খোকন বিকাশ ত্রিপুরা জ্যাক, খাগড়াছড়ি
প্রকাশ : ০৯ অক্টোবর ২০২৪ ১২:০৫ পিএম
আপডেট : ০৯ অক্টোবর ২০২৪ ১২:২৩ পিএম
খাগড়াছড়ির খাগড়াপুর এলাকায় খাগড়াছড়ি-দীঘিনালা সড়কের মণ্ডপে ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সেজেছে দেবী দুর্গা। প্রবা ফটো
খাগড়াছড়ির ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের লোকজন দেবী দুর্গাকে সাজিয়েছে ভিন্ন এক সাজে। দেবীকে শাড়ির বদলে পরিয়েছে নিজেদের ঐতিহ্যবাহী রিনাই-রিসা ও গহনা। জেলা শহরসহ ৯ উপজেলায় এবার ৬১টি মণ্ডপে চলবে দেবী দুর্গার আরাধনা। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের ধর্মও এক ও অভিন্ন হওয়ায় উৎসবে রয়েছে বাড়তি বৈচিত্র্য। শেষ মুহূর্তে মণ্ডপগুলোয় চলছে প্রতিমা তৈরি ও রঙের কাজ। প্রতিমা শিল্পীদের হাতের নিপুণ ছোঁয়ায় ফুটে উঠেছে দেবী দুর্গার প্রতিমা ও পূজা মঞ্চ। পেছনে পাহাড়, সূর্য, আকাশ আর মেঘের আদলে তৈরি করা মঞ্চও আকর্ষণ ছড়াবে দর্শকদের মাঝে।
দেবী দুর্গার আরেক নাম ‘পার্বতী’। তাই নামের সঙ্গে মিল রেখেই প্রতিমা ও মণ্ডপ সাজানো হয়েছে। দেবীর ডানপাশে লক্ষ্মী ও কার্তিক, বামপাশে সরস্বতী ও গণেশ। তাদের পরনে ত্রিপুরাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও অলংকার। দূর থেকে দেখেই মনে হয় দেবী স্বয়ং এসে উপস্থিত হয়েছেন পাহাড়ের পাদদেশে পুরো পরিবার নিয়ে। প্রবেশ থেকে মণ্ডপ পর্যন্ত সবকিছুই ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতির আদলে এঁকেছেন প্রতিমা শিল্পীরা। শুধু প্রতিমা নয়, প্রতিমার সঙ্গে মিলিয়ে মঞ্চ সজ্জা করা হয়েছে পাহাড়ের আদলে। রয়েছে পাহাড়, ঝরনা, কাশবন, মারাই, চাথোয়া, গাছ ও লতাপাতা।
খাগড়াপুর এলাকায় খাগড়াছড়ি-দীঘিনালা সড়কের মণ্ডপটিতে গতকাল সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের প্রতিমা শিল্পীরা প্রতিমায় রঙ করছেন। রঙ করা প্ৰায় শেষ। মাঝরাত থেকে আরাধনা, ঢোল বাজবে। সবার মনে যেন উৎসব ও আনন্দের আমেজ লক্ষ করা যাচ্ছে। খাগড়াপুর এলাকায় সার্বজননীন দুর্গা পূজামণ্ডপে এই চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন নিজস্ব সম্প্রদায়ের মানুষের মাঝে। দুর্গোৎসব সামনে রেখে শিশু-কিশোর, কিশোরীরাও উল্লসিত।
পূজা যতই দুয়ারে আসছে, ততই ব্যস্ততা বাড়ছে
হিন্দু ধর্মাবলম্বী ও পাহাড়ের ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর মাঝে। খাগড়াছড়ির পূজামণ্ডপগুলোতে দেবী দুর্গাসহ প্রতিমা তৈরির কাজ ও রঙ করাও শেষ। মাটি দিয়ে দুর্গা দেবীর সৌন্দর্যময় অবয়ব ফুটিয়ে তুলতে শিল্পীদের রঙের আঁচড় দেওয়ার কাজ প্রায় শেষ। ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী পোশাক রিনাই রিসাইতে ভিন্ন রূপে দেবী দুর্গাকে সাজিয়ে তুলেছেন তারা। তাতে রঙ-তুলির ছোঁয়াও লেগেছে।
খাগড়াপুর পূজা উদযাপন কমিটির সদস্য বলেন, ত্রিপুরা নারীদের ঐতিহ্যবাহী নিজেদের সাজে এবার মা দুর্গাকে সাজিয়েছে। মা দুর্গা যেহেতু নারী, তাই এমন চিন্তা থেকেই রিনাই-রিসা-রাংবাতাং দিয়ে সাজানো হয়েছে। প্রতিমার সঙ্গে মিলিয়ে পাহাড়, ঝরনা, কাশবনের বাগান তৈরি হয়েছে।
প্রতিমা শিল্পী ও খাগড়াপুর অখণ্ডমণ্ডলীর পূজা উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক চামেলী ত্রিপুরা করেন সাজসজ্জার কাজ। তিনি বলেন, নিজের এলাকার দুর্গাপূজা, তাই চেয়েছি ভিন্ন কিছু করতেÑ নিজেদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিসহ সবটুকু দিয়ে। ত্রিপুরাদের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির মূলধারা বজায় রেখে মায়ের রূপ দিতে চেষ্টা করেছি। প্রতিমার সঙ্গে মিলিয়ে পাহাড়, ঝরনা, কাশবনের বাগান তৈরি করেছি। সব মিলিয়ে প্রকৃতির অবয়ব ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছি। আমাদের বিশ্বাস, দেবী দুর্গা ত্রিপুরাদের সাজে আমাদের কাছে আসেন। ত্রিপুরাদের ঐতিহ্যবাহী সাজের পূজা আমরা সাত-আট বছর ধরে উদযাপন করে আসছি।
খাগড়াছড়ি অখণ্ডমণ্ডলী দুর্গাপূজা কমিটির সভাপতি বলিন্দ্র ত্রিপুরা বলেন, প্রতিবছরই পূজা পালন করে থাকি। বিগত বছরের ন্যায় এবারও ত্রিপুরা নারীদের পোশাক রিনাই-রিসা-রাংবাতাং-বাংগিরি দিয়ে দুর্গা মাকে সাজিয়েছি।
খাগড়াছড়ি জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি অশোক কুমার মজুমদার বলেন, এ বছর খাগড়াছড়িতে ৬১টি মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হবে। উৎসবমুখর পরিবেশে সবার অংশগ্রহণের মাধ্যমে পূজা উদযাপন করবে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। পূজা কমিটির পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া রয়েছে।
খাগড়াছড়ি পুলিশ সুপার আরেফিন জুয়েল বলেন, পূজামণ্ডপগুলোয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছি। এর আগে আমরা পূজা উদযাপন কমিটির প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিরাপত্তা বিষয়ে মতবিনিময় করেছি। মণ্ডপে আনসার ও স্বেচ্ছাসেবকরাও নিরাপত্তার দায়িত্বে আছে। আমাদের পুলিশ সদস্যরা মণ্ডপে সার্বক্ষণিক দায়িত্বে থাকবে। নিরাপত্তার কোনো ঘাটতি থাকবে না।