× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পার্বত্য চট্টগ্রাম

অশান্ত পাহাড়ে খোঁজা হচ্ছে ‘ষড়যন্ত্রের গন্ধ’

চট্টগ্রাম অফিস, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি প্রতিবেদক

প্রকাশ : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ০০:৫৫ এএম

আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১১:১৫ এএম

রাাঙামাটিতে শনিবার প্রেস ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। প্রবা ফটো

রাাঙামাটিতে শনিবার প্রেস ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। প্রবা ফটো

পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রাণহানি ও সংঘাতের পেছনে খোঁজা হচ্ছে ‘ষড়যন্ত্রের গন্ধ’। ঘটনাস্থল খাগড়াছড়ির দীঘিনালা হলেও পরবর্তীতে পুরো পার্বত্য এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে এই সংঘাতের রেশ। চারটি প্রাণহানির ঘটনা ছাড়াও দোকানপাটে হামলা, সম্পদ পোড়ানোর ঘটনাও ঘটেছে। তাণ্ডবের জেরে প্রশাসনের ১৪৪ ধারা জারির সঙ্গে একাধিক সংগঠনের অবরোধ কর্মসূচিও চলে। ফলে পাহাড়ের জনজীবন প্রায় অচল হয়ে পড়ে। তিন পার্বত্য জেলার মধ্যে বান্দরবানের পরিস্থিতি শনিবার স্বাভাবিক থাকলেও রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির পরিস্থিতি থমথমে ছিল। ৭২ ঘণ্টার সড়ক ও নৌপথ অবরোধে দিনভর দূরপাল্লার যানবাহন চলেনি। খোলেনি দোকানপাট। এই পরিস্থিতিতে সকালে ঢাকা থেকে হেলিকপ্টারযোগে রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি সফর করেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তিন উপদেষ্টাসহ সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা। দুই জেলায় তারা সিরিজ বৈঠক করে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন। রাতে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত অবরোধ প্রত্যাহারের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। 

পাহাড়ে এমন একসময়ে আকস্মিক তাণ্ডব ঘটে গেল, যখন দেশে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে মাত্র দেড় মাস বয়সি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। আইনশৃঙ্খলা ও অর্থনীতি সামাল দিয়ে তারা যখন হাঁটি হাঁটি পা পা করছে, তখনই দেশের স্পর্শকাতর অঞ্চল অশান্ত। 

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা এ এফ হাসান আরিফ শনিবার বিকালে রাঙামাটিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপের সময় বলেন, ‘আমরা সকলে সম্প্রীতি চাই। কিন্তু কেন জানি নাÑ কোথাও একটা ছন্দপতন হচ্ছে। বাইরে থেকে যেন একটা ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে আমাদের এই সম্প্রীতিকে নষ্ট করার জন্য।’ 

সরকারের উপদেষ্টা যখন ‘বাইরের ষড়যন্ত্রের’ গন্ধ পাচ্ছেন তখন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও পাহাড়ে ‘বাইরের ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত দিলেন। শনিবার দুপুরে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, পার্বত্য চট্টগ্রামের ঘটনাকে তিনি বিচ্ছিন্ন ঘটনা মনে করেন না। এর সঙ্গে অনেক কিছু জড়িত। একদিকে শূন্যতার সুযোগ নেওয়া, অন্যদিকে জিও পলিটিক্সে যে পরিবর্তনÑ সেগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’ 

দীঘিনালায় চুরির অপবাধ দিয়ে শুরু হওয়া তাণ্ডবের সূত্রপাতে ‘মসজিদে’ হামলার গুজবও ছড়ানো হয়েছে রাঙামাটিতে। অর্থাৎ পরিকল্পিতভাবেই যে ঘটনাকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার প্রচেষ্টা ছিল, তা স্পষ্ট হয়েছে এই গুজবের ঘটনায়। এসব গুজব কি আকস্মিক? নাকি কারও কূটকৌশলÑ সেটা অবশ্য এখনও স্পষ্ট হয়নি। তবে পার্বত্য এলাকার অনেক বাসিন্দা মনে করছেন, দীঘিনালার চুরির ঘটনায় হত্যা, পাল্টাপাল্টি প্রতিবাদ মিছিল, মিছিলে হামলা, অগ্নিকাণ্ড, স্বল্প সময়ের মধ্যে চট্টগ্রাম-ঢাকায় প্রতিবাদ সমাবেশ এবং নানা দাবি উত্থাপনের নেপথ্যেই লুকিয়েছে আছে ষড়যন্ত্রের বীজ। তাদের অনেকে এর পেছনে বিদায়ি সরকারের কেউ কেউ জড়িত থাকতে পারেন বলেও সন্দেহ করছেন। তারা মনে করেন, এখানকার ভূরাজনীতি বিবেচনায় মিয়ানমার এবং মনিপুরের ঘটনাগুলোও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। 

পার্বত্য চট্টগ্রামে উপদেষ্টাদের ব্যস্ততম দিন

শুক্রবার রাঙামাটি শহরে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনার পর শনিবার দুপুর ১২টার দিকে রাঙামাটি সেনানিবাসের প্রান্তিক হলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে বিশেষ আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত সভায় যোগ দেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তিন উপদেষ্টা। বৈঠকে সরকারি, সামরিক প্রশাসনের কর্মকর্তা ছাড়াও পাহাড়ের রাজনৈতিক নেতাসহ বিশিষ্টজনরা অংশ নেন।

আইনশৃঙ্খলা সভা শেষে দুপুরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, ‘পাহাড়ের ঘটনায় আমাদের সহকর্মীদের সঙ্গে আলাপ করার পর একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠন করব। পাহাড়ে আইনশৃঙ্খলার কোনো অবস্থাতেই অবনতি হতে দেওয়া যাবে না। আমি আপনাদের সবার সহযোগিতা চাচ্ছি। যারা আইনশৃঙ্খলা অবনতি করবে তাদের কোনো অবস্থায় আমরা ছাড় দেব না। যারা চেষ্টা করবে তাদের হাত ভেঙে দেওয়া হবে।’

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘আপনাদের কাছে বারবার অনুরোধ করব, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যেন উন্নতি হয়। আপনারা আমাদের সহযোগিতা করবেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা করবেন। প্রশাসনকে সহযোগিতা করবেন। জনগণকে বোঝাবেন যেন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অটুট থাকে, ভালো থাকে।’ 

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা এ এফ হাসান আরিফ বলেন, ‘পাহাড়ে আসার সময় দেয়ালে দেয়ালে যে গ্রাফিতি দেখেছি, গ্রাফিতির যে বার্তা তা আমরা পার্বত্য চট্টগ্রামে দেখতে চাই। এখানে সম্প্রীতি থাকবে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সবাই একসঙ্গে থাকব, একসঙ্গেই কাজ করব। আজকের বৈঠকে যে বক্তব্যগুলো এসেছে, সবার একই কথা আমরা সম্প্রীতি চাই। তবে কেন জানি কোথাও একটা ছন্দপতন হচ্ছে। ছন্দপতনের ব্যাপারে প্রত্যেকের মুখে একটা শব্দ উচ্চারিত হয়েছেÑ ষড়যন্ত্র। আমাদের এই সম্প্রীতি নষ্ট করার জন্য বাইরে থেকে একটা ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। সেই জন্য দাবি আসছে একটা কমিশন বা তদন্ত কমিটির মাধ্যমে সুষ্ঠু ব্যবস্থা করা। দোষীদের যেন আইনের আওতায় নিয়ে আসা হয়।’

বৈঠকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমা, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. ময়নুল ইসলাম, সেনাবাহিনীর রাঙামাটি রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শওকত ওসমান, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন খান, পুলিশ সুপার ড. এস এম ফরহাদ হোসেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় সহসভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য ঊষাতন তালুকদার, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য নিরূপা দেওয়ান, বাঙালিভিত্তিক সংগঠনের একাধিক নেতৃত্ব ও স্থানীয় ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। 

রাঙামাটির সভা শেষে উপদেষ্টারা খাগড়াছড়ি যান। সেখানে বিকালে খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসনের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত আইনশৃঙ্খলা সভায় যোগ দেন তারা। সভায় সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা, স্থানীয় রাজনৈতিক দলের নেতারা, প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। 

সভা শেষে পাহাড়ে আইনশৃঙ্খলার উন্নতি হতে সকলের সহযোগিতা কামনা করে উপদেষ্টা হাসান আরিফ সাংবাদিকদের বলেন, ‘এই ঘটনায় উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন শক্তিশালী তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। পাহাড়ে সম্প্রীতি বিনষ্ট করার ষড়যন্ত্র করলে তাদের কঠোর হস্তে দমন করা হবে। যারা আইনশৃঙ্খলার অবনতি করবে, তাদের কোনো অবস্থায় ছাড় দেওয়া হবে না।’ 

খাগড়াছড়ির সভায় তিন উপদেষ্টা ছাড়াও চট্টগ্রাম ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল মো. মাইনুর রহমান, খাগড়াছড়ি রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শরীফ মো. আমান হাসান, জেলা প্রশাসক মো. সহিদুজ্জামান, পুলিশ সুপার মো. আরেফিন জুয়েল, সাবেক এমপি ও জেলা বিএনপির সভাপতি ওয়াদুদ ভূঁইয়া, মং সার্কেল চিফ সাচিংপ্রু চৌধুরী প্রমুখ অংশ নেন।

দিনভর অবরোধ

রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে শনিবার সকাল ৬টা থেকে সড়ক ও নৌপথ অবরোধ চলছে। ৭২ ঘণ্টার এই অবরোধের শুরুতেই তিন জেলায় দূরপাল্লার কোনো যানবাহন চলাচল করেনি। জেলায় বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও উদ্বেগ উৎকণ্ঠা, আতঙ্ক বিরাজ করছে স্থানীয়দের মাঝে। তবে বান্দরবানে স্বাভাবিক পরিস্থিতি বিদ্যমান রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

উপদেষ্টাদের বৈঠকের পর নানা ধরনের বার্তা দেওয়া হলেও রাতে এই রিপোর্ট লেখার সময় প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ইউপিডিএফ এবং পরিবহন মালিক সংগঠনের ডাকা অবরোধ প্রত্যাহার করা হয়নি। রাত ৮টায় ইউপিডিএফের মুখপাত্র অংগ্য মারমা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বৈঠকে আমাদের ডাকা হয়নি। তাই আমাদের কোনো প্রতিনিধি বৈঠকে ছিলেন না। আমাদের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে ডাকা অবরোধ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে চলবে।’ তিনি বলেন, ‘দীঘিনালার ঘটনায় জাতিসংঘের প্রতিনিধি নিয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্ত চাই। তদন্তে যাদের দোষ প্রমাণ হবে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।’ 

অন্যদিকে পরিবহন মালিকদের সংগঠনের পক্ষ থেকেও রাতে এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত পরিবহন ধর্মঘট প্রত্যাহারের কোনো সিদ্ধান্ত জানা যায়নি। তবে রাঙামাটি সিএনজি অটোরিকশা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান বাবু বলেছেন, ‘অবরোধ প্রত্যাহার বিষয়ে এখন (রাত ৮টা) বৈঠক চলছে। বৈঠক শেষে এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানা যাবে।’ 

প্রসঙ্গত, খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় সাম্প্রদায়িক হতাহতের ঘটনায় গত শুক্রবার সকালে রাঙামাটিতেও সংঘাতের ঘটনা ঘটে। এতে একজন নিহত এবং উভয়পক্ষের অন্তত ৫০ জন আহত হয়। এই ঘটনায় রাঙামাটিতে বেশকিছু গাড়িতে আগুন ও ভাঙচুর, মসজিদ ও বৌদ্ধবিহারে হামলা এবং দোকানপাটেও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে মৃত্যুসহ অপরাধের ঘটনায় মামলা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা