সিরাজগঞ্জ প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১৮:৫২ পিএম
আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১৮:৫৯ পিএম
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে গত ৪ আগস্ট রবিবার সারা দেশের ন্যায় রণক্ষেত্র
তৈরি হয়েছিল সিরাজগঞ্জেও। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকারী ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে
দফায় দফায় সংঘর্ষ বাধে। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সংঘর্ষে সিরাজগঞ্জ সদরেই নিহত হয় পাঁচজন।
মুহূর্তের মধ্যে রণক্ষেত্র তৈরি হয় চারদিকে। অস্ত্রের ঝনঝনানি আর লোমহর্ষক ঘটনায় কেঁপে
ওঠে পুরো জেলা। একই দিনে এনায়েতপুর এলাকায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে আহত হয় অর্ধশত আন্দোলনকারী,
নিহত হয় দুই ছাত্র। সংঘর্ষে প্রায় তিন ঘণ্টা পর এনায়েতপুর থানা ছেড়ে পালানোর চেষ্টা
করে পুলিশ সদস্যরা।
থানা থেকে খোয়া যায় ১৬টি অস্ত্র। অপরদিকে হাটিকুমরুল হাইওয়ে থানা
রেখে পালিয়ে যায় পুলিশ সদস্যরা। এ সময় থানা থেকে খোয়া যায় আরও ১০টি অস্ত্র ও দুই থানা
মিলে প্রায় এক হাজার রাউন্ড গুলি।
এ ছাড়াও গত ৪ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আওয়ামী
লীগ নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ বাধে দফায় দফায়। সাধারণ শিক্ষার্থীদের হাতে লাঠি আর ইটপাটকেল
থাকলেও কিছু আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর হাতে ছিল বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্রসহ দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র।
বারবার বিদেশি শটগান দিয়ে ছাত্রদের দিকে লক্ষ্য করে গুলি করছিল আওয়ামী লীগের কয়েক নেতাকর্মী।
ভিডিও ফুটেজে দেখা যায় স্থানীয় সংসদ সদস্য জান্নাত আরা হেনরীর ভাতিজা ও যুবলীগ নেতা
এনামুল হককে। পাশেই আরেক যুবলীগ নেতা এমএ মুছা ও করিম মুন্সি গুলি ছুড়ছেন শটগান দিয়ে।
ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের হাতেও ছিল দেশীয় অস্ত্র। এই সকল অস্ত্রের গুলিতে নিহত হয় যুবদলের
তিনজন। প্রকাশ্য দিবালোকে এসব অবৈধ অস্ত্র প্রদর্শনী হলেও গত ২৯ দিনেও এই অস্ত্র উদ্ধারে
প্রশাসনের নেই কোনো তৎপরতা। ইতোমধ্যে নিহতের ঘটনায় জেলায় মামলা হয়েছে ৫টি। আসামি করা
হয়েছে প্রায় ১০ হাজার। সেদিন আওয়ামী লীগ নেতাদের ব্যবহৃত সেই অস্ত্র এখনও উদ্ধার হয়নি।
সেই সঙ্গে এনায়েতপুর ও হাটিকুমরুল হাইওয়ে থানার খোয়া যাওয়া ২৬টি অস্ত্রও উদ্ধার হয়নি।
অস্ত্রগুলো উদ্ধার না হওয়ায় চরম আতঙ্কে রয়েছে সাধারণ মানুষসহ পুলিশ সদস্যরা। এত অস্ত্র
বাইরে রেখে রাজনৈতিক নেতারাও রয়েছে চরম আতঙ্কে।
সূত্রমতে জেলায় বৈধ অস্ত্র আছে ৫৮৯টি। নবায়ন আছে ৩৩৯টি আর ঘটনার দিন
যারা অস্ত্র ব্যবহার করেছে তাদের নামে পাওয়া যায়নি কোনো অস্ত্রের লাইসেন্স। প্রশাসন
দ্রুত জোর অভিযান দিয়ে এই অবৈধ অস্ত্রগুলো উদ্ধার করে জনমনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনবেÑ এমনটাই
দাবি করছে স্থানীয়রা।
নিহত যুবদল নেতা রঞ্জু শেখের স্ত্রী মৌসুমি খাতুন বলেন, যারা আমার
স্বামীকে গুলি করে মেরেছে পুলিশ তাদের এখনও ধরতে পারেনি। সেই অপরাধীরা এখনও বাইরে আছে।
অবৈধ অস্ত্রগুলো তাদের কাছে আছে। আমি মামলা করেছি। মামলা করার পর থেকে আমি আমার ছোট
একটা বাচ্চা নিয়ে চরম আতঙ্কের মধ্যে আছি। রাষ্ট্রের জন্য কাজ করতে গিয়ে আমার স্বামী
শহীদ হয়েছেন। তাই রাষ্ট্রের কাছে আমার একটাই অনুরোধ, আমার স্বামীকে যারা হত্যা করছে
তাদের যেন শাস্তি হয়।
আরেক নিহত যুবদল কর্মী আব্দুল লতিফের বোন মোছা. সালেহা বেগম বলেন,
আমার ভাইকে যারা হত্যা করছে তারা সবাই গা ঢাকা দিয়ে রয়েছে। তাদের কাছে সেই সকল অবৈধ
অস্ত্র এখনও রয়েছে। তারা যখন তখন আমাদের ওপর হামলা করতে পারে। ফলে সাধারণ মানুষ থেকে
শুরু করে অনেকেই এখন আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে। তাই প্রশাসনের কাছে অনুরোধÑ অবৈধ অস্ত্র
উদ্ধারে দ্রুত ব্যবস্থা নিন। তা না হলে আরও অনেক মায়ের বুক খালি হতে পারে।
শফিকুল ইসলাম নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে
অনেকেই অবৈধ অস্ত্র দিয়ে শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষের ওপর গুলি চালিয়েছে এবং মানুষকে
হত্যা করেছে। এ ছাড়াও কয়েকটি থানার অস্ত্র লুট করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত সেসব অস্ত্র
উদ্ধার করা হয়নি এবং থানায় জমা দেওয়া হয়নি। এই অস্ত্রগুলো এখনও বিভিন্ন মহল বা দুষ্কৃতকারীদের
হাতে রয়েছে। তাই প্রশাসনের উচিত শক্ত একটা অভিযানের মাধ্যমে অস্ত্রগুলো উদ্ধার করা,
আর তা যদি না হয় তাহলে সামনে আমাদের জন্য ভয়ংকর দিন অপেক্ষা করছে।
সিরাজগঞ্জ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান বাচ্চু অভিযোগ
করে বলেন, গত ৪ আগস্ট প্রকাশ্য দিবালোকে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা অস্ত্র উঁচিয়ে সাধারণ
শিক্ষার্থী ও জনগণকে গুলি করেছে। এ সময় যুবদলের তিন কর্মীও নিহত হয়েছে এবং অনেকেই আহত
হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। তাই অস্ত্রগুলো যদি উদ্ধার না হয় আমরা কেউই কিন্তু নিরাপদ
নই। এ ছাড়াও কয়েকটি থানা থেকে পুলিশের অস্ত্র লুট হয়েছে, সেই অস্ত্রগুলো এখনও উদ্ধার
হয়নি। তাই নিরাপত্তার স্বার্থে প্রশাসনকে বলব, যারা শিক্ষার্থীদের গুলি করেছে, যুবদলের
নেতাকর্মীদের হত্যা করেছে, তাদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হোক। যদি
তাদের গ্রেপ্তার করা না হয়, শুধু রাজনৈতিক নেতারাই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে না; পুরো
সিরাজগঞ্জবাসী নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে।
সিরাজগঞ্জ সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হুমায়ুন কবির বলেন, আমরা
এখনও কোনো অস্ত্র উদ্ধারের কাজ শুরু করিনি। শিগগির আমরা দলীয় নেতাকর্মীদের হাতে থাকা
অস্ত্র ও পুলিশের খোয়া যাওয়া অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান চালাব। আমরা এসব বিষয়ে খুবই তৎপর
রয়েছি। আশা করি দ্রুত এসব অস্ত্র উদ্ধার করতে সক্ষম হব।