বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে নিহত
রেজাউল করিম লিটন, চুয়াডাঙ্গা
প্রকাশ : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১১:৫১ এএম
আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১১:৫৪ এএম
মা জান্নাতুল ফেরদৌসের সঙ্গে তিন বছরের শিশুকন্যা আরাবি ফেরদৌস। সম্প্রতি তোলা। প্রবা ফটো
তিন বছরের শিশুকন্যা আরাবি ফেরদৌস এখনও জানে না তার বাবা আর ফিরবে কি-না। স্বামী হারিয়ে দিশেহারা স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস সাফা। বাবা রায়হান বিশ্বাস বাকশক্তি হারিয়েছেন। মা জাহানারা বেগমের চোখ থেকে সব সময় জলের ধারা গড়িয়ে পড়ছে। ছেলেকে হারিয়ে শোকে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন তিনি। ছোট ভাইকে হারিয়ে শোকে হতবিহ্বল বড় ভাই বাবুল আকতার। এক গুলিতেই শেষ হয়ে যায় মাসুদ রানার স্বপ্ন। ঢাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে অংশ নিয়ে পুলিশের গুলিতে নিহত হন চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গার মাসুদ রানা।
আলমডাঙ্গা উপজেলার কয়রাডাঙ্গা গ্ৰামের কৃষক রায়হান বিশ্বাসের তিন ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে মাসুদ রানা ছিলেন সবার ছোট। মাসুদ রানা গ্ৰামের প্রাইমারি স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে পার্শ্ববর্তী গোকুলখালী হাইস্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন। পরে কুষ্টিয়া পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ার্স কমপ্লিট করেন। এরপর তিনি ঢাকায় একটি লিফট কোম্পানিতে এক্সিকিউটিভ অফিসার পদে চাকরি শুরু করেন। সর্বশেষ বিদেশ থেকে লিফট আমাদানি করে দেশে বাজারজাত করে আসছিলেন তিনি। ঢাকার মিরপুর ১ নম্বরে স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস সাফা ও তিন বছর বয়সি কন্যা আরাবি ফেরদৌসকে নিয়ে একটি ভাড়াবাসায় বসবাস করতেন।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার দিন ৪ আগস্ট সকালে অফিসে যান। সেখান থেকে এক বন্ধুর জন্য অফিস দেখতে যান। বিকালে পৌনে ৫টার সময় অফিস থেকে বেরিয়ে বন্ধুটিকে সঙ্গে করে বোতলজাত পানি নিয়ে মিরপুর ১০ নম্বর এলাকায় যান। সেখানে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতাকে পানি সরবরাহ করার সময় পেছন থেকে পুলিশ গুলি করে। মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। সহকর্মী ও আন্দোলনকারীরা প্রথমে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিয়ে যান। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে সন্ধ্যায় তাকে আগারগাঁওয়ের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত সোয়া ১টার দিকে মারা যান। রাতেই স্বজনরা তার মরদেহ নিয়ে আসে। পরদিন বিকালে কয়রাডাঙ্গা গ্রামের স্থানীয় মাদ্রাসা ও এতিমখানা কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সরবরাহকৃত ডেথ সার্টিফিকেটে মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর কারণ উল্লেখ করা হয়।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে মাসুদ রানার মা জাহানারা বেগম বলেন, ‘আমার ছোট ছেলে কত আদরের। জীবনে কত কষ্ট করে তাকে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করেছি। ঢাকাতে গেল ব্যবসা করত, কীভাবে কী হয়ে গেল, এখন ছেলেকে কোথায় পাব। কে তাকে ফিরিয়ে দেবে, পরিবার নিয়ে পথে বসার মতো অবস্থায় পড়েছি।’
বড়ভাই ব্যবসায়ী বাবুল আকতার বলেন, ‘রানা আমাদের পরিবারের সকলের ছোট, সবার আদরের। লেখাপড়া শেষ করে একটি লিফট কোম্পানিতে চাকরি করত। পরে সে নিজেই একটা অফিস করে কোম্পানি খুলে ব্যবসা করে আসছিল। আল্লাহর রহমতে সে অনেক ভালো ছিল। আজকে সরকারের হঠকারী সিদ্ধান্তে সে মারা গেছে। পুলিশের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।’
স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস সাফা বলেন, ‘ওই দিন (৪ আগস্ট) সকালে তাকে বের হতে নিষেধ করেছিলাম। বললাম আজকে দেশের অবস্থা অনেক খারাপ, তুমি বাইরে যেয়ো না। কিন্তু সে আমাকে বলল অফিসে কাজ আছে, তাড়াতাড়ি ফিরে আসব। সারা দিন তাকে অনেকবার ফোন দিয়েছি, কিন্তু পাইনি। সন্ধ্যার পরে তার এক বন্ধু ফোন দিয়ে জানায় গুলি খেয়ে হাসপাতালে আছে। হাসপাতালে ছুটে গিয়েছি, কিন্তু কেউ তার কাছে যেতে দেয়নি। সে আইসিইউতে ছিল। রাত সোয়া ১টার দিকে মারা যায়। আমি এত ছোট মেয়েটাকে নিয়ে এখন কোথায় যাব, কী করব। আমার স্বামীর হত্যার বিচার চাই। যারা আমার এই অবুঝ বাচ্চাকে এতিম করল তাদের বিচার চাই।’
স্থানীয় ইউপি সদস্য আলমগীর হোসেন বলেন, ‘মাসুদ রানা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ছাত্র-জনতার সঙ্গে ছিল। সে পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছে। আমি দাবি জানাব এই পরিবারের প্রতি সরকার যেন একটু সুদৃষ্টি দেয়।’