জাহাজে অগ্নিকাণ্ড
হুমায়ুন মাসুদ, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ১৫ অক্টোবর ২০২৪ ১৩:০৮ পিএম
আপডেট : ১৫ অক্টোবর ২০২৪ ১৩:২৭ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
কার্গো হোক বা কন্টেইনারবাহী, ফায়ার কন্ট্রোল প্ল্যান অনুযায়ী একটি জাহাজে মাসে অন্তত একবার ফায়ার ড্রিল করা বাধ্যতামূলক। ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর দ্য সেফটি অব লাইফ অ্যাট সি (সোলাস) কনভেনশনে সব ধরনের জাহাজে অগ্নিকাণ্ড রোধে ফায়ার কন্ট্রোল প্ল্যান বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক করা হয়। সেই হিসেবে সমুদ্রে চলাচলকারী প্রত্যেকটি জাহাজকে ফায়ার ড্রিল করাসহ ফায়ার কন্ট্রোল প্ল্যান বাস্তবায়নে বাধ্যবাধকতা থাকলেও বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় চলাচল করা জাহাজে এর কিছুই মানা হয় না। প্রতি মাসে করা হয় না ফায়ার ড্রিল।
সামুদ্রিক জাহাজে কর্মরত একাধিক নাবিকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হাতে গোনা কয়েকটিতে ফায়ার ড্রিল করা হলেও অধিকাংশ জাহাজে প্রতি মাসে ফায়ার ড্রিল হয় না। ফায়ার কন্ট্রোল প্ল্যান অনুযায়ী, কর্মরত নাবিকদের মধ্যে অগ্নিনির্বাপণ বিষয়ে কোর্স সম্পন্ন রাখার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা প্রতিপালন করা হয় না। এ কারণে কোস্টাল জাহাজে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে সেটি বড় আকার ধারণ করার পাশাপাশি ঘটছে প্রাণহানির ঘটনা।
সম্প্রতি চট্টগ্রাম বন্দরের সমুদ্রসীমায় তিনটি জাহাজে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এসব জাহাজে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নাবিকদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় আগুন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। বাইর থেকে নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড এবং চট্টগ্রাম বন্দরের টাগবোট গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করতে হয়। অথচ একই সময়ে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে মার্চেন্ট জাহাজ ক্যাপ্টেন নিকোলাস জাহাজে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে জাহাজে কর্মরত নাবিকরা নিজস্ব চেষ্টায় আগুন নির্বাপণ করেন। সোলাস কনভেনশন অনুযায়ী মার্চেন্ট জাহাজে কন্ট্রোল প্ল্যান প্রতিপালন করার পাশাপাশি প্রতি মাসে ফায়ার ড্রিল করার কারণেই জাহাজটির আগুন নিজেরা নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছেন বলে জানিয়েছেন নাবিকরা।
এর আগে গত ৩০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের মালিকানাধীন বাংলার জ্যোতি জাহাজে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ওই বিস্ফোরণে জাহাজের একজন ক্যাডেটসহ তিনজন দগ্ধ হয়ে মারা যান। এর পাঁচ দিনের মাথায় গত ৪ অক্টোবর রাতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে বাংলার সৌরভে। এ ঘটনায় জাহাজের স্টুয়ার্ড সাদেক মিয়া নিহত হন। দুটি জাহাজের আগুন জাহাজে কর্মরত নাবিকদের পক্ষে নির্বাপণ করা সম্ভব হয়নি।
এ সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএমওএ) সভাপতি ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী বলেন, ‘অনেকগুলো জাহাজে হয়তো ফায়ার ড্রিল হয়। কিন্তু ফায়ার ড্রিল অগ্নিকাণ্ডের জন্য দায়ী না, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাগুলো ঘটছে প্রধানত দুটি কারণে। একটি হলোÑ আমাদের দেশে যেসব কোস্টাল জাহাজ চলাচল করে সেগুলো অনেক পুরোনো। অগ্নিকাণ্ডে বাতিল ঘোষণা করা বিএসসির দুটি জাহাজের কথা চিন্তা করেন। জাহাজগুলো ৩৭ বছর পুরোনো। এগুলো এক্সপায়ারড হয়ে গেছে ২০১৫ সালে। পুরোনো জাহাজে নানা কারণে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বাড়ে। অন্য কারণটি হলো অদক্ষ জনবল। কোস্টাল জাহাজগুলোয় যাদের নিয়োগ দেওয়া হয়, তাদের মধ্যে ক্যাপ্টেন আর চিফ ইঞ্জিনিয়ার ছাড়া অন্য কারও সার্টিফিকেশন থাকে না। জাহাজমালিকের বাড়ির চাকর-বাকর, পরিচিত, আত্মীয়স্বজনকে ধরে এনে জাহাজে চাকরি দেয়।’
নৌ-বাণিজ্য দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সমুদ্রগামীসহ বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের ১৫ হাজার ৯২৯টি ছোট-বড় জাহাজ আছে। এর মধ্যে কোস্টাল কার্গো জাহাজ আছে ১৬৬টি, কন্টেইনার জাহাজ আছে ২৪টি, অয়েল ট্যাংকার ২৪০টি। এসব কোস্টাল জাহাজের অধিকাংশই পুরোনো জাহাজ। জাহাজগুলোকে বছর বছর ডকিং করে চালানো হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। অন্যদিকে এসব জাহাজে যারা কর্মরত রয়েছেন তাদের অধিকাংশই অদক্ষ। কোনো ধরনের সার্টিফিকেশন ছাড়াই তারা যুগ যুগ ধরে জাহাজে কাজ করে যাচ্ছেন। অভ্যন্তরীণ নৌযানের ক্ষেত্রে সেটি আরও ভয়াবহ। অভ্যন্তরীণ নৌযানে যারা কাজ করেন, ওই নাবিকদের নিবন্ধনের জন্য যোগ্যতা সনদের অনুলিপি বাধ্যতামূলক করা হয়নি।
অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল আইন ২০১৯ অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ নৌযানে নাবিক নিবন্ধনের জন্য আবেদনপত্রের সঙ্গে নাবিকের জাতীয় পরিচয়পত্রের অনুলিপি, নিবন্ধন ফি পরিশোধের চালানের কপি, যোগ্যতা সনদের অনুলিপি (যদি থাকে) এবং নিজ নামে রেজিস্ট্রি করা মোবাইল নম্বর দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নৌ-বাণিজ্য অধিদপ্তরের প্রিন্সিপাল অফিসার ক্যাপ্টেন সাব্বির মাহমুদ বিস্তারিত কিছু বলতে রাজি হননি। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ মার্চেন্ট শিপিং অর্ডিন্যান্স ১৯৮৩ অনুযায়ী কোস্টাল জাহাজ চলাচল করে। কোস্টাল ও অভ্যন্তরীণ জাহাজের বিষয়গুলো কিছুটা জটিল। মোবাইলে এ বিষয়ে বিস্তারিত ধারণা দেওয়া সম্ভব নয়।’
প্রসঙ্গত, ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর দ্যা সেফটি অব লাইফ অ্যাট সি (সোলাস) কনভেনশন হলো একটি আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক চুক্তি যা বাণিজ্যিক জাহাজ নির্মাণ, সরঞ্জাম এবং পরিচালনার ক্ষেত্রে ন্যূনতম নিরাপত্তা মান নির্ধারণ করে।