নোয়াখালী প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ২১:৫৩ পিএম
আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ২২:১৩ পিএম
সাজ্জাদ হোসেন সজীব।
নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীতে চিকিৎসায় অবহেলায় সাজ্জাদ হোসেন সজীব (১৭) নামের এক স্কুলশিক্ষার্থীর মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। বৃহস্পতিবার (১২ সেপ্টেম্বর) সকাল ৯টার দিকে উপজেলার আল খিদমাহ হাসপাতাল থেকে ওই ছাত্রকে উন্নত চিকিৎসার জন্য কুমিল্লা নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।
সাজ্জাদ হোসেন সজীব সেনবাগ উপজেলার ছাতারপাইয়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের পাঁচতুফা গ্রামের জাফর আহমদের ছেলে। সে সোনাইমুড়ীর হনুফা খাতুন উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্র।
জানা গেছে, জাফর আহমদ ও শিল্পী আক্তার দম্পতির ছেলে সজীবের বেশ কিছু দিন ধরে থেমে থেমে জ্বর আসত। গত বুধবার বিকালে জ্বর নিয়ে আল খিদমাহ হাসপাতালে ভর্তি করান মা শিল্পী আক্তার। সজীবের বাবা চট্টগ্রামে চাকরি করেন। হাসপাতালে ভর্তির পর থেকে সজীবের শারীরিক অবস্থার অবনতি হচ্ছিল। বৃহস্পতিবার সকালে টেস্টের টাকা না থাকায় তার মা ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে যান। এসে দেখেন তার ছেলেকে অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হয়েছে। তাকেও দ্রুত অ্যাম্বুলেন্সে তুলে কুমিল্লা নেওয়ার জন্য বলা হয়। পথে রোগী বেঁচে আছে কি না, অ্যাম্বুলেন্সের চালকের এমন সন্দেহের ভিত্তিতে নিকটবর্তী হাসপাতালে নিয়ে গেলে সজীব বেঁচে নেই বলে জানতে পারেন।
সজীবের ডেঙ্গু টেস্টের ফল নেগেটিভ হলেও তার প্লাটিলেট কমে গিয়েছিল বলে দাবি চিকিৎসকদের। হঠাৎ রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি, মায়ের অবর্তমানেই অ্যাম্বুলেন্সে তোলা, টেস্টের ন্যূনতম বিল দিতে না পারায় ব্যাংকে টাকা তুলতে যাওয়া এবং পথে রোগীর মৃত্যু নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। রোগীর মা চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ তুলেছেন। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রোগীকে বাঁচানোর সর্বোচ্চ চেষ্টার কথা বলেছে।
সজীবের মা শিল্পী আক্তার বলেন, আমার ছেলে হাসপাতালে ভর্তির সময় কিছুটা সুস্থ ছিল। ভর্তির পর চিকিৎসক বলে তার ডেঙ্গু হয়েছে। তাকে স্যালাইনের পর স্যালাইন দেয়। বৃহস্পতিবার সকালে আমাকে বলে জরুরি টেস্ট করাতে হবে, টাকা লাগবে। আমার কাছে ৫০০ টাকা ছিল না। আমি অনেক অনুরোধ করেছি, তারা তা শোনেনি। তারপর সোনাইমুড়ী বাজারে ব্যাংকে গিয়ে টাকা আনি। এসে দেখি আমার ছেলেকে কুমিল্লায় রেফার করা হয়েছে।
শিল্পী আক্তার বলেন, জোর করে আমাকে তারা অ্যাম্বুলেন্সে তুলল। তার আগেই আমার ছেলেকে তারা তুলেছে। আমার স্বামী তখনও চিটাগাং। আমার ভাই রাস্তা থেকে অ্যাম্বুলেন্সে ওঠার কথা ছিল। কিন্তু আমার ভাইকে দেখেও অ্যাম্বুলেন্স টেনে চলে যায়। তারপর নাথারপেটুয়ায় গিয়ে অ্যাম্বুলেন্সের ড্রাইভার বলেÑ রোগী মনে হয় বেঁচে নেই। তারপর সেখানেই একটা হাসপাতালে পরীক্ষা করায়। চিকিৎসক বলে আমার ছেলে মারা গেছে।
সজীবের বাবা জাফর আহমদ বলেন, আমার ছেলের কাছে আমার স্ত্রী ছাড়া আর কেউ ছিল না। হাসপাতাল থেকে বলে আপনার ছেলের কাছে কোনো অভিভাবক নেই। তাকে দ্রুত অ্যাম্বুলেন্সে করে কুমিল্লায় নিতে হবে। তারা নিজেরাই অ্যাম্বুলেন্স ঠিক করে আমার স্ত্রীকে জোর করে সেটায় তুলে দেয়। এখানে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না দিয়ে রেফার্ড নাটক সাজিয়ে আমার ছেলেকে বলি দেওয়া হয়।
আল খিদমাহ হাসপাতালের ম্যানেজার মো. ইউসুফ চিকিৎসা অবহেলার বিষয়টি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, রোগীকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। কোথাও অবহেলা হয়নি। তার মায়ের কাছে টেস্টের টাকা চাইতে পারে। এটা আমার জানা নেই। তবে তাদের পরিবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সকল ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আমাদের ম্যানেজিং ডিরেক্টর ডা. মোহাম্মদ ইলিয়াছ ছাত্রটিকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন।
এ বিষয়ে চিকিৎসক মোহাম্মদ ইলিয়াছ বলেন, রোগী হাসপাতালে ভর্তির পর থেকে স্বাভাবিক ছিল। তার ডেঙ্গু হয়নি, তবে প্লাটিলেট কম ছিল। আমরা যথেষ্ট আন্তরিকতার সঙ্গে সেবা দিয়েছি। সকল প্রমাণ সিসি ক্যামেরায় আছে। কোনো টেস্ট করাতে হলে ন্যূনতম টাকা কাউন্টারে জমা দিতে হয়। রোগীর মা সে টাকা তুলতে ব্যাংকে যায়। যখন রোগীর অবস্থা খারাপ হয় এবং সিসিইউ সেবা প্রয়োজন, তখন তার পুরুষ অভিভাবক না থাকায় আমরা দায়িত্ব নিয়ে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে কুমিল্লা রেফার করেছি। আমরা রোগীর কাছ থেকে এক টাকাও বিল নিইনি। আমাদের চেষ্টা ছিল রোগী বেঁচে থাকুক।
ছাতারপাইয়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান বলেন, ছেলেটাকে বৃহস্পতিবার জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। তার মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তার চিকিৎসায় যদি কোনো অবহেলা থাকে, তাহলে যেন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়; এটা আমি অনুরোধ করছি।
সোনাইমুড়ী উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. ইসরাত জাহান বলেন, চিকিৎসা অবহেলার কোনো খবর আমাদের কাছে নেই। ভুক্তভোগী পরিবার যদি অভিযোগ দেয়, তাহলে আমরা তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেব।