ফেনী
আবদুল্লাহ আল-মামুন, ফেনী
প্রকাশ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ২১:৩৯ পিএম
বন্যার পানিতে ভিজে যাওয়া কাগজসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র রোদে দেওয়া হয়েছে। ফেনী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সামনে। প্রবা ফটো
২০ আগস্ট থেকে ফেনীতে স্মরণকালের বন্যায় সবকিছু লন্ডভন্ড করে দিয়েছে। বিশেষ করে জেলার বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার অবকাঠামো পানির নিচে তলিয়ে নষ্ট হয়ে যাওয়া, পানি উত্তোলনের কাজে ব্যবহৃত মোটর ও টিউবওয়েল বিকল হয়ে যাওয়ায় স্কুল খোলার পর নতুন নতুন সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্তৃপক্ষ। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের টিউবওয়েল মেরামত করে দেওয়ার প্রচেষ্টা থাকলেও তা অপ্রতুল। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখার ঘোষণার পর কিছু কিছু শিক্ষার্থী এলেও হাতে বই না থাকায় কিছুক্ষণ ঘুরেফিরে বাড়ি চলে যাচ্ছে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বন্যায় শিক্ষার্থীদের বাড়িঘরে পানি উঠে আসবাবপত্রের সঙ্গে বই ও শিক্ষা উপকরণ নষ্ট হয়ে গেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি গুদামেরও একই অবস্থা। এমতাবস্থায় সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে দ্রুত নতুন বইয়ের ব্যবস্থা করা না গেলে শিক্ষার্থীদের মাঝে প্রতিষ্ঠান বিমুখতা সৃষ্টির পাশাপাশি শিক্ষাজীবন নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে। যত দ্রুত সম্ভব শিক্ষার্থীদের পাঠে মনোযোগী করতে প্রতিষ্ঠানগুলোতে আসবাবপত্রের ব্যবস্থা করা, খাবার ও ব্যবহারের পানির উৎস নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছেন অভিভাবক ও সচেতন মহল।
জেলা শিক্ষা বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ফেনীতে ৫৪৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৩৫১টি উচ্চ বিদ্যালয়, ১০টি বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ অন্তত দেড় হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। বন্যায় সবগুলো প্রতিষ্ঠান পানিতে নিমজ্জিত হয়ে ক্ষয়ক্ষতির কবলে পড়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের নিচতলা পানিতে ডুবে যাওয়ায় বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন, ইলেক্ট্রোনিক যন্ত্র, কম্পিউটার, অফিসিয়াল নথি, চেয়ার, টেবিল, আলমিরা, টিউবওয়েল, মোটরসহ প্রায় সবকিছুই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের হিসাব মতে, ফেনীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যে পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা সংস্কারে অন্তত ৭০ কোটি টাকা প্রয়োজন। দাপ্তরিক হিসাবে দেখা যায়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্ষতি ৩ কোটি ৯ লাখ টাকা, উচ্চ বিদ্যালয়, কলেজ ও মাদ্রাসা পর্যায়ের ক্ষতি অন্তত ৩৫ কোটি টাকার। আর প্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে প্রায় ২৮ কোটি টাকা। শুধু তাই নয়; শিক্ষার্থীদের মাঝে বছরের শুরুতে বিতরণকৃত বইগুলো পানিতে নষ্ট হয়ে গেছে।
প্রশাসন জানায়, ফেনীতে লোকালয়ে পানি ওঠার পর প্রায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এখন পর্যন্ত ২২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রায় ৩ হাজার মানুষ আশ্রিত রয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠান থেকে আশ্রিত মানুষ বাড়িঘরে গেছে; সেসব প্রতিষ্ঠান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে পাঠদানের উপযোগী করে তোলা হচ্ছে। বিশেষ করে, বন্যার সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকায় পানি সংকটের কারণে আশ্রিতদের ব্যবহৃত উচ্ছিষ্ট যত্রতত্র ফেলায় অস্বস্তিকর অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে বাথরুমগুলো। এখনও শত শত প্রতিষ্ঠানে পানি সরবরাহের উৎস টিউবওয়েল ও মোটর নষ্ট হয়ে আছে। এ কারণে শিক্ষার্থীরা স্কুলে গেলেও সুপেয় পানি ও বাথরুমে ব্যবহারের পানি পাচ্ছে না।
সদর উপজেলার সুন্দরপুর সফিকুর রহমান উচ্চ বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, অফিস সহায়ক কলসি ভরে পাশের বাড়ি থেকে পানি এনে স্কুলের টিউবওয়েলে ঢুকিয়ে পানি তোলার চেষ্টা করছেন। শত শত শিক্ষার্থীর এ প্রতিষ্ঠানে বাথরুমে এক বালতি পানি রাখা হয়েছে। এখন পর্যন্ত পর্যাপ্ত খাবার পানির ব্যবস্থা হয়নি। শুধু সুন্দরপুর উচ্চ বিদ্যালয় নয়; ফেনী জেলার প্রায় সবগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই এখন পর্যন্ত খাবার ও বাথরুমের পানির ব্যবস্থা না হওয়া এবং শিক্ষাসামগ্রীর সংকটে স্কুলগুলো পুরোপুরি পাঠদানের উপযোগী হয়নি। তাই স্বল্পসংখ্যক শিক্ষার্থী স্কুলে এলেও তাদেরকে ছুটি দিয়ে দিতে হচ্ছে।
মাহমুদা আক্তার নামে এক শিক্ষার্থী জানায়, স্কুলে কি নিয়ে যাব; আশ্রয়কেন্দ্র থেকে বাড়িতে এসে দেখি সবগুলো বই ভিজে পচে গেছে। স্কুলের ব্যাগটা কয়েকদিন শুকানোর পরও ব্যবহার করা যাচ্ছে না। বই ছাড়া স্কুলে এসেছি। স্কুলে খাবার পানি নেই। বাথরুমে পানি নেই। চেয়ার-টেবিল ঠিক নেই। তাহলে স্কুলে এসে কী লাভ।
জেলা শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও পাঁচগাছিয়া এ. জেড খান মেমোরিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ফকির আহাম্মদ ফয়েজ বলেন, স্কুল ও কলেজ ভবন থেকে আশ্রিতরা নেমে যাওয়ার পর আমরা জরুরিভাবে পানি ও বিদ্যুতের ব্যবস্থা করে ধোয়ামোছার কাজ করেছি। স্কুলে আজকেও শিক্ষার্থীরা এসেছে। প্রয়োজনীয় বইসহ শিক্ষাসামগ্রী না থাকায় স্বল্প পরিসরে শ্রেণি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি।
জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শফী উল্লাহ বলেন, আমাদের আওতাধীন ৩৬১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অন্তত ৩ কোটি টাকার সরঞ্জামাদি নষ্ট হয়ে গেছে। ২৮ কোটি টাকার অবকাঠামোর ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়াও জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের প্রায় ১২ লাখ পিস বই নষ্ট হয়ে গেছে। আমরা প্রতিবেদন প্রস্তুত করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছি। আশা করি, আগামী ১৫ থেকে ২০ দিনের মাঝেই শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছানো যাবে।
এদিকে সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফরিদ উদ্দীন আহাম্মদ তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, জেলার সবগুলো প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে। যে পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা সংস্কার করে আগের জায়গায় ফিরে আসতে প্রায় ৩ কোটি টাকা প্রয়োজন। জরুরি ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছে দিয়ে স্কুলগুলোকে আগের জায়গায় নিয়ে আসতে কাজ করছি।
জেলা শিক্ষা প্রকৌশল বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ইসরাত নুসরাত সিদ্দিকা বলেন, ফেনীর সকল উচ্চ বিদ্যালয়, কলেজ ও মাদ্রাসায় অবকাঠামোগত নানামুখী ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আমরা প্রাথমিকভাবে অবকাঠামোগত অবস্থা স্বাভাবিক করতে প্রায় ২৮ কোটি টাকার প্রয়োজন মর্মে প্রতিবেদন তৈরি করেছি।
জেলা প্রশাসক মুছাম্মৎ শাহীনা আক্তার বলেছেন, ফেনীর প্রায় সবগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে। শিক্ষার্থীদের কাছে থাকা পাঠ্যবইসহ শিক্ষাসামগ্রী নষ্ট হয়েছে। কোনো শিক্ষার্থী যাতে ঝরে না পড়ে অথবা বিদ্যালয় বিমুখ না হয় সেজন্য দ্রুত সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদানের পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করছি। এনটিসিবি থেকে নতুন বই পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা শিক্ষার্থীদের হাতে হাতে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হবে।