× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ঐতিহ্য

বন্ধের পথে ঈশ্বরদীর শত বছরের বেনারসি পল্লী

মাহাবুবুর রহমান মিঠুন, ঈশ্বরদী (পাবনা)

প্রকাশ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১১:২৪ এএম

পাবনার ইশ্বরদী বেনারসি পল্লীর একটি কারখানায় কাজ করছেন এক কারিগর।  প্রবা ফটো

পাবনার ইশ্বরদী বেনারসি পল্লীর একটি কারখানায় কাজ করছেন এক কারিগর। প্রবা ফটো

পাবনার ঈশ্বরদীর বেনারসি তাঁত শিল্পের ইতিহাস প্রায় শত বছরের। ব্রিটিশ শাসনামলে ঈশ্বরদী পৌর শহরের ফতেহ মোহাম্মদপুর এলাকায় বসতি গড়েন ভারতের উত্তর প্রদেশ থেকে আসা বেনারসি কারিগররা। বসতি স্থাপনের পর কারিগররা ফতেহ মোহাম্মদপুর এলাকায় বেনারসি-কাতানসহ অভিজাত শাড়ি বুননের কাজ শুরু করেন।

নানা সংকট ও সমস্যার মধ্যেও বর্তমানে দুই শতাধিক তাঁতি পূর্বপুরুষদের পেশা ধরে রেখেছেন। ঈশ্বরদীর বেনারসি তাঁত শিল্পকে আরও আধুনিক ও যুগোপযোগী করে গড়ে তুলতে সরকারি বরাদ্দে ফতেহ মোহাম্মদপুর এলাকায় গড়ে তোলা হয় বেনারসি পল্লী। তাঁতসামগ্রীর দাম বৃদ্ধি ও ভারতীয় বেনারসিতে দেশীয় বাজার সয়লাবসহ নানা প্রতিবন্ধকতায় প্রতিষ্ঠার ২০ বছরেও পূর্ণতা পায়নি এ বেনারসি পল্লী। পল্লীর বিশাল এলাকা এখন ঝোপঝাড় ও জঙ্গলে ভরা। পেশা বদলেছেন পল্লীর কারখানায় কর্মরত অনেক তাঁতশ্রমিক।

২০০৪ সালে ২ কোটি ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ে বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড ফতেহ মোহাম্মদপুর এলাকায় সাড়ে ৫ একর জমির ওপর গড়ে তোলে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বেনারসি পল্লী। ২০ বছরে প্লটের কিস্তি পরিশোধের সুবিধার্থে ৯০ তাঁতিকে ৯০টি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৭০টি ৩ শতাংশের এবং ২০টি ৫ শতাংশের প্লট। ৯০টি প্লটের মধ্যে মাত্র ৭টি প্লটে কারখানা স্থাপন করা হলেও এখন চালু রয়েছে তিনটি। 

সরেজমিনে দেখা গেছে, কারখানা স্থাপনের জন্য ইটের দেয়াল গাঁথুনি দেখা গেলেও সেগুলোর নির্মাণকাজ শেষ হয়নি। বেশিরভাগ প্লটে কারখানা গড়ে না ওঠায় পুরো পল্লী এখন ঝোপঝাড় ও জঙ্গলে পরিণত হয়েছে। পল্লীর দেখভালের জন্য একজন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ছাড়া আর কোনো কর্মকর্তা ও কর্মচারী নেই। তিনি এ কাজের পাশাপাশি আটঘরিয়া উপজেলার তাঁতিদের ঋণ বিতরণ ও আদায়ের কার্যক্রম দেখভালের বাড়তি দায়িত্বও পালন করেন। 

বেনারসি পল্লীর বরাদ্দকৃত প্লটের কয়েকজন তাঁতমালিক জানান, কিস্তিতে প্লট নিলেও এখানে কারখানা নির্মাণের মতো পুঁজি নেই। বেনারসি পল্লীর আশপাশে রেলের পরিত্যক্ত জায়গায় বাপ-দাদার আমল থেকেই কারখানা নির্মাণ ও ব্যবসা করে আসছি। বর্তমানে ব্যবসার অবস্থা ভালো না। সুতার দাম বৃদ্ধি, শ্রমিক সংকটসহ নানা প্রতিবন্ধকতায় বেনারসি তাঁতের ব্যবসায় এখন মন্দা চলছে। তারা আরও জানান, সরকারি বরাদ্দের আগেও পাকিস্তান আমলে এখানে প্রায় ৪৫০টি বেনারসি তাঁত কারখানা ছিল। এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এ অঞ্চলের প্রায় সাত হাজার মানুষ। ভারতীয় নিম্নমানের শাড়িতে দেশি বাজার সয়লাব ও দফায় দফায় সুতা, চুমকিসহ তাঁতসামগ্রীর দাম বাড়ায় লোকসানে পড়ে ধীরে ধীরে অনেকেই ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন।

পল্লীতে সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার কাপড়ের কারখানা জামান টেক্সটাইলের দুটি ও স্থানীয় শানজিদা শাড়ি কারখানা নামে তিনটি কারখানা চালু রয়েছে। সেখানে কর্মরত কারিগররা বলেন, একসময় এখানে আমাদের হাতে তৈরি বেনারসি-কাতান জনপ্রিয় ছিল। ১০ থেকে ৩০ হাজার টাকা দামের শাড়ি তৈরি হতো। হাতের তাঁতে তৈরি বেনারসি-কাতান বুননে শ্রমিকদের মজুরি খরচ দিতে হয় ৩ থেকে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত। ভারতীয় কমদামি শাড়ি বাজারে আসায় এসব শাড়ির ক্রেতা নেই। পল্লীতে সরকারিভাবে সুতা প্রসেসিং কারখানা স্থাপনের কথা থাকলেও তা হয়নি। শাড়িপ্রতি প্রায় এক হাজার টাকা করে ঢাকার মিরপুর থেকে সুতা প্রসেস করে আনতে হয়।

সানজিদা শাড়ি কারখানার স্বত্বাধিকারী নাসিম উদ্দিন টুটুল বলেন, ৩০ বছর এ পেশায় আছি। বেনারসি তাঁতিতে এমন দুঃসময় আগে কখনও দেখিনি। ২০২০ সালের শুরুতে শাড়ি তৈরির সুতা ছিল ২ হাজার টাকা বান্ডিল (সাড়ে চার কেজি)। আর এখন হয়েছে ৪ হাজার টাকা। কিন্তু শাড়ির দাম এক টাকাও বাড়েনি। চার বছর আগেও যেখানে খরচ হতো দুই হাজার টাকার মতো, এখন একটি সাধারণ জামদানি শাড়ি তৈরিতে এখন খরচ হয় প্রায় তিন হাজার টাকা। সেই শাড়ি এখনও তিন হাজার টাকার মতো দামে বিক্রি হচ্ছে। এমনিতেই আমরা চলতে পারছি না। বেনারসি পল্লীতে কারখানা নির্মাণের পুঁজি কোথায় পাব। বরাদ্দ পাওয়া প্লটে কারখানা নির্মাণ করে অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধাও পাওয়া যাবে না। তাই তাঁতিরা বেনারসি পল্লীতে কারখানা স্থাপনের আগ্রহ দেখাচ্ছে না।

ফতেহ মোহাম্মদপুর বাজারের গুড্ডু বেনারসি বিতানের স্বত্বাধিকারী আলী আজগর গুড্ডু বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে এই বেনারসি পল্লীর তৈরি শাড়ি দিয়ে ব্যবসা করেছি। কিন্তু ভারতীয় শাড়ি বাজারে আসার পর দেশীয় এই বেনারসির চাহিদা কমে গেছে। দোকানে রাখলে দেশীয় এই বেনারসি-কাতান শাড়ি কেনার জন্য ক্রেতা পাওয়া যায় না। এসব কারণেই মূলত এই ঐতিহ্যবাহী বেনারসি পল্লী আজ বিলুপ্তির পথে।

ঈশ্বরদী বেনারসি পল্লীর ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহ জামাল বলেন, এখানকার বেনারসি শিল্প একসময় বেশ সমৃদ্ধ ছিল। কালের পরিক্রমায় বেনারসির চাহিদা কমে যাওয়া ও ভারতীয় কমদামি শাড়ি আসার কারণে এ শিল্প বর্তমানে ধ্বংসের পথে। সরকারি সহায়তার মাধ্যমে আধুনিক পাওয়ারলুমে শাড়ি তৈরি এবং দেশীয় বাজারে ভারতের শাড়ি বন্ধ করে পর্যাপ্তভাবে বাজারজাত করতে পারলে ঐতিহ্যবাহী এ পল্লী আবার জীবন পাবে। 

অফিসের লোকবল সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অফিসে পিয়ন, নৈশপ্রহরী এমনকি একজন ঝাড়ুদার পর্যন্ত নেই। একাই এ প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালন করছি। পাশাপাশি আটঘরিয়া উপজেলায় তাঁতিদের ঋণ প্রদানসহ তাঁত বোর্ডের কার্যক্রমও দেখভাল করতে হয়।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা