএনপির পার্টি অফিসের ভবনটি ছেড়ে দিয়েছি। তারা এখন উল্টাপাল্টা কথা বলছে। তবে তিনি কার্যালয় ছেড়ে দেওয়ার দাবি করলেও গত ৬ অক্টোবর সন্ধ্যায় দলটির নেতাকর্মীদের নিয়ে সভা অনুষ্ঠিত হতে দেখা যায় ওই একই ভবনে। এদিকে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক নজরুল হুদা বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রসঙ্গে এরশাদ আলী ঈশা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
দলীয় নেতাকর্মীদের দখল ও চাঁদাবাজি বিষয়ে মহানগর বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক নজরুল হুদা বলেন, যারা দখল করছে তারা আওয়ামী লীগের লোক।
তবে নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রসঙ্গে হুদা বলেন, জাতীয় পার্টির লিজ বাতিল করা হয়েছে। যারা দোকান করেছে তারাও অবৈধভাবে সেটি চালাচ্ছে। জাতীয় পার্টি অবৈধ দল।
বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা মিজানুর রহমান মিনু প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মিনুরা ব্যক্তিগত রাজনীতি করে। তারা বিএনপি বলে পরিচিত না। বিএনপি হিসেবে পরিচিত মহানগর বিএনপির বর্তমান কমিটি। দলের মধ্যে দ্বন্দ্ব মেটানোর কোনো প্রয়োজন নেই বলে মনে করেন বিএনপির এই নেতা। তিনি বলেন, কেন্দ্র থেকে আমাদেরকে বলে দিয়েছে এরা (মিনু, বুলবুল ও মিলন, সুইট) প্রয়োজনীয় কেউ না।
হুদার অভিযোগ প্রসঙ্গে বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মিজানুর রহমান মিনু বিএনপির সঙ্গে তার ৪৫ বছরের সম্পর্ক তুলে ধরে বলেন, আমার স্ত্রী ও দুই সন্তান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে প্রত্যক্ষভাবে মাঠে ছিল। আমার নামে পুলিশ হত্যা ও রাষ্ট্রদ্রোহসহ ৬৭টি রাজনৈতিক মামলা হয়েছে। নিজেকে বিএনপি নেতা দাবি করে যিনি আমাদের বিরুদ্ধে কুৎসা রটাচ্ছেন, তার বিরুদ্ধে গত ১৫ বছরে কোনো মামলা হয়নি। দল ও দেশের ক্রান্তিকালে তিনি ভারতে পালিয়ে থেকেছেন। এদের বিষয়ে শিগগির কেন্দ্র ব্যবস্থা নেবে।