প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৯ অক্টোবর ২০২৪ ১২:৪৯ পিএম
আপডেট : ০৯ অক্টোবর ২০২৪ ১২:৫৫ পিএম
টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে পানির নিচে নেত্রকোণার দুর্গাপুরের বাড়িঘর। মঙ্গলবার তোলা। প্রবা ফটো
দেশের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। উঁচু এলাকা থেকে পানি নামতে শুরু করেছে। তবে এখনও পানিবন্দি রয়েছে লাখ লাখ মানুষ। এর মধ্যে শুধু ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়া উপজেলায় প্রায় ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি। হালুয়াঘাটের পাঁচটি ইউনিয়নের ১০টি ও ধোবাউড়ার ২০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। তাদের মধ্যে সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কর্মীরা ত্রাণ বিতরণ করছেন। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য। কোথাও কোথাও বন্যার্তদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে।
এর মধ্যে শেরপুরে রয়েছে ১২৩টি আশ্রয়কেন্দ্র। বন্যাকবলিত সব এলাকার ফসল নষ্ট হয়ে গেছে এবং পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষিজীবীরা। বন্যার পানিতে ডুবে শেরপুরে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯ জনে। অনেক এলাকায় স্কুল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে নেত্রকোণায় বন্ধ হয়ে গেছে পাঁচ উপজেলার ১৮৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
ময়মনসিংহ
প্রতিদিনের বাংলাদেশের ময়মনসিংহ প্রতিবেদক জানান, হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়া উপজেলায় পানি কমতে শুরু করেছে। উঁচু এলাকা থেকে পানি নেমে গেছে। তবে এখনও নিচু এলাকায় পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে দুটি উপজেলার প্রায় ৫০ হাজার মানুষ। হালুয়াঘাটের পাঁচটি ইউনিয়নের ১০টি ও ধোবাউড়ার ২০টি গ্রামের মানুষ এখনও পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয়রা।
ধোবাাউড়ার মান্দাইল ও মুন্সিহাটায় এখনও ধোবাউড়া-হালুয়াঘাটের পাকা সড়কে হাঁটুপানি জমে আছে। সেখান দিয়েই যান চলাচল করছে। এই সড়কের কয়েকটি স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন বালুর বস্তা ফেলে সড়কটি চালু রেখেছে। এদিকে গতকাল মঙ্গলবারও সেনাবাহিনী ও অন্যান্য সামাজিক সংগঠন উদ্ধারকাজ অব্যাহত রেখেছে। পানিবন্দিদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ ও সরকারের বরাদ্দকৃত নগদ টাকা বিতরণ করেছে স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন।
ধোবাউড়া (ময়মনসিংহ) প্রতিবেদক জানান, বন্যাকবলিত ধোবাউড়ায় ত্রাণ বিতরণ করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। গত সোমবার উপজেলার দুর্গত এলাকা পোড়াকান্দুলিয়ায় সেনাবাহিনী ত্রাণ বিতরণ করে। তারই ধারাবাহিকতায় গতকালও দিনভর লেফটেন্যান্ট কর্নেল লেনিনের নেতৃত্বে ধোবাউড়া উপজেলার দর্শা ও বিলপাড় এলাকায় ত্রাণ বিতরণ করা হয়। ত্রাণসামগ্রী পেয়ে খুশি বন্যাদুর্গত এলাকার মানুষজন। এ সময় তাদের সঙ্গে ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নিশাত শারমিন, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা বেগম শাহিন, ধোবাউড়া প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম প্রমুখ।
শেরপুর
শেরপুর প্রতিবেদক জানান, জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি তিন দিনেও উন্নতি হয়নি। জেলায় মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯ জনে। গত শনিবার রাত থেকে উজানের পানি কিছুটা কমতে শুরু করলেও ভাটি এলাকায় নতুন করে অন্তত ১০টি গ্রাম করে প্লাবিত হয়েছে। এ পর্যন্ত ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার অন্তত ১৭টি ইউনিয়নের ১২০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নকলা, শ্রীবরদী ও সদর উপজেলার বেশ কিছু গ্রাম। সব মিলিয়ে এখন পানিবন্দি হয়ে আছে লক্ষাধিক মানুষ। তাদের জন্য জেলায় ১২৩টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে।
বন্যায় শেরপুরের পাঁচ উপজেলায় ৪৬ হাজার হেক্টর জমির রোপা আমন, ১২০০ হেক্টর জমির সবজি ও ৪ লাখ ৬৯ হাজার বস্তা আদা পানিতে ডুবে গেছে। ভেসে গেছে দুর্গত এলাকার সব পুকুরের মাছ। সেনাবাহিনী, বিজিবিসহ বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী দল ত্রাণকাজ অব্যাহত রেখেছে।
গাজীপুর
শ্রীপুর (গাজীপুর) প্রতিবেদক জানান, গাজীপুর জেলার কালিগঞ্জ উপজেলার চরসিন্দুর-কাপাসিয়া সড়কের ঘিঘাট এলাকায় আধা কিলোমিটার যাওয়া শীতলক্ষ্যা নদীর তীরবর্তী সনাতন ধর্মের রবীদাসপাড়ার অন্তত ৩০টি পরিবারের ঘরবাড়ি হুমকিতে পড়েছে। গতকাল সকাল ১০টায় সরেজমিনে এই ভাঙন দেখা গেছে।
নেত্রকোণা
দুর্গাপুর (নেত্রকোণা) প্রতিবেদক জানান, নেত্রকোণার দুর্গাপুর উপজেলায় ঢলের পানিতে ডুবে রুসমত খান (৬০) নামে এক ব্যক্তি মারা গেছেন। গত সোমবার দুপুরে উপজেলার গাঁওকান্দিয়া ইউনিয়নের শ্রীপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। গতকাল সকালে সড়কের পাশে লাশ দাফন করা হয়েছে।
নেত্রকোণার উঁচু এলাকা থেকে পানি কমলেও পাঁচটি উপজেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। এতে এসব উপজেলার শতাধিক গ্রাম জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। প্লাবিত হয়েছে মানুষের বসতঘর, রাস্তাঘাট ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তলিয়ে গেছে ২২ হাজার ৬৪১ হেক্টর জমির রোপা আমন ধান এবং ১৭৭ হেক্টর জমির শাকসবজি। ভেসে গেছে দুই শতাধিক খামার ও পুকুরের মাছ। বন্ধ রয়েছে পাঁচ উপজেলার ১৮৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
রাজবাড়ী
রাজবাড়ী প্রতিবেদক জানান, রাজবাড়ী সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের ১৫ কিলোমিটার সড়ক অতিবৃষ্টিতে ধসে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জিও ব্যাগ দিয়ে জরুরি মেরামতকাজ শুরু করেছে সওজ। সড়ক মেরামত করতে ১৫ কোটি টাকা প্রয়োজন বলে তারা জানিয়েছে।
জানা গেছে, কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে রাজবাড়ী-কুষ্টিয়া আঞ্চলিক মহাসড়ক, রাজবাড়ী-বালিয়াকান্দি সড়ক, বেড়িবাঁধ সড়কসহ ১৫ কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নদী, পুকুর ও সড়কের পাশ থেকে বালু কেটে সরিয়ে নেওয়ায় বেশি ক্ষতি হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার সকালে রাজবাড়ী-বালিয়াকান্দি সড়কের গণপত্যা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ধসে যাওয়া স্থানে জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে।
রাজবাড়ী সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাজস খান বলেন, ‘অতিবৃষ্টির কারণে সওজের আওতায় ১৫ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ সড়ক মেরামত করতে অন্তত ১৫ কোটি টাকা প্রয়োজন। বরাদ্দ না থাকায় স্থানীয়ভাবে ম্যানেজ করে আমরা ইতোমধ্যে জরুরিভাবে ধসে যাওয়া স্থানে জিও ব্যাগ ফেলেছি। পুকুর, নদী ও সড়কের পাশ থেকে গভীরভাবে বালু কেটে নেওয়ার ফলে ক্ষতি হয়েছে। বরাদ্দ পেলে ধসে যাওয়া সড়ক মেরামত করা হবে।’
ফরিদপুর
মধুখালী (ফরিদপুর) প্রতিবেদক জানান, টানা বৃষ্টিতে ফরিদপুরের মধুখালীতে কুমড়া, মরিচ, ফুলকপি, বাঁধাকপি, বেগুন, পেঁপে, কলা, ধানসহ শাক-সবজি চাষের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহে টানা চার দিনের বৃষ্টিতে এই ক্ষতি হয়।
মধুখালী উপজেলার নওপাড়া ইউনিয়নের কুড়ানিয়ারচর গ্রামের কৃষক মো. আকরাম হোসেন ধারদেনা করে এ বছর ৪০ শতাংশ জমিতে মরিচ ও কুমড়া চাষ করেছিলেন। প্রতিটি গাছে ফলন ছিল। বৃষ্টিতে গাছের গোড়া পচে গাছ মারা গেছে। মরিচের সাথী ফসল হিসেবে ২০ শতাংশ জমিতে মিষ্টিকুমড়া চাষ করেছিলেন তিনি। সেই গাছও বৃষ্টিতে মারা যাচ্ছে। গাছে শখানেক মিষ্টিকুমড়া ছিল যার প্রতিটির ওজন এক থেকে দেড় কেজি হয়েছিল। তিনি বলেন, সেগুলো ক্ষেতে তুলতে গিয়ে দেখি সব পচে গেছে। ৪০ শতাংশ জমিতে দুই ফসলে প্রায় ৫০ হাজার টাকা খরচ করে মাত্র ১২ হাজার টাকার মরিচ বিক্রি করেছি। তারপর টানা বৃষ্টিতে সব মরিচ গাছ মরে গেছে। এখন কী করব কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না। বিষয়টি আমার এলাকার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাকে জানিয়েছি। বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে সবজিক্ষেত পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। নওপাড়ার এই কৃষকই শুধু নন, সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে মধুখালী পৌর এলাকাসহ কয়েকটি ইউনিয়নের অনেক কৃষকের ক্ষেতের ফসল নষ্ট হতে চলেছে।