এহসানুল হক সুমন, রংপুর
প্রকাশ : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১০:০৮ এএম
আপডেট : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১২:৩০ পিএম
রংপুর নগরীর দর্শনা ঘাঘটপাড়ার বিলে শাপলা তুলছে এক শিশু।
যেদিকে চোখ যায়, চারদিকে শুধু লাল শাপলা। সূর্য ওঠার আগেই জেগে ওঠে তারা। শত শত শাপলা যেন স্বাগত জানিয়ে ডাকছে সবাইকে। দেখে মনে হয়, বিলের মাঝে লালগালিচা বিছিয়ে রেখেছে প্রকৃতি। শরতের ভোরে শিশির কণা পড়েছে ফুল-পাতায়। হালকা বাতাসে পাতায় বিন্দুর মতো সেই পানি দোল খাচ্ছে। সূর্যের প্রথম আলোকরশ্মি পড়ার সঙ্গে তা মুক্তোর মতো চকচক করে উঠছে। এ ছাড়াও বিলজুড়ে উড়ে বেড়াচ্ছে সাদা বক। শাপলার পাতায় পাতায় ব্যাঙের ছোটাছুটি। শাপলা বিলের এ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যে কারও চোখ জুড়াবে, মন ভরাবে। রংপুর নগরীর দর্শনা ঘাঘটপাড়ায় এমন মোহনীয় রূপে ধরা দিয়েছে শাপলা বিল। নগর জীবনের ব্যস্ততা দূরে ঠেলে প্রতিদিন ভোর থেকে সন্ধ্যা অবধি শাপলা বিল দেখতে ভিড় করছে যুবক-যুবতীসহ বিভিন্ন বয়সি মানুষ।
স্থানীয়রা জানান, নগরীর দর্শনার ঘাঘটপাড়ায় একসময় শ্যামাসুন্দরী খালের একটি প্রবাহ ছিল। খালের উজানে বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ হওয়ায় কয়েক বছর ধরে সেখানে পানিপ্রবাহ বন্ধ রয়েছে। তাই বর্ষায় প্রায় দুই একর আয়তনের এ প্রবাহটি বিলে পরিণত হয়। গত কয়েক বছর ধরে ঘাঘটপাড়ার এ বিলে লালশাপলা ফুটছে। তবে এ বছর বিলটিতে সবচেয়ে বেশি শাপলা ফুল ফুটেছে। যা নগরবাসীর মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, দর্শনা থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে ঘাঘটপাড়ার শাপলা বিল। যাওয়ার পথে দেখা যাবে পাকা রাস্তার দুই ধারে সবুজ ধানক্ষেত। রাতভর হালকা কুয়াশার কারণে এসব সবুজ ধানের আগায় দেখা মেলে শিশির বিন্দু। কোলাহলমুক্ত পরিবেশে ভোরে লালশাপলা দেখতে ছুটে আসছেন প্রকৃতিপ্রেমীরা। বিলের পাড়ে কেউ ছবি তুলছেন, কেউ পানিতে নেমে শাপলা তুলে প্রিয়জনদের উপহার দিচ্ছেন। আবার কেউ জীবিকার তাগিদে বাজারে বিক্রির জন্য বিল থেকে শাপলা তুলেছেন।
নগরীর হাজীপাড়া থেকে শাপলা বিল দেখতে এসেছেন দিলরুবা আক্তার। তিনি বলেন, ফেসবুকে একজনের মাধ্যমে জেনেছি এখানে শাপলা বিল আছে। সাধারণত অন্যান্য বিলগুলোয় সাদা শাপলা দেখা যায়। কিন্তু এখানে লাল শাপলা ফোটে। তাই বিলটি দেখতে বেশ আগ্রহ ছিল। শহরের মধ্যে গ্রামীণ পরিবেশে এ বিলে এসে খুব ভালো লাগছে।
দর্শনার সাইফুল ইসলাম হৃদয় বলেন, কয়েক বছর ধরে নিয়মিত এ বিলে ঘুরতে আসি। এখানে নৌকার ব্যবস্থা থাকলে বিলের সৌন্দর্য আরও বেশি উপভোগ করা যেত। নগরায়ণের কারণে দিন দিন বিল-জলাশয় হারিয়ে যাচ্ছে। ঘাঘটপাড়ার এ বিলসহ অন্যান্য বিল-জলাশয় রক্ষায় প্রশাসন এগিয়ে আসবে বলে প্রত্যাশা করছি।
কামারপাড়ার রাশেদ ইসলাম রাব্বী বলেন, ঘাঘটপাড়া শাপলা বিলে তিনবার এসেছি। এখানে শাপলার যে গালিচা তৈরি হয়েছে তা দেখে মন জুড়িয়ে যায়। শরতের নীল আকাশের সঙ্গে লালশাপলা প্রকৃতির সৌন্দর্য দ্বিগুণ করেছে।
ঘাঘটপাড়ার বাসিন্দা মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘প্রতিদিন দূরদুরান্ত থ্যাকি এটে শাপলা দেইখবার লোকজন আইসে। বেশি চ্যাংড়া-চ্যাংড়ি (যুবক-যুবতী) আইসে। ফটো তোলে, ফুল তুলি নিয়া যায়। বাড়ির পেছনোত বিল, দেখিও ভালো নাগে। অনেক ছোট ছোট ছাওয়া বিলের শাপলা তুলি ১০ টাকা আঁটি করি বাজারোত বেচে।’
রংপুর প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের উপদেষ্টা প্রকৌশলী ফজলুল হক বলেন, আমাদের জাতীয় ফুল শাপলা। আগে গ্রাম-শহরে অনেক খাল, বিল, জলাশয় ছিল। সেখানে প্রচুর পরিমাণ মাছ পাওয়া যেত, শাপলা, পদ্মফুল ফুটত। এখন প্রতিটি জায়গায় অবকাঠামো নির্মাণ হওয়ায় খাল-বিল, জলাশয় কমে যাচ্ছে। ফলে শাপলা-পদ্মফুল আর দেখা যায় না। তাই সরকারের উচিত খাল-বিল, জলাশয় সংরক্ষণ করা। এটি হলে জাতীয় ফুল শাপলা, পদ্মের যে সৌন্দর্য, তা প্রকৃতিপ্রেমীদের মানসিক প্রশান্তি আনবে।