সাইফুল হক মোল্লা দুলু, মধ্যাঞ্চল
প্রকাশ : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ২১:৪৮ পিএম
আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ২২:০৬ পিএম
কিশোরগঞ্জ শহরে অবাধে ট্রাক্টর চলাচল করছে। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ট্রাক্টর চলার কারণে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। তা ছাড়া শহরে তীব্র যানজট ও শব্দদূষণের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই ট্রাক্টর। সরেজমিনে দেখা গেছে, জেলা শহরসহ আশপাশ এলাকায় অবাধে ট্রাক্টর চলছে। এতে করে শহর ও শহরতলির মানুষ অস্বস্তিতে রয়েছেন। ট্রাক্টরের বিকট শব্দের কারণে অসংখ্য শিশু, বয়স্ক নারী-পুরুষ ও রোগী প্রতিদিন এক ধরনের অশান্তিতে পড়েছে।
শিশু ও বৃদ্ধরা ট্রাক্টরের দাপটের কারণে ঘর থেকে সড়কে আসতে ভয় পায়। কারণ ট্রাক্টরের বিকট শব্দ আর কালো ধোঁয়ার কারণে পরিবেশ-প্রতিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব তাদের অক্সিজেনের ঘাটতিতে ফেলে। জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির একাধিক সভায় শহরে সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত ট্রাক্টর, ভটভটি, লরি প্রবেশ নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত হলেও জেলা পুলিশ বা পৌর কর্তৃপক্ষ কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় অবস্থা বর্তমানে অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে।
শহরের বাসিন্দারা জানান, ট্রাক্টর চলার কারণে সারা শহরে তীব্র যানজট সৃষ্টি হওয়ায় লোকজনের হেঁটে রাস্তা পার হতে হয়। এ জন্য তাদের দীর্ঘ সময় ব্যয় করতে হয়। তা ছাড়া ট্রাক্টরের বিকট শব্দ শিশুদের মধ্যে একধরনের আতঙ্ক বিরাজ করে। এই ভয় ও আতঙ্ক শিশুদের স্বাভাবিক জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে চিকিৎসকরা জানান।
শিশু শিক্ষার্থীর অভিভাবকরা জানান, শিশুদের স্কুলে পাঠিয়ে তাদের মানসিক চাপ বেড়ে যায়। কিশোরগঞ্জ সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) শিক্ষাবিষয়ক কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক মো. আবদুল গণি বলেন, শহরে দিনের বেলায় ট্রাক্টর চলাচল নিষিদ্ধ থাকলেও স্থানীয় প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দাপটের সাথে ট্রাক্টর চলছে। ফলে শহরে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করা যাচ্ছে না। অ্যাম্বুলেন্সে করে কোনো রোগীকে যথাসময়ে হাসপাতালে নেওয়া যাচ্ছে না। এ ব্যাপারে তিনি প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার সময়ও দেখা যায়, পরীক্ষার্থীরা মানসিক ক্ষতির সম্মুখীন হন। জেলা মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আতিয়া হোসেন বলেন, সারাবেলা সড়কে মালবাহী ট্রাক্টর ঢুকে এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। রিকশা, অটোরিকশাসহ সকল যান আটকা পড়ায় শত শত মানুষ ১৫ মিনিটের পথ এক ঘণ্টায় অতিক্রম করে। এতে প্রতিজন পেশাজীবীর গড়ে দুই কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, একটি মালবাহী ট্রাক্টর বিভিন্ন যানসহ শতাধিক মানুষকে আটকে দেয়। এ অবস্থায় সড়কের ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা অভিভাবকরা বিপাকে পড়েন। একটি সড়কে ট্রাক্টর ঢুকে পড়লে হাজার হাজার ইজিবাইক, রিকশা ও অন্যান্য যান আটকে গিয়ে অসহনীয় যানজটের সৃষ্টি করে।
পরিবেশকর্মী মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ট্রাক্টর শহরের শব্দদূষণ ও যানজটের অন্যতম কারণ। পরিবেশ আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে দিনের বেলায় ট্রাক-ট্রাক্টর বন্ধ করার দাবিতে একাধিকবার মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হলেও উল্লেখযোগ্য কোনো উদ্যোগ নেয়নি প্রশাসন কিংবা পৌর কর্তৃপক্ষ।
কিশোরগঞ্জ ট্রাফিক ইন্সপেক্টর মো. শাহজাহান বলেন, দিনের বেলায় ট্রাক্টর বন্ধ করা না গেলে শহরে যানজট নিয়ন্ত্রণ ও স্বাভাবিক চলাফেরা করা কঠিন হয়ে পড়বে। তা ছাড়া পরিবেশ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। শহরে যান চলাচলের বিষয়ে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা অত্যন্ত জরুরি বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন।
পৌরসভার প্রধান নির্বাহী হাসান জাকির জানান, নরসুন্দা নদীর দুই পাশে কিশোরগঞ্জ অনেক সুন্দর, নান্দনিক এবং বাসযোগ্য একটি শহর। কিন্তু ট্রাক্টর, ট্রাক, ভটভটির আধিক্য শহরের বহমান স্বাভাবিক সৌন্দর্যকে নষ্ট করে দিচ্ছে। পাশাপাশি তীব্র ও অসহনীয় যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। জেলা প্রশাসন, জেলা পুলিশ ও জনগণকে সাথে নিয়ে এসব নিয়ন্ত্রণ করতে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের শব্দদূষণ প্রতিরোধ প্রকল্পের পরিচালক মো. ফজলে এলাহি বলেন, ট্রাক্টর চলার কারণে যে শব্দদূষণ হয় তা শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। প্রশাসনকে সাথে নিয়ে সচেতন নাগরিকসমাজ ট্রাক্টর সীমিত পর্যায়ে চলাচলের ব্যবস্থা নিতে পারে। আগামী প্রজন্মকে রক্ষা করার জন্য এর কোনো বিকল্প নেই।