নদীভাঙন
অরুপ রতন, বগুড়া
প্রকাশ : ১৬ অক্টোবর ২০২৪ ২০:৩২ পিএম
আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২৪ ২০:৪৪ পিএম
‘এই চরে আমার অনেক ফসলি জমি ছিল। প্রায় ১০ বিঘা নদীগর্ভে চলে গেছে। ঘরটিও এখন যাওয়ার অপেক্ষায়।’ আফসার আলী বলছিলেন তার দুর্ভাগ্যের কথা। বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার পাঁচগাছি চরের বাসিন্দা তিনি।
পাঁচগাছি চরে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ৪২টি ঘর ইতোমধ্যে যমুনা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। আরও ২৭টি ঘর যেকোনো সময় নদীর পেটে চলে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এক মাস ধরে এই চরে ভাঙন তীব্র হয়েছে। এখানে আশ্রয় পাওয়া শতাধিক পরিবার এখন ঘরবাড়ি ভেঙে নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছোটাছুটি করছে। চরের বাসিন্দাদের অভিযোগ, এসব চরে বাড়ি করলে টিকবে না জেনেও গত আওয়ামী লীগ সরকারের ইউপি চেয়ারম্যান ও সংসদ সদস্যদের চাপে স্থানীয় প্রশাসন এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। ২০২১-২২ সাল থেকে এই চরের আশ্রয়ণ প্রকল্প-২-এর অধীনে ৬৯টি বাড়ি এবং এনজিওর অর্থায়নে আরও ১০টি বাড়ি নির্মাণ করা হয় বলে প্রকল্প সূত্র জানিয়েছে।
এই আশ্রয়ণ প্রকল্পের সুবিধাভোগী জাহানারা বেগম বলেন, ‘আগে কখনও ইটের বাড়িতে থাকিনি। দুই বছর আগে একটা পাকা ঘর পেয়েছিলাম, কিন্তু যেভাবে নদী ভাঙছে, এই ঘর আর কোনো কাজে লাগছে না। এখন আমি আর এই ধরনের ও আধাপাকা ঘর চাই না। সরকার যদি পারে তাহলে আমাকে অন্য কোথাও টিনের ঘর করে দিক।’
সাজেদা বেগম বলেন, ‘দুই বছর আগে আমরা ঘরগুলো পেয়ে অনেক খুশি হয়েছিলাম। কোনো টাকা ছাড়াই আমরা ঘরগুলো পাই। গ্রামের চারদিকে আমাদের ফসলি জমি ছিল। নদী এই চর থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে ছিল। কিন্তু গত ১০ বছরের ভাঙনে সব ফসলি জমি নদীর পেটে গেছে। এখন যাচ্ছে সরকারের দেওয়া ঘরগুলোও।’
এই চরে ঘর পাননি ৬৫ বছরের আনেছা বেগম। গত এক বছর হলো একটি খালি ঘরে উঠেছেন। যার নামে বাড়িটি দলিল করে দেওয়া হয়েছে তিনি এই বাড়িতে থাকেন না।
আনেছা বলেন, ‘আমি ঘর বরাদ্দ না পেয়েও এখানে আশ্রয় নিয়েছিলাম। এখন সেই আগের মতো এই চর থেকে যেতে হবে নতুন কোনো চরে।’
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার অফিস থেকে জানা যায়, ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রথম পর্যায়ে পাঁচগাছি চরে ৬৫টি ঘর নির্মাণ করা হয়। প্রতি সেমিপাকা ঘরের নির্মাণ ব্যয় তখন ছিল ১ লাখ ৭১ হাজার টাকা। এর পরবর্তীতে চতুর্থ পর্যায়ে আরও চারটি ঘর (প্রতিটির নির্মাণ ব্যয় ২ লাখ ৯০ হাজার) নির্মাণ করে সুবিধাভোগীদের বরাদ্দ দেওয়া হয়। মোট ৬৯টি পরিবারের জন্য এখানে ৬৯টি বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছিল, যার ব্যয় ছিল ১ কোটি ২২ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। এ ছাড়া একটি এনজিও আরও ১০টি ঘর নির্মাণ করে দেয়, যার আনুমানিক নির্মাণ ব্যয় ২০ লাখ টাকা। মোট ৮৯টি ঘরের নির্মাণ ব্যয় ছিল ১ কোটি ৪২ লাখ ৬৫ হাজার টাকা।
কেন চরের মতো ভাঙনপ্রবণ এলাকায় এমন আধাপাকা কাঠামো নির্মাণ করা হলোÑ জানতে চাইলে প্রকল্প কর্মকর্তা তারিফুল ইসলাম বলেন, ‘সেই সময় খাসজমির অভাব ছিল এবং আওয়ামী লীগ সরকারের স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের চাপে এখানে আশ্রয়ণ প্রকল্প-২-এর অধীনে বাড়িগুলো নির্মাণ করা হয়েছিল। মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে প্রায় দেড় কোটি টাকা আজ পানির নিচে চলে গেল।’
বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল হক বলেন, ‘যমুনায় উজান থেকে পানির সাথে প্রতিবছর ১ বিলিয়ন টন বালি আসে। সেই বালি দিয়ে নদীর মধ্যে প্রতিবছর নতুন চর তৈরি হয়। আবার পুরোনো চর ভেঙে যায়। এই কারণে জেলা প্রশাসনকে আমরা সব সময় পরামর্শ দেই যাতে চরে কোনো পাকা বা আধাপাকা অবকাঠামো নির্মাণ না করে। তবু এসব অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়। আমরা সাধারণত নদীর দুই তীরে কোথাও ভাঙন দেখা দিলে সাথে সাথে ব্যবস্থা নিই। ভাঙনের কারণে মানুষের জীবন বিপন্ন, সেই জন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে সরেজমিনে পরিদর্শন করে ব্যবস্থা নেব।’
সারিয়াকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহরিয়ার রহমান বলেন, ‘এই পরিবারগুলোর ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে আমরা কথা বলেছি। সেখানে যে কৃষিজমি আছে সেখানেই তারা ঘর তুলেছে। অন্য এলাকায় স্থানান্তর করতে চাই। কিন্তু তারাই যেতে চাচ্ছে না। এখন সরকারি বরাদ্দ সাপেক্ষে এই পরিবারগুলোকে তাদের ইচ্ছেমতো অন্য কোথাও পুনর্বাসনের ইচ্ছে আমাদের আছে।’
বগুড়ার জেলা প্রশাসক হোসনা আফরোজা বলেন, ‘আমি প্রকল্পের ফাইল দেখেছি। যখন এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয় তখন নদীর তীর ২-৩ কিলোমিটার দূরে ছিল। কিন্তু তীব্র নদীভাঙনের ফলে আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাড়িঘর নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। যাদের বাড়িঘর ছিল তাদের পুনর্বাসনের জন্য আমরা প্রকল্প পরিচালককে প্রস্তাব পাঠিয়েছি।’