× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

কারারক্ষীর গুলিতে নিহতের পর জিন্নাহ হয়ে গেলেন জঙ্গি

মো. শামীম মিয়া, নরসিংদী

প্রকাশ : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ০৯:৫৮ এএম

আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১০:৫৬ এএম

জিন্নাহ। ফাইল ফটো

জিন্নাহ। ফাইল ফটো

‘আমার জিন্নায় আইছত। কই আমার জিন্না, আমার সামনে আয় বাপ’- বুক ফাটানো এমন আর্তনাদ ছেলে হারানো মা জোসনা বেগমের (৫৫)। মায়ের এই আর্তনাদের সঙ্গে বাড়িজুড়ে কান্নার রোল। শুধু পরিবারের সদস্যরাই নয়, আত্মীয়স্বজন পাড়া-প্রতিবেশী উপস্থিত সবাই কাঁদছে। তাদের কান্নায় চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে উঠছে।

গত ৬ আগস্ট গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের বন্দিরা কারাগার ভেঙে পলায়নের সময় কারারক্ষীদের গুলিতে ৬ বন্দি নিহত হয়। তাদের মধ্যে জিন্নাহ (২৮) একজন। আর্তনাদ করা নারী নিহত জিন্নাহর মা। 

জেল থেকে ছেলের পালানোর ঘটনার বর্ণনায় তিনি বলেন, ‘নরসিংদী জেলখানাত্তে পলাইন্যা আসামিগো মইধ্যে আমার জিন্নাহও একজন। আমার পোলায় আমারে কইছে মা আমি ইচ্ছা কইরা পলাই নাই। হেইদিন যদি জেলেরতে পলাইয়া না আইতাম তায়ইলে পুইরা মরতে অইতো। আমার পোলা শুক্কুরবার দিন নরসিংদী জেলখানাত্তে পলাইয়া আইছে আর লোববারে (রবিবার) লাইপুরা থানাত গিয়া নিজেই ধরা দিছে। এইবার আমনেরাই কন যেই পোলা জেলেত্তে পলাইয়া আওয়নের দুইদিন পর নিজে গিয়াই ধরা দেয় সে আবার কিয়ের লাইগ্যা পলাইতে যাইব। কন স্যার আমার পোলায় কি ল্লাইগ্যা আবার পলাইতে যাইব, কন্না স্যার।’ কথা বলতে বলতে আর্তনাদ করা মা জোসনা প্রশ্ন ছুড়ে দেন।

গত ৭ আগস্ট দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে ‘কাশিমপুর কারাগার থেকে ২০৯ বন্দির পলায়ন, গুলিতে জঙ্গিসহ নিহত ৬’ এই শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ হয়। এতে বলা হয়, ৬ আগস্ট (মঙ্গলবার) দুপুরে কারাগার থেকে বন্দি পালানো ঠেকাতে গুলি ছোড়েন কারারক্ষীরা। এতে ৬ জন নিহত হয়েছে। তাদের মধ্যে তিন জঙ্গি ছিল।

প্রকাশিত সংবাদে কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের জেল সুপার সুব্রত কুমারের (বর্তমানে বরখাস্তকৃত) বরাতে বলা হয়, নিহতদের পরিচয়ে নরসিংদীর নলভাটা এলাকার জাকির হোসেনের ছেলে নিহত মো. জিন্নাহ (২৮) হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার মামলার আসামি। অথচ নলবাটার দুটি গ্রুপের দ্বন্দ্বের জেরে করা মামলায় চলতি বছরের ৫ জুন তারিখে জিন্নাহসহ এলাকার ৩৫ জন নরসিংদী জজ আদালতে হাজিরা দিয়ে বের হওয়ার সময় সেখান থেকে তাকে তুলে নিয়ে যায় আমিরগঞ্জ ফাঁড়ি পুলিশ ইনচার্জ আমিনুল ইসলাম। পরে তাকে ১৮০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেটসহ মাদক মামলায় আটক দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়।

সরেজমিন নলবাটা গ্রাম ঘুরে স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে নলবাটা গ্রামের গোলজার মেম্বার গ্রুপ এবং পার্শ্ববর্তী ভাটি বদরপুর গ্রামের রবি গ্রুপের মধ্যে বালু ব্যবসাকে কেন্দ্র করে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিরোধ চলছিল। গত রমজান মাসের প্রথম দিকে অটোরিকশা নিয়ে নলবাটা গ্রামের জাকিরের ছেলে জিন্নাহর সাথে কথা কাটাকাটি হয় স্থানীয় যুবলীগ নেতা সবুজের। এর জেরে আমিরগঞ্জ ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি (রবি গ্রুপের সেকেন্ড ইন কমান্ড) সোহেলের নেতৃত্বে ২৫-৩০ সন্ত্রাসী দা, ছুরি, টেটা, বল্লম ও আগ্নেয়াস্ত্রসহ জিন্নাহর বাড়িঘরে অতর্কিত হামলা চালায়। সন্ত্রাসীরা জিন্নাহর বাবা জাকিরকে দা দিয়ে কুপিয়ে আহত করে। এ সময় বৃদ্ধ বাবাকে বাঁচাতে মাদ্রাসা পড়ুয়া জিন্নাহর ছোট বোন তানজিনা এগিয়ে এলে তাকেও কুপিয়ে আহত করা হয়।

এ ঘটনার পর উল্টো জিন্নাহ ও তার পরিবারের সদস্যসহ গোলজার মেম্বার গ্রুপের বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা দেয় রবি গ্রুপের সবুজ। সেই মামলায় হাজিরা শেষে ফেরার পথে নরসিংদী আদালতের প্রধান গেটের সামনে থেকে জিন্নাহকে তুলে নেওয়া হয় বলে জানায় সেদিন তার সাথে থাকা অন্যরা।

জিন্নাহর বড় ভাই মোক্তার হোসেন বলেন, ৫ জুন হাজিরা শেষে নরসিংদী কোর্ট থেকে বের হওয়ার সময় মেইন গেটের সামনে এলেই আমিরগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ আমিনুল জিন্নাহকে গাড়িতে তুলে নিয়ে আসে। পরে ১৮০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেটসহ তাকে মাদক মামলায় কোর্টে চালান দেয়। মামলায় উল্লেখ করা হয়, জিন্নাহকে ১৮০ পিস ইয়াবাসহ নলবাটা প্রাইমারি স্কুলের সামনে থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। জেলহাজতে থাকার কিছুদিন পর গত ১৯ জুলাই জানতে পারি, জিন্নাহ জেল থেকে পালিয়ে এসেছে। জুলাই মাসের ১৯ তারিখ জেলখানা থেকে পালিয়ে আসার পর ২১ তারিখ আমার বাবাকে সাথে নিয়ে সে রায়পুরা থানায় আত্মসমর্পণ করে। পরে আগস্ট মাসের ৬ তারিখ খবর পাই কাশিমপুর কারাগার থেকে পালানোর সময় পুলিশের গুলিতে সে মারা গেছে। আমার একটা প্রশ্ন, যে জেল থেকে পালিয়ে আসার পর নিজে পুলিশের কাছে ধরা দিয়ে আত্মসমর্পণ করেছে সে আবার কেন জেলখানা থেকে পালাতে যাবে? আমি আমার ভাইয়ের এই মৃত্যুর জন্য আমিরগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ আমিনুলকে দায়ী করি। সেদিন যদি তাকে মাদকসহ চালান না দিত, তাহলে আজ সে লাশ হয়ে বাড়িতে আসত না।

স্ত্রী হোসনা বলেন, ‘আমার স্বামীর কী অপরাধ আছিল। কী দোষে তারে জেলে দিল। যার জন্য আজকে সে লাশ হইয়া বাড়ি আইলো। আমি এই ছোট ছোট পোলাপাইনরে কেমনে খাওয়ামু, কেমনে পিন্দামু। আমার এই দুইটা পোলাপাইনের ভবিষ্যৎ কী, আর হেরা কারে বাবা বইল্লা ডাকব। আমি অহন কী করমুÑ আপনারা কি আমারে একটু কইবেন। আমার স্বামীরে যারা মারছে যারা তার এই মৃত্যুর জন্য দায়ী, আমি তাদের বিচার চাই।’

জিন্নাহর বৃদ্ধ বাবা মো. জাকির বলেন, আমার এই পোলা পুরা সংসারটা চালাইত। অহন আমরা কী খাই কী পিন্দি, এইডা আল্লাহই বালা জানে। আমার একটাই কথা- সেদিন যদি আমার পোলারে মিথ্যা মাদক মামলায় জেলে না দিত, তাহলে আমার জিন্নাহ লাশ হইয়া বাড়ি ফিরত না। আমি চোখে দেখি না, যতটুকু দেখি পুতেরে দেখনের লাইগা কাশিমপুর গেছিলাম। জেল গেটের সামনে সারা দিন থাইক্যাও পুতের দেয়া পাই নাই। হেরা আমার লগে দেখা করতে দেয় নাই। পরে পুতেরে না দেইখ্যাই বাড়ি ফিরা আসি। আমিরগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়ি ওই দারোগা টাকা খাইয়া মাদক দিয়া আমার পুতেরে জেলখানায় পাঠাইছে। সে কার কাছে থেকে টাকা খাইয়া আমার পুতেরে ধইরা নিছে আপনারা একটু কষ্ট কইরা খুঁইজা বাইর করেন। আমি সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে আমার জিন্নাহর হত্যার বিচার চাই। আমনেগো মাধ্যমে সরকারের কাছে আমি এই দাবি জানাই।’

এ ব্যাপরে আমিরগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ আমিনুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করলে কোর্ট গেটের সামনে থেকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, মাদকসহ জিন্নাহকে নলবাটা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এদিকে মাদক মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া জিন্নাহ কীভাবে হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলা মামলার আসামি হলেন- বিষয়টি জানতে কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের বরখাস্তকৃত জেল সুপার সুব্রত কুমারের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা