কিশোরগঞ্জ
সাইফুল হক মোল্লা দুলু, মধ্যাঞ্চল
প্রকাশ : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ০৯:১৯ এএম
আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১৬:১৬ পিএম
ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ে কাশফুল দেখতে আসা মানুষের ভিড়। সম্প্রতি হোসেনপুর উপজেলার ব্রহ্মপুত্র নদের সেতু এলাকা। প্রবা ফটো
কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলার পাশ দিয়ে বয়ে চলা ব্রহ্মপুত্র নদের তীরবর্তী বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে ছড়িয়ে আছে কাশবন। শরতের কাশবন এখন ফুলে ফুলে সাদা হয়ে আছে। কাশফুল ফুটবে আর প্রকৃতিপ্রেমীরা সেদিকে ছুটবে না, তা কি হয়। তাই উপজেলার ব্রহ্মপুত্র নদের সেতুসংলগ্ন এলাকার চরেও প্রতিদিন ভিড় করছে নানা বয়সের মানুষ। তারা আসছে, ছবি তুলছে, আবার তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও দিচ্ছে।
কবির ভাষায় ‘শরৎ মানেই নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা আর কাশফুলের শুভ্রতা’। কালের পরিক্রমায় প্রতিবছর শরৎ প্রকৃতিকে সাজিয়ে তোলে কাশফুলের অপার সৌন্দর্য দিয়ে। কাশফুল বা কাশবন পছন্দ করে না, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। ঋতুচক্রে বর্ষার কদমফুলের দিন শেষ হতে না হতেই শরতের কাশফুলের দেখা মেলে। কাশবাগানে বাতাস এলে কাশফুলের একসঙ্গে মাথা দোলানো দেখে মানুষ কতই না মুগ্ধ হয়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ব্রহ্মপুত্রের তীরবর্তী এ কাশফুলের মাঠে নানা বয়সি মানুষ মেতে উঠেছে আনন্দ উচ্ছ্বাসে। কাশবনে মৃদুমন্দ উদাস বাতাসে চলছে প্রকৃতিপ্রেমী নারী-পুরুষের লুকোচুরির খেলা। তারা যেন মুক্ত বিহঙ্গের মতো কাশবনে উড়ে বেড়াচ্ছে। কেউ আসছে প্রেমিক-প্রেমিকা নিয়ে, কেউ আসছে পরিবার বা বন্ধুবান্ধব নিয়ে। প্রতিদিন শত শত দর্শনার্থী কাশবনে ফুলের শুভ্রতার সৌন্দর্য উপভোগ করছে। পাশাপাশি ভ্রমণ ও প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের সাক্ষী হতে নিজেদের ক্যামেরাবন্দি করছে।
স্থানীয় এনামুল হাসান শাহিন মিয়া জানান, প্রতিবছর আগস্টের মাঝামাঝি থেকে কাশবনে ফুল ফুটতে শুরু করে। সেপ্টেম্বরে কাশফুলে ছেয়ে যায় পুরো এলাকা। সেপ্টেম্বরের শেষের দিক থেকে ফুলগুলো ঝরে যেতে শুরু করে। সাপ্তাহিক ছুটিরদিনসহ প্রায় প্রতিদিনই এখানে দর্শনার্থীর ভিড় লেগে থাকে। আশপাশে কাশবন থাকলেও এত বড় জায়গা নিয়ে কোথাও নেই। তা ছাড়া শহরের খুব কাছে এবং নিরাপদ হওয়ায় লোক সমাগম বেশি।
সদর উপজেলার নোয়পাড়া গ্রামের রিতু আক্তার বলেন, ‘কাশফুলের সমারোহে বিকালের বাতাস যেন শীতের আগমনের বার্তা দিচ্ছে। শৈশবের স্মৃতিগুলোকেও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। গোধূলির সময় মাঠজুড়ে সবুজের সমারোহ ও সাদা কাশফুল যখন বাতাসে দুলতে থাকে তখন মনটা আনন্দে ভরে ওঠে। এই অপরূপ সৌন্দর্যের কাছে থাকতে পেরে খুবই ভালো লাগছে।’
জেলা শহরের বত্রিশ এলাকার বাসিন্দা রাজীব সরকার বলেন, ‘নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলার ওড়াউড়ি আর মাঠে মাঠে হিরন্ময় কাশফুলের বাহারই হচ্ছে শরতের মন মাতানো অলংকার। আমাদের মা, দেবীর আগমনী বার্তা। আমরা সবান্ধবে তাই এমন প্রকৃতির ধারা অবগাহন করে মনের আকুতি পূরণে ছুটে এসেছি।’ আরেক দর্শনার্থী মামুন মিয়া বলেন, ‘ঋতু পরিক্রমায় বাংলার প্রকৃতিতে এখন শরৎকাল। এ সময় রাশি রাশি কাশফুল তার অপরূপ সৌন্দর্য ছড়াচ্ছে। আর এই সৌন্দর্য উপভোগ করতেই এখানে আসা।’
সরকারি মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী ইভা আক্তার পরিবারসহ উপভোগ করতে এসেছেন কাশফুলের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য। তিনি বলেন, ‘মা, বোন আর ভাবি মিলে এখানে কাশফুল দেখতে এসেছি। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়ার সুবাদে জানাশোনা ছিল। তবে মা আসতে চাচ্ছিলেন না। কিন্তু আসার পর সে-ই বেশি খুশি।’
করিমগঞ্জের ইসলামপুর থেকে আসা রাজন মিয়া বলেন, ‘সাদা কাশফুল ও সবুজের পাশ দিয়ে চলার অনুভূতি অন্য রকম। এখানে এসে কাশফুলের অপরূপ সৌন্দর্য দেখে মনটা ভরে গেছে। এমন নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে নিজেকে ক্যামেরাবন্দি করে নিচ্ছেন অনেকে।’
সোহাগ মিয়া নামে আরেকজন বলেন, ‘বন্ধুরা মিলে বাইক নিয়ে পাকুন্দিয়া থেকে এসেছি। কাশফুলের শুভ্রতার ছোঁয়া পেতে আর প্রশান্তির খোঁজেই ঘুরতে আসা। খুব ভালো লাগছে। আগে তো আশপাশেই দেখা মিলত, তবে এখন বিশেষ কিছু জায়গা ছাড়া দেখা পাওয়া যায় না।’
ভ্রমণ পিপাসু মানুষের কেউ কেউ নৌকায় করে ঘুরে বেড়াচ্ছে নদেও। এতে ব্রহ্মপুত্রপাড়ের মাঝিদের অর্থ উপার্জনের পথও খুলেছে। এখানে প্রায় ১০ থেকে ১৫টি নৌকা রয়েছে। কামাল মিয়া নামে একজন মাঝি বলেন, ‘দৈনিক ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা আয় করছি। জনপ্রতি ২০ টাকা ভাড়া হিসেবে এই আয় হচ্ছে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনিন্দ্য মণ্ডল বলেন, ‘নগরায়ণের ফলে দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে বাংলার চিরায়ত রূপ। হোসেনপুরেও দিন দিন বাড়ছে মানুষ, কমছে আবাদি-অনাবাদি জমি। তাই যেখানেই প্রাকৃতিক পরিবেশ পাচ্ছে, মানুষ সেখানেই ঝাঁপিয়ে পড়ছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এলাকাটিতে বাড়তি নজরদারি রয়েছে।’