ছাত্র আন্দোলন
হিরু আলম, পেকুয়া (কক্সবাজার)
প্রকাশ : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ২১:৩৫ পিএম
আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ২২:০৩ পিএম
নিহত ওয়াসিম আকরাম।
কাঁদতে কাঁদতে আহাজারি করে ওয়াসিমের মা জোসনা বেগম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলছিলেন ‘আমার বুকের মানিককে ওরা মাইরা ফেলছে। তার কোনো দোষ ছিল না। ওয়াসিম বারবার বলত, বেসরকারি চাকরি না, সরকারি চাকরি করবে। পড়াশোনা শেষ করে সরকারি চাকরি করার স্বপ্ন ছিল আমার ওয়াসিমের। পড়াশোনা শেষ না হতেই পাখির মতো গুলি করে জাদুমণিকে তারা মেরে ফেলেছে। ওরে চাকরি লাগবে না! আমার বুকের মানিককে তুরা ফিরিয়ে দে।’
‘চলে আসুন ষোলশহর’ ফেসবুকে এমন পোস্ট দেওয়ার কিছুক্ষণ পরই চট্টগ্রামের ষোলশহরে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান শিক্ষার্থী ওয়াসিম আকরাম। কোটা সংস্কার আন্দোলনে পুলিশি হামলার দ্বিতীয় দিন ১৬ জুলাই এ ঘটনা ঘটে। নিহত ওয়াসিমের স্মৃতি আঁকড়ে ধরে এখনও কাঁদছে তার পরিবার, এখনও আফসোস করছে উপজেলাবাসী। স্তব্ধ হয়ে আছে এলাকার লোকজন। ওয়াসিমের এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারছে না কেউই।
নিহত ওয়াসিম আকরামের বাড়ি কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলা সদর ইউনিয়নের ৯ নং ওয়ার্ডের দক্ষিণ মেহেরনামা বাজার পাড়ায়। চট্টগ্রাম কলেজে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের স্নাতক তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন তিনি। দুই ভাই তিন বোনের মধ্যে ওয়াসিম দ্বিতীয়।
ওয়াসিমের ছোট বোন সাবরিনা ইয়াসিন বলেন, পরিবারের একমাত্র শিক্ষিত ছেলে ছিল বড় ভাই ওয়াসিম। সে আমাকে ডাক্তার বানানোর স্বপ্ন নিয়ে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি করিয়েছিল। এসএসসি পরীক্ষার পর বাবা-মা বিয়ে দিয়ে দেওয়ার কথা বললে সে বাধা দেয়। প্রয়োজনে চাকরি করে আমার পড়াশোনার খরচ চালাবে এমন কথা বলত সে। কিন্তু তার পড়াশোনা শেষ না হতেই তাকে মেরে ফেলেছে তারা।
নিহতের ছোট চাচি জেয়াসমিন বলেন, ওয়াসিমের বাবা ফোন করলে আমাকে বলত বিদেশের পরিস্থিতি খুব খারাপ। তুমি আমার ছেলেকে একটু বুঝিয়ে বলো সে যেন কোনো একটা চাকরি-বাকরি করে। কিন্তু ওয়াসিম বলত, সে সরকারি চাকরি করবে। তার সেই স্বপ্নকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। কোটা আন্দোলনে তাকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।’
ওয়াসিমের মা বিলাপ করতে করতে বলছিলেন, ১৬ তারিখ রাতে আমার মানিক শেষবারের মতো আমার সাথে কথা বলেছিল। সে বলছিল, আমার কান ব্যথার চিকিৎসার জন্য আমাকে চট্টগ্রাম নিয়ে যাবে। কিন্তু পরদিন সে নিয়ে লাশ হয়ে গেল। রাতে সে বলেছিল পরিস্থিতি স্বাভাবিক। ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় আমি কিছু জানতে পারিনি। এমন হবে জানলে তাকে বাসা থেকে বের না হওয়ার জন্য ওয়াদা করাতাম।’
বড় বোন মরজিনা মোবাইলে বলেন, সেদিন হঠাৎ অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন আসে। আমাদের দ্রুত চট্টগ্রাম যাওয়ার জন্য বলা হয়েছিল। অচেনা কণ্ঠস্বরটি বলেছিল, ওয়াসিম অ্যাক্সিডেন্ট করেছে। কিন্তু আমরা গিয়ে তার নিথর দেহ দেখতে পাই। তিনি বলেন, বিচার চাইব কার কাছে? রাষ্ট্রপক্ষই তো হত্যা করেছে। একমাত্র আল্লাহর কাছে আমরা এর বিচার চাইব।
নিহতের চাচা জয়নাল বলেন, সে খুবই সাদাসিধা ও নিরীহ প্রকৃতির ছিল। ভীষণ পরোপকারী হওয়ায় এলাকার প্রত্যেকে তাকে ভালোবাসত।
স্থানীয় বাসিন্দা আইন বিভাগের শিক্ষার্থী শেখ মুহাম্মাদ বলেন, ওয়াসিম আকরাম ভাইয়ের লাশ কবরস্থ করার সময় আমি সেখানে ছিলাম। তার স্বজন-সাথিদের কান্নার রোল আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে গিয়েছিল। বুঝেছিলাম পাষণ্ড, নির্দয় ঘাতকের একটি নিষ্ঠুর বুলেট কতজনের স্বপ্ন, ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, বন্ধুত্ব কেড়ে নিতে পারে।