তরিকুল ইসলাম মিঠু, যশোর
প্রকাশ : ০১ অক্টোবর ২০২৪ ১৩:২৫ পিএম
বীজ দিয়ে কাগজের কলম তৈরি করছেন যশোরের নাছিমা আক্তার। প্রবা ফটো
পরিবারের সচ্ছলতার আশায় ভিন্ন কিছু করার চিন্তায় শুরু করেন সুলভ মূল্যের কাগজের কলম তৈরি। পরিবেশের কথা চিন্তা করে সেই কলমের পেছনের অংশে দেন ফুল-ফল বা সবজির বীজ। কলমটি শেষ হওয়ার পর ফেলে দিলেই তা থেকে জন্ম নেয় গাছের চারা। পরিবেশবান্ধব বীজযুক্ত কলম উদ্ভাবন করে সাড়া ফেলেছেন যশোরের নাছিমা আক্তার। তার তৈরি কাগজের কলম বর্তমানে সরবরাহ হচ্ছে সারা দেশে।
নাছিমা আক্তার জানান, চতুর্থ শ্রেণির পর আর পড়ালেখা করা হয়নি। অল্প বয়সে বিয়েও হয়ে যায়। ২০০০ সালে স্বামী চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে সংসার চালাতে যখন হিমশিম অবস্থা, তখন সংসারের সচ্ছলতার আশায় বিভিন্ন কাজ শুরু করেন। প্রথমে থ্রি-পিস, শাড়ি ও কাঁথায় সুতা দিয়ে নকশা করা শুরু করেন। এসব কাজে তেমন সাফল্য পাননি নাছিমা। এরপর ২০১৬ সালে কাগজের কলম তৈরির পরিকল্পনা আসে মাথায়। কারণ শৈশবে ঝাড়ুর শলায় কাগজ পেঁচিয়ে উঠানের মাটিতে লেখালেখি আর আঁকাআঁকি করতেন তিনি। শৈশবের সেই খেলার স্মৃতিকে পুঁজি করেই শুরু করেন এ কাজ।
নাছিমা আরও জানান, প্রাথমিকভাবে কিছু কলম তৈরি করেন কিন্তু সেগুলো বাজারে চলেনি। এরপর বন্ধ করেন কলম তৈরি। কয়েক বছর পর ২০১৯ সালের জুনে সংসারে অর্থনৈতিক সংকট চরম আকার ধারণ করলে আবারও কলম তৈরির সিদ্ধান্ত নেন। এবার আর বাজারে বিক্রি না করে ১০০টি কলম নিয়ে যশোর সদরের বাহাদুরপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে যান। প্রধান শিক্ষককে কলমগুলো দেখিয়ে শিক্ষার্থীদের কাছে বিক্রির অনুমতি চান তিনি। প্রধান শিক্ষক কাগজের কলম দেখে শিক্ষার্থীদের কাছে বিক্রির অনুমতি দেন।
এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। প্রতিনিয়ত বেড়েছে নাছিমার কাগজের কলমের প্রসার।
কাগজের কলমে গাছের বীজ দেওয়ার চিন্তা কীভাবে এলো, এই প্রশ্নের জবাবে নাছিমা বলেন, কাগজের কলম তৈরির পর পেছনের অংশে খানিকটা ফাঁকা থাকে। প্রথমদিকে টুকরো কাগজ দিয়ে ফাঁকা অংশ পূরণ করে দিতাম। এরপর যখন পত্রপত্রিকাতে তার কাগজের পরিবেশবান্ধব কলম নিয়ে লেখালেখি শুরু হয়, তখন তার মাথায় আসে এটিকে কীভাবে আরও পরিবেশবান্ধব করা যায়। আমার মেয়ে রেবেকা কলমের ফাঁকা অংশে লালশাকের বীজ দেওয়ার পরামর্শ দেয়। পরীক্ষামূলকভাবে বীজের কলম তৈরি করে সফল হই। কলমের কালি শেষ করে মাটিতে পুঁতে দিলে সেখান থেকে এখন গাছ জন্মে। শুরু হয় নতুন বীজ কলমের যাত্রা।
‘বীজযুক্ত কলম’ দিয়ে নাছিমা শুধু নিজে স্বাবলম্বী হয়েছেন তা নয়। গ্রামের আরও অনেক নারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ করেছেন। কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে রঙবেরঙের কাগজ, আঠা আর কলমের শিষ দিয়ে বীজসহ আর বীজছাড়া দুই ধরনের কলম তৈরি করছেন তারা। বীজযুক্ত কলমের পেছন দিকে সাধারণত সংযুক্ত করা হয় ফুল, ফল ও সবজির বীজ। যেসব বীজ ক্ষুদ্রাকৃতির সেগুলোই বেছে নেন কলমে ভরার জন্য। বীজের তালিকায় রয়েছে পেয়ারা, টমেটো, মরিচ, বেগুন, লালশাক, ডাঁটাশাকসহ বিভিন্ন ফল ও ফুলের বীজ। দেশের বিভিন্ন বেসরকারি, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং সরকারি-বেসরকারি দপ্তর কিনে নিয়ে যায় বীজযুক্ত কলম। ক্রেতা চাইলে তার পছন্দের বীজ দিয়ে কলম তৈরি করে দেন নাছিমা আক্তার। কলম তৈরির পর রয়ে যাওয়া পরিত্যক্ত কাগজও ফেলেন না তিনি। সেসব টুকরো কাগজ দিয়ে ফুলদানি, অ্যাশ ট্রেসহ বিভিন্ন কুটির শিল্পসামগ্রী তৈরি করেন।
কাগজের কলমের দামও সবার হাতের নাগালে রাখার চেষ্টা করেন নাছিমা। খুচরা হিসেবে বীজযুক্ত কলম ১৫ ও এবং কাগজের কলম ১০ টাকায় বিক্রি করছেন। গড়ে দিনে এক হাজার পিস তৈরি করেন। এর মধ্যে বীজযুক্ত ৭০০ পিস এবং কাগজের ৩০০ পিস। মাসে বীজযুক্ত কলম বিক্রি হয় ৩ লাখ ১৫ হাজার টাকার। আর কাগজের বিক্রি হয় ৯০ হাজার টাকার। নাছিমার মেয়ে রেবেকা সুলতানা ঢাকার একটি কলেজ থেকে ইংরেজিতে অনার্স করে মাকে সহযোগিতা করছেন। ছেলে মীর নাঈম আলম শুভ তালবাড়িয়া কলেজে ডিগ্রিতে পড়াশোনার পাশাপাশি কলম তৈরি করছেন।