শাহিনুর সুজন, চারঘাট (রাজশাহী)
প্রকাশ : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১৭:০৪ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
ফেনসিডিল চোরাচালানের অন্যতম রুট হিসাবে সারা দেশে পরিচিত রাজশাহীর সীমান্তবর্তী দুই উপজেলা চারঘাট ও বাঘা। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে পদ্মা নদী পার হয়ে হাজার হাজার বোতল ফেনসিডিলের চালান এ পথ দিয়ে সারা দেশে ঢোকে। কিন্তু বছর দুই-তিন আগেও বিজিবি ও পুলিশের হাতে বড় বড় ফেনসিডিলের চালান ধরা পড়লেও সরকার পতনের পর বর্তমানে যেন অনেকটা নীরবে চলছে মাদকের কারবার। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে খুচরা ফেনসিডিল ধরা পড়লেও বড় মাদক চালানের হদিস পাচ্ছেন না তারা। এ অবস্থায় ফেনসিডিল চোরাচালানের চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে।
সীমান্তবর্তী এলাকার জনসাধারণ ও বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, বড় বড় চালান ধরার কারণে মাদক কারবারিরা নতুন কৌশল অবলম্বন করেছে। বর্তমানে বোতলজাত ফেনসিডিল আসছে না। এর পরিবর্তে আসছে ফেনসিডিল তৈরির পাউডার কোডিন ও পাঁচ-দশ লিটারের জারে লিকুইড ফেনসিডিল ও বোতলের লেবেল। এরপর সীমান্তবর্তী চর এলাকা কিংবা ফাঁকা মাঠে এগুলো বোতলজাত করে খুচরাভাবে বিক্রি করা হয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঁচ-দশ লিটারের জারে ফেনসিডিল পাঠানোও হচ্ছে। এতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে খুব সহজেই তা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে।
চারঘাট ও বাঘা থানা সূত্রে জানা যায়, গত এক বছরে এই দুই থানায় ৮১৩টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৬৮২টি মাদক মামলা। প্রতি মাসে এই দুই থানা মিলিয়ে ৬৫-৭৫টি মামলা রেকর্ড হয়। এর মধ্যে ৫৫-৬৫টিই মাদক মামলা। কিন্তু গত এক বছরে দায়েরকৃত মাদক মামলার অধিকাংশই ১০-২০ বোতল ফেনসিডিলের মামলা।
সরেজমিন চারঘাট ও বাঘা সীমান্তের পদ্মা নদীর পাড়ে কথা হয় সেখানকার জেলেদের সাথে। কার্ডধারী জেলে সাহাবুদ্দিন আলী বলেন, দুই উপজেলা মিলিয়ে প্রায় তিন হাজার কার্ডধারী জেলে আছে। কিন্তু সবাই তো মাছ ধরতে নদীতে নামে না। অনেকেই নৌকা-জাল নিয়ে নদীতে নেমে ভারতীয় জেলেদের জন্য অপেক্ষা করে। ভারতীয় জেলেরা মাঝ নদীতে এসে নৌকা থেকে পাউডার কিংবা বোতলে করে তরল ফেনসিডিল, বোতলের লেবেল এসব জেলেদের নৌকায় তুলে দেয়। পরে নদীর তীরে এনে সুবিধাজনক জায়গায় পুরোনো বোতলে ফেনসিডিল ভরে যন্ত্র দিয়ে নতুন লেবেল লাগিয়ে প্যাকেটজাত করে বিক্রি করা হয়।
জেলেদের কথামতো খোঁজ নিয়ে স্থানীয় কয়েকজন মাদক কারবারির সাথে কথা হলে নাম প্রকাশ না করা শর্তে তারা জানান, তারা দুই লিটার লিকুইড ফেনসিডিল নিয়ে আসতে পারলে তার সাথে দেশীয় বিভিন্ন কোম্পানির কাশির সিরাপ ও ঘুমের ট্যাবলেট মিশ্রণ করে ৫০-৬০ বোতল ফেনসিডিল তৈরি করেন। আসল ফেনসিডিলের দাম প্রতি পিচ ২৫০০-৩০০০ টাকা। সেক্ষেত্রে ১৫০০-২০০০ টাকা দামে বিক্রি করেন তারা। দেশের বিভিন্ন শহরে জারে করে লিকুইড ফেনসিডিলের সাথে শুধু লেবেল পাঠানো হয়।
চারঘাট উপজেলা মাদক প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি সাইফুল ইসলাম বাদশা বলেন, আশপাশের বিভিন্ন জেলা উপজেলা থেকে গাড়ি নিয়ে এসে লোকজন ফেনসিডিল সেবন করে চলে যাচ্ছে। কিন্তু কোথাও বোতল পড়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে না। প্রথম আমরা মনে করেছিলাম হয়তো মাদক কমে গেছে। এখন খোঁজ নিয়ে জেনেছি, পুরোনো বোতলে নতুন মাদক ঢুকিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে। কৌশল পাল্টে আরও বেশি বেপরোয়া হয়েছে মাদক কারবারিরা।
বাঘা মীরগঞ্জ এলাকার ভাঙ্গারি ব্যবসায়ী শরীফ আলী বলেন, আগে সীমান্তের এসব এলাকা থেকে প্রতি মাসে অন্তত দশ বস্তা ফেনসিডিলের খালি বোতল কেজি দরে বিক্রির জন্য আসত। কিন্তু এখন হাফ বস্তাও হয় না। কিছু বোতল গ্রামে ফেরি করা ভাঙ্গারিদের কাছে পাওয়া গেলেও সেগুলো পিচ হিসেবে অতিরিক্ত দামে অনেকে কিনে নিয়ে যায়।
মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর রাজশাহী (সার্কেল-খ) পরিদর্শক সাইফুল আলম বলেন, আমরা প্রতি মাসেই চারঘাট ও বাঘা উপজেলায় ১০-১৫টি অভিযান পরিচলনা করি। কিন্তু এখন ফেনসিডিল ধরা অনেক কঠিন। কোডিন পাউডার দেশে এনে কাশির সিরাপের সাথে মিশ্রণ করা ফেনসিডিল তৈরি করা হচ্ছে। বিভিন্ন বোতল ও পলিথিনেও লিকুইড ফেনসিডিল ও লেবেল এনে পুরোনো বোতলে ঢুকিয়ে নতুন ফেনসিডিল তৈরি করা হচ্ছে। কিছুদিন আগে পলিথিনে করে পরিবহনের সময় লিকুইড ফেনসিডিল উদ্ধার করেছি। কৌশল পরিবর্তন করায় অভিযান পরিচালনা করতে বেগ পেতে হচ্ছে।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) চারঘাটের ইউসুফপুর কোম্পানি কমান্ডার সুবেদার হাবিবুর রহমান বলেন, ফেনসিডিলের বড় চালান না আসায় আমি বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান করে জেনেছি, পাঁচ-দশ লিটারের জারে করে লিকুইড ফেনসিডিল দেশে আসছে। তেলের এসব জার কেউ সন্দেহ না করায় মাদক কারবারি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে সহজেই রাজধানীসহ সারা দেশে ছড়িয়ে দিচ্ছে। এজন্য আমরাও সতকর্তার সাথে সীমান্তে দায়িত্ব পালন করছি।
চারঘাট-বাঘা সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার প্রণব কুমার বলেন, এই দুই থানার দায়েরকৃত মামলার সিংহভাগই মাদকের। ফেনসিডিল উদ্ধারের পর অনেক মাদক কারবারি বলছে, এগুলো আসল না। তারা দু চারটি ফেনসিডিল দিয়ে কাশির সিরাপ ও ঘুমের ট্যাবলেট মিশ্রণ করে পুরোনো বোতলে দশ-বিশ বোতল ফেনসিডিল তৈরি ও বিক্রি করছে। কৌশল পাল্টালেও তাদের দমনে আমাদের অভিযান চলমান আছে।