শাখাওয়াত হোসেন সোহান, রাজবাড়ী
প্রকাশ : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১৫:৩৪ পিএম
ঝাড়ু তৈরির কাজ করে স্বাবলম্বী হয়েছেন রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার বেশ কয়েকজন শারীরিক প্রতিবন্ধী। প্রবা ফটো
কেউ হাঁটতে পারেন না, কেউবা কথা বলতে পারেন না ঠিকমতো। কারও আবার হাত বা পা নেই। শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী এই মানুষগুলোই একসময় দৌলতদিয়া ঘাটে ভিক্ষা করে পেট চালাতেন। কিন্তু গর্হিত সেই কাজ ছেড়ে তারা এখন গর্বিত কর্মী। নিজেদের প্রচেষ্টায় চেষ্টা করছেন স্বাবলম্বী হওয়ার। তারা তৈরি করেন ঘরোয়া কাজের দৈনন্দিন ব্যবহৃত অতি প্রয়োজনীয় ফুলঝাড়ু। এসব ফুলঝাড়ু বিক্রি হচ্ছে রাজবাড়ীসহ আশপাশের জেলায়।
জানা যায়, রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ঘাটে একসময় ভিক্ষা করে জীবিকা নির্বাহ করতেন শতাধিক প্রতিবন্ধী। তাদের প্রায় সবাইসহ উপজেলার আরও ৪৭৪ জন শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষকে নিয়ে গঠিত হয় গোয়ালন্দ উপজেলা প্রতিবন্ধী উন্নয়ন সংস্থা। তারাই এখন ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে ইচ্ছাশক্তিতে বলীয়ান হয়ে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টা করছেন।
শারীরিকভাবে অক্ষম এই মানুষগুলো নিজস্ব উদ্যোগে তৈরি করছেন ফুলঝাড়ু। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ঝাড়ু তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা। বর্তমানে সংস্থার অন্তর্ভুক্ত সদস্যদের মধ্যে অল্প কয়েকজন এ কাজে সম্পৃক্ত থাকলেও আগামীতে সবাইকে ভিক্ষাবৃত্তির অভিশপ্ত জীবন থেকে মুক্তি দেওয়ার লক্ষ্যে কাজ করছেন তারা। দৌলতদিয়া ফেরিঘাট সড়কে গোয়ালন্দ উপজেলা প্রতিবন্ধী উন্নয়ন সংস্থার কার্যালয়কেই তারা কারখানা হিসেবে ব্যবহার করছেন।
আলাপকালে শারীরিকভাবে অক্ষম মানুষগুলো জানান, একটা সময় মূলত ভিক্ষা করেই জীবন চলত তাদের। কিন্তু পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর থেকেই ঘাটের যানবাহন ও যাত্রীর সংখ্যা অনেক কমে যায়। আর তখন চরম বিপাকে পড়েন তারা। অধিকাংশের সংসারেই নেমে এসেছিল চরম হতাশার ছায়া। পরিবার-পরিজন নিয়ে তাদের দিন পার করাই কষ্টকর হয়ে উঠেছিল। কারণ দৌলতদিয়া ঘাটে যাত্রী কম থাকায় তাদের আয়-রোজগার কমে যায়। যে কারণে বিকল্প কাজের কথা ভাবতে থাকেন। এ অবস্থায় প্রতিবন্ধীদের সংগঠন তাদের কিছু সদস্যদের নিয়ে ফুলঝাড়ু তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করে। আর এ ফুলঝাড়ু তৈরি করে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছেন এই মানুষগুলো।
ঝাড়ু তৈরির কাজ করেন প্রতিবন্ধী হালিম শেখ। তিনি বলেন, একসময় ভিক্ষা করতাম। এখন ভিক্ষা ছেড়ে ফুলঝাড়ু তৈরি করি। এই কাজ করে অনেক ভালো আছি। আন্তরিকতার সঙ্গেই এই কাজ করছি এখানকার সবাই। আশা করি, আমাদের এ উদ্যোগকে সফল করতে সমাজের সবাই সহযোগিতা করবে।
স্থানীয়রা জানায়, এই মানুষগুলো একটা সময় অন্যের মুখাপেক্ষী ছিল। ঘাটের বিভিন্ন জায়গায় তারা ভিক্ষা করে চলত। কিন্তু এখন তারা কাজ করছে। এটা ভালো সংবাদ। তারা এখন অনেকের অনুপ্রেরণাও।
গোয়ালন্দ উপজেলা প্রতিবন্ধী উন্নয়ন সংস্থার সাধারণ সম্পাদক মোন্নাব শেখ বলেন, ফুলঝাড়ু তৈরির কাঁচামাল বান্দারবান অথবা খাগড়াছড়ি থেকে আনতে হয়। আমরা যারা প্রতিবন্ধী আছি তারাই সেখানে গিয়ে প্রয়োজনীয় কাঁচামালগুলো আনি। প্রতিবন্ধী ছাড়া এখানে কোনো স্বাভাবিক মানুষ কাজ করে না।
গোয়ালন্দ উপজেলা প্রতিবন্ধী উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি রতন শেখ বলেন, আমাদের সংস্থার সদস্যরা অটোরিকশা নিয়ে বিভিন্ন বাজারে ফুলঝাড়ুগুলো বিক্রি করেন। বর্তমানে সংস্থার অল্প কিছু সদস্য এই কাজ করছেন। ভবিষ্যতে আমাদের কাজের পরিধি বাড়াতে চাই। আমাদের মতো শারীরিক অক্ষমদের কথা বিবেচনা করে সবাই এগিয়ে আসবেন এটাই আমাদের চাওয়া। এ ছাড়া আমাদের তৈরি এবং বিক্রি করা ফুলঝাড়ুর জন্য বাজারের খাজনা মওকুফ করা গেলে আর্থিকভাবে লাভবান হতাম।
গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী অফিসার জ্যোতি বিকাশ চন্দ্র জানান, প্রতিবন্ধীদের এই প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানাই। উপজেলা প্রশাসন থেকেও তাদের সহযোগিতা করা হয়েছে। ইতোমধ্যে তাদের ১ লাখ টাকা অনুদান ও ২ লাখ টাকা সুদমুক্ত ঋণ প্রদান করা হয়েছে। আমরা তাদের পাশে আছি।