মহসিন রেজা রুমেল, দেওয়ানগঞ্জ (জামালপুর)
প্রকাশ : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১৯:১৩ পিএম
আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১৯:২৯ পিএম
পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ খননের জন্য বিআইডব্লিউটিএর খননযন্ত্র এনে রাখা হয়েছে। সম্প্রতি দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার পোল্যাকান্দি এলাকা। প্রবা ফটো
খননের গতিপথ নির্ধারণে
জটিলায় জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জে আটকে আছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের
(বিআইডব্লিউটিএ) বাস্তবায়নাধীন প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার ‘পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, ধরলা,
তুলাই এবং পুনর্ভবা নদীর নাব্য উন্নয়ন ও পুনরুদ্ধার’ শীর্ষক প্রকল্পের খননকাজ। প্রকল্পের
মেয়াদ শেষ হলেও এখনও বাস্তবায়ন হয়নি ৩০ শতাংশ কাজও। কয়েক মাস আগে থেকে বিআইডব্লিউটিএর
খননযন্ত্র উপজেলার পোল্যাকান্দি ও কাজলাপাড়া মণ্ডলবাজার এলাকায় রাখা হয়েছে। মণ্ডলবাজার,
ফারাজীপাড়া, নয়াগ্রাম, কাজলাপাড়া ও পোল্যাকান্দি নামাপাড়া এলাকার বাসিন্দাদের দাবি,
পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের ১৯৮২ সালের বিআরএস রেকর্ডিও ম্যাপ অনুযায়ী নদটি খনন করতে হবে।
কিন্তু বিআরএস ম্যাপ অনুযায়ী খননে জটিলতা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে
কথা বলে জানা গেছে, ব্রহ্মপুত্র নদটির বর্তমান গতিপথে খনন করলে স্থানীয়দের মালিকানার
জমি দীর্ঘ মেয়াদে নদের গর্ভে চলে যাবে। অন্যদিকে খননের ফলে নদটির গভীরতা বৃদ্ধি পাবে।
এতে বর্ষাকালে মণ্ডলবাজার, কাজলাপাড়া, নয়াগ্রাম, পোল্যাকান্দি নামাপাড়া, ফারাজীপাড়া
গ্রামগুলো ব্যাপক ভাঙনের কবলে পড়বে। সে কারণে তাদের দাবি, বিআরএস ম্যাপ অনুযায়ী নদটি
খনন করা হোক। কিন্তু ম্যাপ অনুযায়ী খননেও বাধা ও জটিলতা রয়েছে। উভয় সংকটে পড়ে
খননের গতিপথ নির্ধারণের জটিলতায় এলাকায় খননকাজ বন্ধ রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে বিআইডব্লিউটিএর
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, স্থানীয় প্রশাসন ও স্থানীয়দের মধ্যে মতবিনিময় হয়েছে।
সেখানেও বিআরএস নকশা আনুযায়ী খননের দাবি জানান স্থানীয়রা।
কাজলাপাড়া গ্রামের
মুনু মিয়া বলেন, ব্রহ্মপুত্র নদটি মণ্ডলবাজার, কাজলাপড়া, নয়াগ্রাম ও পোল্যাকান্দি নামাপাড়ার
কাছে বিশালাকার মোড় নিয়েছে। ফলে বর্ষা মৌসুমে ওই গ্রামগুলো প্রবল ভাঙনের কবলে
পড়ে। বিলীন হয় বসতভিটা আবাদি জমি। এ অঞ্চলের ওপর দিয়ে প্রবাহিত নদটির গতি পথে এলাকাবাসীর
শত শত বিঘা বিআরএস রেকর্ডের জমি রয়েছে। প্রতিবছর বর্ষা শেষে জমিগুলোতে চর জেগে ওঠে।
ওই চরে ফলে নানা রকম ফসল। খনন করলে এ অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষের সীমাহীন ক্ষতি হবে।
ফারাজীপাড়া গ্রামের
আনিছুর রহমান বলেন, ব্রহ্মপুত্র নদটি সরু। প্রতিবছর ভাঙনের একটা নির্দিষ্ট সীমারেখা
রয়েছে। গভীর করা হলে নদটি যমুনার মতো প্রমত্তা হবে। সে সময় ব্যাপক ভাঙনের কবলে পড়বে
মণ্ডলবাজার, কাজলাপাড়া, নয়াগ্রাম ও পোল্যাকান্দি নামাপাড়া।
এদিকে খননের
জন্য পোল্যাকান্দি ব্রিজসংলগ্ন এলাকা, কাজলাপাড়া ও পোল্যাকান্দি নামাপাড়া খননযন্ত্র
আনা হয়েছে কয়েক মাস আগে। খননযন্ত্রগুলো কোনো কাজে আসছে না। বিআরএস নকশা অনুযায়ী ব্রহ্মপুত্র
নদ যে চ্যানেলে দেখানো হয়েছে সেখানে বর্তমানে চর পড়ে বসতবাড়ি গড়ে তুলেছে কয়েকশ মানুষ।
সে কারণে বিআরএস ম্যাপ অনুযায়ী খননেও বাধার সৃষ্টি হচ্ছে।
ওই এলাকাবাসীর মধ্যে
সোলায়মান হোসেনের ভাষ্য, বিআরএস নদী দেখালেও আরওআর রেকর্ড অনুযায়ী জমিগুলো আমাদের।
তাই আমরা সেখানে বসতবাড়ি স্থাপন করেছি। খননের নামে আমাদের উচ্ছেদ করা হলে আমরা যাব
কোথায়।
খোঁজ নিয়ে জানা
গেছে, বিআইডব্লিউটিএ ২০১৯ সালে ‘পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তুলাই এবং পুনর্ভবা
নদীর নাব্য উন্নয়ন ও পুনরুদ্ধার’ শীর্ষক প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু করে। এ প্রকল্পে
ব্রহ্মপুত্রর উৎসমুখ থেকে কিশোরগঞ্জ টোপ পর্যন্ত ২২৭ কিলোমিটার নদ খনন ও রক্ষণাবেক্ষণ
করার কথা। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৭২৩ কোটি টাকা। ২০১৯ সালে শুরু হওয়া ৫ বছর মেয়াদে
এ প্রকল্পের কাজ চলার কথা। প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা ২০২৪ সালের জুন মাসে।
প্রকল্পটির প্রথম
দুই বছর নদ খনন ও পরবর্তী তিন বছর রক্ষণাবেক্ষণ করার কথা। খননের পর নদটি হবে ৩০০ ফুট
প্রশস্ত ও ১০ ফুট গভীর। নিয়মানুযায়ী ময়মনসিংহ অংশে নদ খননের কাজ হয়। সফলতা না এলেও
খননকাজে এ প্রকল্পের এ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৫০০ কোটি টাকার ওপরে এবং কাজ হয়েছে ৩০ শতাংশের
ওপরে।
পোল্যাকান্দি নামাপাড়ার
রফিকুল ইসলাম বলেন, নদটি বিআরএস ম্যাপ অনুযায়ী খনন করা হোক। এতে এক দিকে যেমন কারও
আপত্তি থাকবে না, তেমনি খননের দূরত্ব ও পরিমাণও কমে আসবে। খননকাজ করার আগে বৃহত্তর
এ এলাকাবাসীর সুবিধা অসুবিধার কথা মাথায় নিতে হবে। জোরপূর্বক কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া
যাবে।
বিআইডব্লিউটিএর
নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মহসিন বলেন, প্রকল্পটিতে নদের বর্তমান গতিপথ ধরে খনন করার কথা
রয়েছে। নদী যত গভীর হবে ওই নদী তত কম ভাঙবে। নদী খনন করলে এলাকাবাসী ভাঙন থেকে রক্ষা
পাবে। অন্যদিকে নাব্যতা থাকবে। ফলে মৎস্য সম্পদ বৃদ্ধি পাবে। নদীর পানি সেচ দিয়ে কৃষকরা
ফসল ফলাতে পারবেন। সে কারণে বিআইডব্লিউটিএ খননকাজ হাতে নিয়েছে। জনস্বার্থে বিষয়টি ভাবতে
হবে। অহেতুক বাধা-বিপত্তির সৃষ্টি করা যাবে না। মৃত ব্রহ্মপুত্র নদ খনন করলে নদীপাড়বাসীসহ
দেশের প্রকৃতিতে ভারসাম্যসহ আর্থসামাজিক উন্নয়ন হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ জাহিদ হাসান প্রিন্স বলেন, বিআইডব্লিউটিএ নদী নিয়ে জনকল্যাণে কাজ করে। বিআইডব্লিউটিএর কর্মকর্তাগণ নদী কীভাবে মানুষের উপকারে আসে এ বিষয়ে ভালো জানেন। দেওয়ানগঞ্জে ব্রহ্মপুত্র নদ খনন নিয়ে একটা জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। এ বিষয়ে এলাকাবাসীকে ভাবতে হবে। বিআইডব্লিউটিএ কখনোই জনগণের ক্ষতি চাইবে না।